সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রীতা পাল (পর্ব – ৭)

যাও পাখি দূরে
অলোকের হাত থেকে মুখে তোলা রুটিটা খসে পরলো।“ কি বললে মা? কুমারী—”
“ হ্যাঁ,ঠিকই বলছি। আমি তো মা। অসাবধানে যদি কোন ভুল হয়ে থাকে। তোদের তো একটা সম্পর্ক ছিল,তাই।”
“ না মা,আমরা দু’জন দু’জনকে জানার সময়টুকু দিয়েছি যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা না হয়। আর তার থেকেও,ও আমার খুব ভালো বন্ধু। বিয়েই করবো এমন সিদ্ধান্ত তো নিয় নি আমরা। তোমরা হয়তো চেয়েছিলে কিন্তু আমরা একটু সময় নিয়েছিলাম। ওকে আমার ভাল লাগত,ভালবাসতামও। চেয়েছিলাম পরীক্ষাটা শেষ হোক তারপর— আমি হয়তো একটু বেশি সময় নিয়েছিলাম। যে যাকে ভালোবাসে সেকি তার এমন ক্ষতি করতে পারে,মা?”
সন্ধ্যা চুপ করে গেলেন। অলোক খাবার শেষ না করেই উঠে চলে গেল। সন্ধ্যা,ড্রয়িং রুমে রাখা অলকের বাবার ছবিটার দিকে চেয়ে রইলেন। আনমনে বলতে লাগলেন— আর ক’টা দিন থাকতে পারলে না? আজ যে তোমাকে খুব দরকার। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। ছেলেকেও অবিশ্বাস করতে পারছি না। আর ওই মেয়েটা দূরাবস্থাও চোখে দেখা যায় না। তুমি বলো,আমি কি করবো? সবিতা তো ভাবছে এর জন্য অলোকই দায়ী। কিন্তু বাবুতো এত মিথ্যা বলবে না!
চোখের জল মুছতে মুছতে খাবার টেবিল পরিষ্কার করতে লাগলেন। অলোক ল্যাপটপ খুলতে গিয়েও বন্ধ করে দিল। এখন আর কিছু ভালো লাগছে না।
মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা_
টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। বারবার মায়ের ফোন আসছিলো। অলোক মিটিংয়ে থাকায় ফোন ধরতে পারছিল না। মিটিং শেষ হতেই মাকে ফোন করলো। ওদিক থেকে ভেসে এলো মায়ের গলা,“ অলোক একটু গাড়িটা নিয়ে আসবি বাবা? রাত হয়ে গেছে বৃষ্টি পড়ছে। কোন গাড়ি পাচ্ছি না। একটু আসবি? ”
“ আমি যাচ্ছি মা। তুমি একটু অপেক্ষা করো। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। বেরিয়ো না। আমি এক্সাইড হয়ে চলে যাব বেশি সময় লাগবে না।” বৃষ্টির দাপট বেশ বাড়ছে। আজ কুমারীর ওড়িষি ড্যান্সের প্রোগ্রাম ছিল। সেটা দেখতেই সন্ধ্যা এসেছিল। সন্ধ্যাই শুরু করলেন,“ ভাগ্যিস সেদিন আমি দোকানে শাড়িটা ভুলে এসেছিলাম। আনতে গেলাম বলেই তো তোর সাথে দেখা হয়ে গেল—-”। দু’জনেই স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সবিতা,সন্ধ্যা কলেজের বন্ধু। দু’জনেই রামমোহন কলেজে পড়তো। সবিতা ছিল বাংলায় অনার্সে আর সন্ধ্যা জিওগ্রাফিতে। সবিতা থাকত আর্মস্ট্রিটের কাছে। আর সন্ধ্যা থাকতো ব্যারাকপুরে। স্টেশন থেকে আরো আধঘণ্টা লাগতো বাড়ি ফিরতে। অনেকটা সময় যাতায়াতে নষ্ট হতো তারপর অফিস টাইমে ট্রেনের ভিড়। সন্ধ্যার একটু সমস্যাই হত। কলেজের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে কবিতা কোলাজ হবে। সবিতা,সন্ধ্যা দু’জনেই অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু সন্ধ্যা কিছুতেই সময়মতো রিহার্সালে আসতে পারছে না। সবিতা প্রধান দায়িত্বে। এখান থেকেই ওদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় হয়। একদিন সবিতা,সন্ধ্যাকে ডেকে বলে,“ আমার বাড়ি তো কাছেই আর আমাদের পুরনো আমলের সাবেকি বাড়ি। আমরা অনেক ভাই বোন একসাথে থাকি। প্রোগ্রাম না হওয়া অবধি আমাদের বাড়িতেই থেকে যা। আমি আমার মা বাবাকে বলব। তুই তোর বাড়িতে বলে দেখ। ওনারা কি বলেন?” সন্ধ্যার চোখের কোণটা ভিজে গেল। সবিতার চোখ এড়ালো না। সেদিন রিহার্সাল শেষ হতে বেশ সময় লাগল। কলেজের একটি ছেলে খবর দিল- তেলের দাম বাড়া নিয়ে শিয়ালদায় খুব গন্ডগোল হচ্ছে। কোন এক বিশেষ রঙের সক্রিয় কর্মীরা ট্রেন অবরোধ করেছে। সন্ধ্যা পড়ল বিপদে। কি করে বাড়ী ফিরবে। সন্ধ্যার অবস্থা দেখে সবিতা বলল,“ তুই আমাদের বাড়িতে চল। বাড়ি গিয়ে ল্যান্ড ফোন থেকে তোদের বাড়িতে ফোন করে দিস।”
ক্রমশঃ