গারো পাহাড়ের গদ্যে রনি রেজা

বঙ্গবন্ধুর কলকাতা – জীবন

রাজনীতিক শেখ মুজিবের বাড়ন্তবেলা

মাহকালের বাতিঘর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একজন বঙ্গবন্ধু একটি জাতির জন্য আজ সৃজন ও মনন চর্চার সুবিশাল পটভূমি। নতুন প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মানস গঠনে কলকাতার জীবন বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৪১ সালে ম্যাট্টিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশে তিনি কলকাতা যান এবং ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। অর্থাৎ ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, ৪৬-এর নির্বাচন ও দেশভাগের উত্তাল সময়সহ গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো বঙ্গবন্ধুর কেটেছে কলকাতায়। একজন শেখ মুজিবের রাজনীতিক হয়ে ওঠা কলকাতাতেই বলা যায়। কলকাতা থাকাকালীন তিনি জাতীয় রাজনীতির যে দীক্ষা পান, পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সেই অভিজ্ঞতা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাঁর জীবনের এ অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব নিয়েই রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর কলকাতা-জীবন’ গ্রন্থটি। এটি তাম্রলিপি প্রকাশনীর বিশেষ আয়োজন ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালা’ সিরিজের অধীনে প্রকাশিত। যার উপদেষ্টা: আনিসুজ্জামান, গ্রন্থমালা সম্পাদক: সেলিনা হোসেন ও নির্বাহী সম্পাদক: মামুন সিদ্দিকী। সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন: সুরমা জাকারিয়া, মোহাম্মদ বশির আহাম্মদ, এ কে এম জসীমউদ্দীন, মনিরুজ্জামান শাহীন ও মোবারক হোসেন। এই সুন্দর, সমৃদ্ধ সম্পাদনা পরিষদ দেখে গ্রন্থটির প্রতি আলাদা একটা ভরসা জন্মে। কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে অপাঠ্য কোনো গ্রন্থ অন্তত এটি নয়। ভরসার জায়গায় খুব বেশি হতাশ অবশ্য করেননি লেখক বা এর সঙ্গে সম্পৃক্তরা। লেখক তার গবেষণার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কলকাতা-জীবনের যতটুকু এঁকেছেন কিছু বানান ভুল ও বাক্য গঠনে অঙ্গতি ছাড়া তেমন ত্রুটি মেলেনি। ভূমিকাতেই তিনি এক বাক্যে লিখেছেনÑ ‘১৯৩৬ সালে চক্ষুরোগ গ্লকোমাতে আক্রান্ত হয়ে পুনরায় কলকাতায় চিকিৎসা নিতে আসেন তিনি (বঙ্গবন্ধু)।’ পরবর্তী বাক্যে লিখেছেনÑ ‘কলকাতায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গেলেও সেখানে তার মেজো বোনকেও পেতেন। কারণ চাকরির সুবাদে তার ভগ্নিপতি কলকাতায় অবস্থান করতেন।’
পর পর দুটি বাক্যে লেখকের একই স্থানে (কলকাতা) দুই ধরণের কর্মের (আসা-যাওয়া) ব্যবহারে সচেতন পাঠক কিছুটা বিরক্ত হবেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর সর্বনাম হিসেবে তাঁর ব্যবহারে কোথাও চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করেছেন, কোথাও করেননি। ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় কোথাও ‘গভর্নর’ কোথাও ‘গভর্ণর’ লিখেছেন। পুরো বইয়ে এমন অসংখ্য বানান ভুল রয়েছে। এমন কিছু ছোট ত্রুটি ছাড়া গ্রন্থটির বিষয়ে সার্বিক ভালোই বলতে হবে। ভূমিকাসহ ১০টি উপশিরোনামে এই গ্রন্থের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। এরমধ্যে ‘কলকাতায় শিক্ষাজীবন’, ‘জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি’, ‘পঞ্চাশের মন্বন্তরকালে ভূমিকা’ ও ‘দেশ বিভাগে প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রচিত প্রবন্ধগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর কলকাতা-জীবনের নানা ঘটনা উঠে এসেছে প্রবন্ধগুলোয়। অনেক বিষয়ের নতুনত্বও বিশেষ লক্ষ্যণীয়। যেমনÑ বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি গ্রন্থ এরইমধ্যে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কেও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চা করতেন সেকথা এই গ্রন্থে উঠে এসেছে। ২৪ তম পৃষ্ঠায় লেখক উল্লেখ করেছেনÑ ‘১৯৪২ সালে ম্যাট্টিকুলেশন উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে কলকাতায় আগমনের পর ছাত্ররাজনীতিতে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেও ছাত্র মুজিবের সাহিত্যচর্চায় ঠিকই সময় বের করে নিতেন। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য ও সঙ্গীতে তিনি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। এমনকি জোড়াসাঁকোতে গিয়ে রবি ঠাকুরের পৈত্রিক ভিটাও দর্শন করে আসেন।’
উপরোক্ত অংশে স্পষ্ট হয়েছেÑ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সময় থেকেই সাহিত্যচর্চা করেছেন। যদিও ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর রচিত কোনো সাহিত্যকর্মের সন্ধান কোথাও মিলেছে কিনা; তা লেখক স্পষ্ট করেননি।
৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদমুখরতার বিষয়টি চিত্রিত হয়েছে এভাবেÑ ‘ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি শেখ মুজিব বরাবরই তীব্র প্রতিবাদমুখর ছিলেন। এর দরুন ভারতে অবস্থানরত ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের তিনি অপছন্দ করতেন। তার বিভিন্ন কার্যক্রমে মূলত সেটি প্রতীয়মান হয়েছে। কলকাতাস্থ ফরিদপুরবাসীদের সংস্থা ‘ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিশেন’-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট নবাবজাদা লতিফুর রহমান। ১৯৪৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এই সংস্থার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। সে সময় অবিভক্ত বাংলার গভর্নর (গ্রন্থে ভুল বানানে ‘গভর্ণর’ মুদ্রিত আছে) স্যার জন হারবার্টের মৃত্যু হলে অস্ট্রেলিয়ার আর.