গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

বোধন

মুঠোফোনের মেসেজের রিংটোনটা বাজতেই ঘরটার মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। অহনা সোমেসের দিকে তাকালো। মেসেজটা দেখই সোমেসের হাতটা কেঁপে উঠলো। ল্যাবের রিপোর্ট। রিপোর্ট পজেটিভ। অহনা লক্ষ্য করছে সোমেসের হাতটা কাঁপছে। তাই আর কোন কিছু না বলে উঠে, ড্রয়িংরুম থেকে নিজের বেডরুমের দিকে গেল। সোমেসও পিছন পিছন গিয়ে বলল,“ তুমি কোন চিন্তা করো না। আমি ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করে নিচ্ছি। কিচ্ছু হবে না,সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অহনা ঝুলবারান্দা সংলগ্ন জানলাটার সামনে বসল। আলতো করে পেটে হাত দিল। আকাশের দিকে একমনে তাকিয়ে রইল।
“ আজ থেকে আর ঘরের বাইরে বেড়িয়ো না।” বলেই দরজা বন্ধ করে দিল।
দরজা বন্ধের আওয়াজটা যেন বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজের সাইরেনের মতো শোনাল।

চার বছর আগে অহনা আর সোমেস ভালোবেসে বিয়ে করে। দু’জনেই আই টি সেক্টরে চাকরি করতো। সেখান থেকেই প্রেম ও পরিণয়।
সোমেসের মা বেঁচে আছেন। বাবা রিটায়ারমেন্টের পরপরই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। সেই থেকেই সোমেসের মা একটু খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছেন। তার উপর চাকরি করা মেয়ে একদম পছন্দ নয়। তবুও সোমেস মাকে কিছু বলে না। আহনাকেই বোঝায়,“ বাবা নেই,মা যেন কষ্ট না পায়। একটু মানিয়ে নাও।”
আসলে সংসার তো বড় জটিল জায়গা। এখানে মানিয়ে নেওয়ার অভিনয়টা নিপুণভাবে চালিয়ে যেতে হয়। কারণ সবকিছুই তো লাইভ। এখানে তো রিটেক এর কোনো জায়গা নেই। ভালোবাসার মানুষকে কাছে পেলে সব সহ্য করা যায়। অহনাও তাই করছিল। অফিস থেকে ফিরে স্নান করে রান্নাঘরে ঢুকতো। রাতের রান্না করে সকালের জন্য সব গুছিয়ে তবেই শুতে যেত। কিন্তু সোমেসের মা গায়ত্রী দেবীর তাতেও মন ভোরতো না। রোজই অহনা অফিসে বেরোনোর সময় কিছু না কিছু নিয়ে শুরু করে দিতেন।

সেদিন বেরোনোর সময় বললেন,“ সংসার তো আর আমার একার নয়। সারাদিন আমি চিতা জ্বালিয়ে বসে থাকব আর যে যার কাজ করবে,তা হবে না। তোমাদের সংসার,এবার তোমরা বুঝে নাও।”
অহনার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,“ এসব আপনি কি বলছেন,মা! কাজের লোক তো আছে। রাতে আমি রান্না করে রাখি। সকালে টিফিন করে দিয়ে আপনার ছেলেকে গুছিয়ে তারপর আমি খেয়ে বেরোই। এরপর সারাদিন তো আপনার আর কোন কাজ নেই।” ব্যাস আগুনের মধ্যে ঘি পড়ল! কেঁদে-কেটে একসার হয়ে ছেলেকে বললেন,“ দেখ বাবু দেখ,তোর বউ বলছে আমি নাকি বসে বসে খাই। এসব আমায় শুনতে হলো। ওগো, যাওয়ার সময় তুমি আমায় নিয়ে গেলে না কেন? এতদিন সংসার করেছি। ছেলে মানুষ করেছি। এখন পরের মেয়ে এসে বলে কিনা, আমার কোন কাজ নেই। আমি তোমাকে আমার সারাদিনের কাজের হিসাব দেবো?”
অহনা ভাবতেই পারেনি একটা সামান্য কথায় তিনি এই ভাবে রিয়াক্ট করবেন। সোমেসের অবস্থা তো আরো শোচনীয়। একদিকে মা আরেকদিকে বউ। কাকে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। শেষে অহনাকে চুপ করতে বলে। রাতে ফিরে গায়ত্রী দেবীর কাছে ক্ষমাও চাইতে হয়।

