গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

জুতো কেলেঙ্কারি

নতুন জুতোর কথা বলতেই একটা দারুণ মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন আমি সবে মর্নিং স্কুল শেষ করে ডে স্কুলে পৌঁছেছি। সবে ফোর থেকে ফাইভ এ উঠেছি। জ্যাঠতুতো দিদির হাইহিল জুতো দেখে মায়ের কাছে বায়না ধরেছি – এবার পূজায় আমায় পেন্সিল হিল জুতো কিনে দিতে হবে।
মা তো এমন বকা দিল যে জুতো স্বপ্ন হয়ে গেল। জুতো কেনার দিন যে কোনো কারণেই হোক বাবা আর আমি গেলাম। মা সেদিন কোন কারণে যেতে পারেনি। জুতোর দোকানে ঢুকেই আমি হাই হিল জুতো দেখছি। বাবা আমাকে একের পর এক পাম সু,অন্যান্য ফ্ল্যাট চটি দেখাচ্ছে। আমিতো সেই পেন্সিল হিল নেব। অন্য জুতো পছন্দ হচ্ছে না। অনেক ঘুরেটুরে একটা দোকানে আমার পায়ের মাপে পেন্সিল হিল জুতো পাওয়া গেল। দারুণ দেখতে। এই পেন্সিল হিল জুতোটাই নিলাম। বাড়িতে আসতেই,জুতো দেখে,মোটামুটি মা আর বাবার মধ্যে কুরুক্ষেত্রের একটা ছোটখাটো যুদ্ধ লেগে গেল। পাড়ার বন্ধুদের সবাইকে বলা হয়ে গেল পেন্সিল হিল জুতো কেনার কথা। পাশের বাড়ির কাকিমা,মাকে জ্ঞান দিয়ে চলে গেলেন – এই বয়সেই পেন্সিল হিল জুতো! পাকা মেয়ে।
আমাদের পাড়াতেই দুর্গাপূজা হতো। আমাদের বাইরে যেতে হতো না। সারা পুজো আমরা পাড়াতেই আনন্দ করতাম। একদিন সবাই মিলে বাইরে ঠাকুর দেখতে যেতাম। পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যেবেলা মাকে বললাম,“ মা,একটু জুতোটা বের করে দেবে?” মা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জুতোটা বের করে দিল। ফ্লাট চটি ছেড়ে এই প্রথম পেনসিল হিল জুতো পরা। প্রথমে একটু টাল-মাটাল লাগছিল,পরে মোটামুটি ঠিক হয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সময় কেটে যায়। অষ্টমীতে বাড়ির সবার সাথে ঠাকুর দেখতে বেরোলাম। পায়ে পেন্সিল হিল জুতো। সেদিন তো হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখতে হবে। খানিক যাবার পরেই শুরু হল ফোসকা পড়া। কনোরকমে কষ্ট করে হেঁটে সেদিনটা কাটালাম। রাত্রে এসে দেখি পায়ে বড় বড় ফোসকা। না পারছি কাঁদতে,না পারছি কাউকে কিছু বলতে।
রাত্রেবেলা জ্বালার চোটে ঘুম আসছে না। ভোর রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। সকালে উঠে দেখি পায়ে ভীষণ ব্যথা। মা’কে তো ভয়ে কিছু বলতে পারছি না। মা গরম জল ঠান্ডা জল করে পা ডোবাতে বলল। আস্তে আস্তে কিছুটা ব্যাথা কমল। সন্ধ্যেবেলা পাড়ার পুজো মণ্ডপে যাব। মা জুতো এগিয়ে দিয়ে বললো,“ কিরে পেন্সিল হিল পরবি না!” আমি মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম! মা বলল,“ এবার পর, দেখ পায়ে ফোসকা পড়বে না। আমি সারারাত নারকেল তেল দিয়ে রেখেছিলাম। নতুন জুতো পরার আগে নারকেল তেল দিয়ে দিয়ে রাখবি। তাহলে দেখবি আর ফোসকা পড়বে না।”
তারপর থেকেই শুরু হলো হয়ে গিয়েছিল আমার পেন্সিল হিল জুতো পরা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।