জি.কেসি বাংলার নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কলকাতা আগমন করেন। তার আগমনের প্রেক্ষিতে নবাবজাদা লতিফুর রহমান অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গভর্নরকে সংবর্ধনা জানাতে উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে তিনি সংস্থার সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমানকেও অবহিত করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন। এর প্রত্যুত্তরে শেখ মুজিব তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান।’ শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের আপত্তিতে সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বাতিল হয়। অমিতাভ গুপ্তের বর্ণনায়Ñ ‘সেক্রেটারি মুজিব তৎক্ষণাত প্রেসিডেন্ড লতিফুর সাহেবের কথার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একজন বিদেশি গভর্নরকে এত খাতির করার কোনো প্রয়োজন আছে কি? এরপর শেখ মুজিব নিজে ফরিদপুর অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সমিতির প্রতি সদস্যের বাড়ি গিয়ে বললেন, নবাবজাদা বিদেশি গভর্নরকে সংবর্ধনা জানাতে চান। আমার নিজের এতে একেবারেই মত নেই, কিন্তু উনি আমার বাবার বয়সীÑ তাঁর মুখের ওপর কোনো কথা বলা আমার শোভা পায় না। তবে আপনারা যদি নবাবজাদার প্রস্তাবকে সমর্থন করেন তো করুন, কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাকে সেক্রেটারির পদ থেকে অব্যাহতি দিন। এই বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য যথাসময়ে ম্যানেজিং কমিটির বৈঠক বসলো। কিন্তু দেখা গেল সেক্রেটারি শেখ মুজিব আসেনি। প্রেসিডেন্ট লতিফুর সাহেব বললেন, সেক্রেটারির জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক। কিন্তু সেক্রেটারি মুজিব এলেন না। তখন কার্যকরী সমিতির একজন সদস্য উঠে দাঁড়িয়ে মুজিব তাদের এ ব্যাপারে কী বলেছিলেন সব জানালেন। তখন নবাবজাদাও বলতে বাধ্য হলেন, সেক্রেটারির যদি আপত্তি থাকে তবে এ ব্যাপারে আর এগিয়ে কাজ নেই। পরদিন তিনি শেখ মুজিবকে ডেকে বললেন, আমি তোমার দেশপ্রেম ও নীতিবোধের তারিফ করি।’
এখানে বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতা ও আপসহীনতার সঙ্গে বিনয়ের বিষয়টিও চিত্রিত হয়েছে। কতটা সম্মান দেখিয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রতিবাদ করা যায় তা বঙ্গবন্ধু দেখিয়েছেন। যা বর্তমান রাজনীতিকদের জন্য অবশ্যশিক্ষণীয়। রাজনৈতিক জীবনে অনেকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মতের অমিল হয়েছে। দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। তবু তাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিল উল্লেখযোগ্য।
৩৭ ও ৩৮ পৃষ্ঠা থেকে আরেকটি অংশ তুলে দিচ্ছিÑ ‘১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়াতে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। … এ সম্মেলনই অবিভক্ত বাংলার মুসলিম ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন ছিল। মুসলীম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্মাদক আবুল হাসিম তাঁর গ্রন্থে তৎকালীন রাজনীতিতে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। এখানে তিনি বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতার নাম উল্লেখ করেছেন। যার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নামও পাওয়া যায়। (এ অংশে আবুল হাসেম রচিত ‘আমার জীবন ও বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধও তুলে দিয়েছেন লেখক। যা ১৯৮৭ সালে নওরোজ কিতাবিস্তানের ৫৭-৫৮ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত) প্রবন্ধে লেখক যে সময়কার বর্ণনা দিয়েছেন তখন শেখ মুজিব কলকাতার ছাত্র রাজনীতিতে ছিলেন নবাগত। পরবর্তীতে তিনি আবুল হাশিম-এর স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন। যদিও ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালীন সময়ে সোহরাওয়ার্দীর সাথে দ্বন্দ্বের জেরে শেখ মুজিবের সাথে আবুল হাশিম-এর দূরত্বের সৃষ্টি হয়। তবু আজীবন তিনি শ্রদ্ধার সাথেই আবুল হাশিমের কথা স্মরণ করতেন। শেখ মুজিব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন আবুল হাশিমের কথা।
গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে ১৯৮৩ সালে সংগঠিত দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা। উঠে এসেছে কীভাবে গোপালগঞ্জের মতো একটি মহকুমা থেকে গিয়ে কলকাতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। গ্রন্থটিতে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার দৃশ্যপট। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর অসামপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচাসহ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে রচিত কিছু গ্রন্থ পড়েছি তাদের জন্য খুব বেশি নতুন তথ্য যদিও লেখক যুক্ত করতে পারেননি গ্রন্থটিতে। তবে বঙ্গবন্ধুর জীবনের অতী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে কলকাতা-জীবন নিয়ে আলাদা গ্রন্থ হওয়া দরকারও। যেহেতু বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ, লেখক ও সম্পাদনা পরিষদের আরো যত্নবান হওয়া উচিত ছিল বলেই মনে করি।
বঙ্গবন্ধুর কলকাতা-জীবন, লেখক: তাসনীম আলম, প্রকাশক: এ কে এম তারিকুল ইসলাম রনি (তাম্রলিপি), প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২০, প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম, মূল্য: ১৬০ টাকা
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!