সহ্যের একটা সীমা আছে। একটু একটু করে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে থাকে। একদিন সোমেস অহনাকে ডেকে বলে,“ অহনা,তুমি বরং চাকরিটা ছেড়ে দাও। দেখো, মায়ের বয়স হয়েছে। আর রোজ রোজ এই,তু তু ম্যায় ম্যায়,আমারও ভালো লাগছে না। তার উপর অফিসে কাজের চাপ। এরপর আমি হয়তো পাগল হয়ে যাব।”
“ না,না তুমি কেন পাগল হবে। আমারও ভালো লাগছে না। এতে যদি সংসারের শান্তি ফিরে তবে তাই হোক।”
একটা পাখির আকাশ কেড়ে নিলে যেমন হয় অহনারও ঠিক তাই হল। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে রান্নাঘরের খাঁচায় বন্দী করে নিল নিজেকে।
অলক্ষ্যে হাসছিল নিয়তি। গাছেদের অসুখ করলো। পৃথিবীর জ্বর এলো। থেমে গেল ব্যস্ততার চাকা। এল মহামারী। শুরু হলো লকডাউন। অহনা আগেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছিল। সোমেসের work-from-home হয়ে গেল। সংসারের শান্তি কতটা ফিরেছিল বলা শক্ত তবে জগত সংসার যে হাপর টানতে শুরু করেছিল তাতে আর সন্দেহ রইল না। ব্যস্ত মানুষগুলো কেমন যেন থমকে গেল। তাদের কাছে দিনরাত সব এক হয়ে গেল। অখন্ড অবসর। রিক্সার হর্ণ নেই। অটোর রেষারেষি নেই। বাজারে চিৎকার নেই। কোলাহলপূর্ণ শহরটা কেমন যেন চুপ হয়ে গেল।
ওদের ব্যালকনির সামনেই সবুজ একখণ্ড মাঠ। সেখানে পরপর কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া,চাঁপা,অশোক, নানা ধরনের গাছের সারি। কদিন ধরেই দেখছে ব্যালকনিতে এসির বাইরের অংশটাতে এক শালিক দম্পতি খড়কুটো এনে জমা করছে। ওকে দেখে তো ভয়ই পায় না। আরো কচর-কচর বাড়িয়ে দেয়। অহনাও বেশ মজা পায়। ওদের বিস্কুট নিয়ে আয় আয় বলে ডাকলেই চলে আসে বিস্কুট খেতে। অহনা ব্যালকনিতে গেলেই ওরা সামনের গাছটাতে উড়ে এসে বসে। নাগরিক শাকিলের সাথে যে এত বন্ধুত্ব হয় তা অহনার জানা ছিল না। এই ভাবে দিন যায় রাত যায়,গড়ে ওঠে শালিকের সংসার। আরেক নতুন মায়ায় আবদ্ধ হয় অহনা।
অহনার প্রথম প্রথম সময় কাটতে চাইতো না। অফিসের টাইমটা খুব বোর লাগতো। রান্নাবান্না সেরে ব্যালকনি দিয়ে আকাশ দেখতো। এতে মনটা খানিকটা ভালো হয়ে যেত। ধীরে ধীরে ব্যালকনিটাকে অসম্ভব ভালোবেসে ফেলল। তার যত্ন করা টবে ফুটে উঠল নানা ধরনের ফুল,ক্যাকটাস,লতা আরো কত কি! এখন ঐ ব্যালকনিটাই ওর সব। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলে গাছের পরিচর্যা, আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখা।
সেদিন সকালে ব্যালকনির দিকে দরজাটা খুলতেই দেখল একটা ক্যাকটাসে কুঁড়ি এসেছে। ওটা দেখতে গিয়ে মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। কোনরকমে টাল সামলে বসে পড়ল। সোমেস তাড়াতাড়ি এসে ওকে ধরে শুইয়ে দিল। বলল,“ কি যে করো না! সারাদিন গাছ আর গাছ। একটু রেস্ট নাও না। পড়ে গেলে কি হতো বলতো!”
অহনা হেসেই চলেছে। সোমেস ধমকের সুরে বলল,“ আবার হাসছো?” বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গেল। অহনা সোমেসের হাতটা চেপে ধরলো। হাসতে হাসতে বলল,“ জানো,আমি মনে হয় মা হতে চলেছি!”
“ মানে?”
“ হ্যাঁ মশাই,তুমি বাবা হতে চলেছ।”
সোমেস বিছানায় অহনার পাশে বসে পড়ে। নিবিড় ভাবে ঠোঁটটা ডুবিয়ে দেয় অহনার ঠোঁটে। দু’জনে এক অন্যরকম সুখানুভূতিতে ডুবতে থাকে।

