গল্পেরা জোনাকি তে ঋতশ্রী মান্না

বেলদা উবাচ

আমরা তখন সদ্য কলেজগোয়িং– চোখের সামনে ঝপাস ঝপাস করে লোকজন প্রেমে পড়ে যাচ্ছে–চেনা বান্ধবীরা ফুচকা খাওয়ার সঙ্গী খুঁজে নিয়ে অচেনা হয়ে উঠছে হঠাৎ করেই–সেসময় আমরা প্রেমে না পড়া মানুষজন দুঃখ দুঃখ মুখ করে কলেজ আসি যাই,লোকজনের প্রেমপত্র লেখার ধুমের মধ্যে মনের বেদনা মনেই চেপে রেখে দিস্তা দিস্তা প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখি।
সরস্বতী পুজো,টিউশন স্যারের মায়ের অসুস্থতায় হঠাৎ ছুটি,কলেজমাঠের সায়েন্স ফেয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি অকেশন তখন আমাদের দুঃখযাপনের দিন।
সে ছিল এমনই এক দুঃখদিনের বিকেল–আবেগতাড়িত হয়ে আমার এক বান্ধবী তার মনোবেদনা ব্যক্ত করে ফেলে আমাদের কাছে– পাড়ারই এক দাদাকে তার বহুদিন ধরে ভালো লাগে,কিন্তু অদ্যাবধি সে বলে উঠতে পারেনি।
এই ভালোলাগার সূচনাপর্বটি ছিল বেশ ইন্টারেস্টিং।
দাদাটির বাড়িতে একটি বেলগাছ ছিল,বেল পাকতে উক্ত দাদার মা, সেই বেল দাদাটির হাত দিয়ে আমার বান্ধবীর বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। বেল পড়ার সাথে প্রেমে পড়ার যে একখানা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে,তা সেই প্রথম আমাদের অনুভূত হল।

সেই এক বেলগন্ধে আমোদিত বিকেলের সাক্ষাতেই বান্ধবীটির মনের অন্দরে ফুটে ওঠে ভালোবাসার বিল্বপত্রাঞ্জলি…
এ খবরে আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে বেশ একটা দোলা লাগল। বিল্বপত্রাঞ্জলি প্রস্তুত যখন,নিবেদন তো কেবল সময়ের অপেক্ষা…

কথায় বলে,বেল পাকলে কাকের কী?
বেল পাকলে কাকের কিছু যায় আসুক বা না আসুক,এবার থেকে আমাদের ভারি যায় আসতে লাগল।

এই ঘটনার পর থেকে বেল সম্পর্কে আমাদের অনুসন্ধিৎসা যারপরনাই বৃদ্ধি পেল। বেল অতিশয় উপকারী ফল,শাস্ত্রে একে শ্রীফল বলা হয়। কাঁচাবেলে আমাশয় সারে। পাকাবেলের শরবত খেলে শরীর ঠান্ডা হয়। বেল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে–ইত্যাদি ইত্যাদি– বেল সংক্রান্ত যা যা জ্ঞান লাভ করা সম্ভব, স্বল্পকালের মধ্যেই তা তা আহরণ করা সম্পূর্ণ হল।

জ্ঞান আহরণ করাই যথেষ্ট নয়,তার বাস্তব প্রয়োগও ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং -আহৃত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য মাঝেমধ্যেই আমাদের বেলপাতা,বেল ইত্যাদির প্রয়োজন পড়তে লাগল। পাড়ায় পূজোপাঠ,আমাশয়,কোষ্ঠকাঠিন্য প্রভৃতির প্রকোপ হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেল।
পাড়ায় একটিই বেলগাছ। সুতরাং সমস্ত আশু বিপদ ও প্রয়োজনে তিনিই বিপদত্তারণ হয়ে অবতীর্ণ হতে লাগলেন।
বেলপাতা বা বেল সংগ্রহের অছিলায় প্রায়শই চারিচক্ষের মিলন ঘটতে লাগল। বেল এবং বেলপাতা,কোনোটিই আমাদের হাতের নাগালে না থাকায় উক্ত দাদা-কেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হচ্ছিল।

সাহায্যকারীর দুই হাত ও সাহায্যপ্রার্থীর দুটি হাত,এই চারহাত যে এক হবেই কোনো না কোনো শুভক্ষণে,এ বিষয়ে আমরা ক্রমে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠছিলাম।

বেলের অপার মহিমায়,উক্ত দাদা আমাদের মহিলামহলে ‘বেল-দা’ বলে খ্যাতিলাভ করলেন। তার আসল নাম আমরা প্রায় বিস্মৃত হলাম।

বেল-দার কথা উঠলে বান্ধবীর গাল পূর্বাপেক্ষা অধিক থেকে অধিকতর রক্তিম হয়ে উঠতে লাগল।
বেলপাতা বা বেল সংগ্রহের অছিলা ছাড়াও প্রাতর্ভ্রমণকালে, পরিচিতদের বিবাহানুষ্ঠানে,টিউশন পড়ে ফিরবার কালে উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটতে লাগল।

সবকিছুই ঠিকঠাক,বেল-দাই যে কেবল চক্ষুলজ্জা কাটিয়ে উঠে প্রেমপ্রস্তাবটুকু দিতে পারছেনা,এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহই রইলনা।

এই প্রেমোপাখ্যানের চূড়ান্ত সফল অনুঘটক হিসেবে আমাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে যাওয়া তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, এসময়ই এল সেই দুঃসংবাদ!
বেল-দার মা স্বয়ং সেই সংবাদ বহন করে আনলেন বান্ধবীটির গৃহে,–বেল-দার বিয়ে স্থির হয়েছে। পাত্রী বেল-দার পূর্বপরিচিত।

বেল-দার এমন মীরজাফরীয় আচরণ আমাদের স্বপ্নাতীত ছিল। বেল-দাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আমাদের যাবতীয় আশা আকাঙ্ক্ষার সৌধ মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
বেল-দার এহেন বিশ্বাসঘাতকতায় আমাদের হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। সেই থেকেই বেল এবং ঘটকালি উভয়ের প্রতিই আমার আগ্রহ চিরতরে লুপ্ত হয়েছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।