মা হতে চলেছে এই আনন্দে বেশ কাটছিল দিনগুলি। অহনার শরীরে একটু একটু করে পরিবর্তন ঘটেছিল।
এদিকে সারাবিশ্বে কোভিড১৯ এর দাপট চলছে। খবর দেখলেই গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। হাসপাতালের বেড নেই। অক্সিজেনের অভাব। মারা যাচ্ছেন ডাক্তার নার্স। এক অদ্ভুত ছোঁয়াচে রোগে জর্জরিত দেশ।
অহনা খুব সাবধানে থাকে। শাশুড়ি মা বলেছেন আঁতুরটা বাপের বাড়িতে তুলে আসতে। অহনার বাবা-মা এখন আসতে পারে না। মাঝেমাঝেই ওদের জন্য খুব মন খারাপ হয়। ব্যালকনিতে বসে দিন গোনে কবে সব স্বাভাবিক হবে? তার শরীরে যে তিল তিল করে বড় হচ্ছে তার কি হবে? হঠাৎই নড়ে উঠে পেটের ভিতরের প্রাণটা। অহনা এই প্রথম বুঝতে পারে তার নড়াচড়া। ততদিনে শালিক দম্পতিও বেশ জমিয়ে খড়কুটো দিয়ে বাসা তৈরি করে ফেলেছে। অহনা অবাক হয়ে দেখে শালিকের সংসার। সারাদিন এ গাছ সে গাছ। মাঝে মাঝে ঝগড়া। আবার এক ডালে বসে মাথা নেড়ে আদর। একদিন দুপুরে চরাচর অন্ধকার করে বৃষ্টি নামল। অহনা দেখল, একটা শালিক গাছের ডালে বসে ভিজছে। এদিক ওদিক দেখল কিন্তু আর একটাকে দেখতে পেল না। সব শালিকই দেখতে একই রকম তবে এই দু’টি ওর বারান্দায় আসে বলে ওদেরকে আলাদা করে চিনে ফেলেছে। না, আর একটাকে কোথাও দেখতে পেল না। কৃষ্ণচূড়া গাছটার মাথার ডালে দেখল একটা বুলবুলি গান গাইছে আর আপন-মনে বৃষ্টিতে ভিজছে। একটা মাটির মায়া মাখা গন্ধ চারিদিকে ম ম করতে লাগল। বৃষ্টি কমলে আবার বারান্দায় দু’টিকে দেখা গেল। একজন ভেজেনি। তারমানে ও বারান্দাতেই ছিল। তবে কি মেয়ে শালিকটি মা হতে চলেছে?
ক’দিন ধরেই অহনার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সাত মাস পেরিয়ে আট মাসে পড়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে আসার পর থেকেই শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। সর্দি সর্দি ভাব,মাথার যন্ত্রণা,তারপর জ্বর,বমি। ডাক্তার কোভিড টেস্ট করতে দিয়েছিলো। আজই কোভিড টেস্টের রিপোর্ট এসেছে, পজেটিভ। এত সাবধানে থেকেও কি করে হলো? অহনার নিজের থেকেও বাচ্চাটার জন্য
ভয় পেয়ে গেল। তার প্রিয় ব্যালকনিতে দাড়িয়ে এইসব ভাবছিল। ওদিকে গায়ত্রী দেবীর কথা শুরু হয়ে গেল,“ যারা কথা বললে শোনে না। তাদের এই রকমই হয়!” সোমেস বলল,“ মা,চুপ করো না। ও সব শুনতে পাবে। একে এই অবস্থা। ও তো কিছু করেনি। নার্সিংহোমে চেকআপে গেছিল হয়তো সেখান থেকেই ইনফেক্টেড হয়েছে।”
“ দেখ বাবু,ওকে ওর বাপের বাড়িতে রেখে আয়। না হলে কোন হাসপাতালে দিয়ে আয়।” কথাটা অহনার কানে যেতেই দম বন্ধের মতো অবস্থা হলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিগত খবরের ছবি। পেটে হাত দিল। মনে হলো অনেকক্ষণ তো বাচ্চাটা নড়ছে না।
রাতে অহনার জ্বর এলো। জলতেষ্টায় গলা শুকিয়ে যেতে লাগল। জ্বরের ঘোরে সোমেসের কাছে জল চাইল। তারপর খেয়াল হল,ঘরে তো ও একা। কোনরকমে উঠে ওষুধ খেয়ে আবার শুয়ে পড়লো। পেটের উপর হাত দিয়ে রাখলো। অনেকক্ষণ হলো সে তো নড়াচড়া করছে না। আর ঘুম এলো না। ভাবলো সোমেসকে ডাকবে। তারপর ভাবল আরেকটু অপেক্ষা করে দেখি। ভোরের দিকে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। আস্তে আস্তে ব্যালকনির দরজা খুলে দাঁড়ালো। তখনো সূর্য ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে লাল রঙের আভা ফুটে উঠেছে। সেই দিকে তাকিয়ে রইল। ভাগ্যকে তো মেনে নিতেই হবে। আজ হয়তো তাকে হাসপাতালে দিয়ে আসবে।
হঠাৎই কানে এলো শাকিলের বাসা থেকে কিচকিচ করে ছোট ছোট বাচ্চাদের আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে ওর পেটের বাচ্চাটা আড়মোড়া ভাঙলো। অহনা নিজের সব কষ্ট ভুলে গিয়ে তলপেটে হাত রাখল। ও নিজেকে প্রস্তুত করে নিল এই যুদ্ধে ও জিতবেই। তখন পূর্ব দিগন্ত রাঙিয়ে নতুন সূর্য উঠছে।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!