গল্পেরা জোনাকি তে ঋতশ্রী মান্না

রক্তকরবী এবং রডোডেনড্রন
সমাধানহীন রহস্যের মত রাত্রি নেমে আসে এখানে,কথা ডুবে যায়। অদ্ভুত একাকীত্ব,নীরবতা সমস্ত এসে শৈত্যের মত জড়িয়ে ধরে।
শহর থেকে বহুদূর,প্রায় দুর্গম পথ,জনপদ পেরিয়ে এসে জনবিরল পাহাড়ের কোলে এই নির্জন হোমস্টে।
রুমের সামনের ব্যালকনিতে একটা চেয়ার পেতে বসে থাকতে থাকতে পৃথার কেবল একটাই কথা মনে হচ্ছিল বারবার,আচ্ছা,একা হতে ভয় পাওয়া মানুষজন পাহাড়ে এসেছে কি কখনও?
আজ হোমস্টের সামনের ফাঁকা চত্বরে ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করছে জনাকয়েক ছেলেমেয়ে। ঘন কালো অন্ধকারে ডুবে আছে চারিপাশ, বহু নীচে কোন্ দূরে অজস্র থির জোনাকির মত আলোকবিন্দুতে ছেয়ে আছে কালিম্পং।
আগুন জ্বলছে,তাপমাত্রার পারদে হাত সেঁকে নিচ্ছে সকলে।
যে নেপালি ধাঁচের মুখের, মাথায় কমলা স্কার্ফ মেয়েটি গতকাল তার রুমে চা,স্ন্যাকস্ পৌঁছে দিয়েছিল, তার আদুরে লোমশ বিড়ালটা কখন গুটিগুটি এসে ব্যালকনিতে পৃথার পায়ের কাছে বসে আছে,উষ্ণতার খোঁজে। ওর নাম জেনেছে গতকাল,পু।
হঠাৎ ইচ্ছে করেই ওকে ডাকে পৃথা,পু…..উ
এ পাহাড়,ও পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে,পু-উ-উ-উ-উ।
কোথাকার ডাক ডানা মেলে কোথায় উড়ে যায়! কদ্দূর যেতে পারে ডাকেরা?
পৃথা ভাবছিল,আচ্ছা,যদি এখন, এই ঘন হয়ে ঝুঁকে আসা রাত্রি,জ্বলন্ত আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে তোমায় চিৎকার করে ডাকি,অ-র-ণি…
সে ডাক কতদূর যাবে? পৌঁছবে কি কখনও সঠিক ঠিকানায়? নাকি এক বিরান মানুষের ডাক সুকঠিন পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে, গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে, ভেঙে ছড়িয়ে পড়বে উদাসীন নির্জনতার কোলে?
প্রাচীন কুয়াশা ঘেরা ওই দূরের পাহাড়েরা,
তার সব ডাক আজীবন নিরুত্তর ফিরিয়ে দেবে বলেই কি এমন নিস্তব্ধ নিসর্গ জুড়ে বিস্তৃত হয়ে আছে এতকাল?
পাহাড়ের পাথুরে শরীর ছাড়িয়ে দূরে আকাশে প্ররোচনার মত জেগে আছে পূর্ণচাঁদ।তার আলো মেখে জেগে আছে ঘোরলাগা পাইনের বন। নীচে কুয়াশার আঁচলে তরল অন্ধকার ঠেলে ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলছে আগুনের ফুল। হাওয়ায় থৈ থৈ নেচে উঠছে তার রক্তিম শিখা।
আগুন ঘিরে জড়ো হওয়া ছেলেমেয়েগুলো গান গাইছে,–
“মেঘপিওনের ব্যাগের ভেতর মনখারাপের দিস্তা
মনখারাপ হলে কুয়াশা হয়,ব্যাকুল হলে তিস্তা।
মনখারাপের খবর আসে বনপাহাড়ের দেশে…”
আগুনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে দৃষ্টিসীমা জুড়ে সবকিছু ধোঁয়ার কাঁচে আবছা হয়ে আসে…
“আসুন না দিদি,জয়েন করুন আমাদের সাথে…” পৃথাকে ডাকে ছেলেমেয়েগুলো।পৃথা হাসে,সামান্য অস্বস্তি প্রকাশ পায় তার আচরণে।
দুটো মেয়ে এবার গ্রাউন্ড থেকে ব্যালকনিতে উঠে আসে,”আসুন না, ভালো লাগবে।”
অস্বস্তি কাটিয়ে নেমে আসে পৃথা,আগুন ঘিরে থাকা বৃত্তাকার চেয়ারের সজ্জার খালি একটিতে বসে পড়ে। ওরা আবার গানে মেতে ওঠে। ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে ভালোই লাগছে,বেশ জড়তাহীন,বাধাবন্ধহীন পাহাড়ি ঝোরা যেন।
প্রাথমিক আড়ষ্টতা কাটিয়ে পৃথাও গানে গল্পে যোগ দেয় ওদের সাথে।দিদি,আপনি থেকে ওরাও নেমে আসে পৃথাদি,তুমি-তে।
কাল ভোরে সানরাইজ দেখতে যাবে ওরা,কে কাকে ঘুম থেকে তুলবে সেই নিয়ে চলছে হাসাহাসি।
পৃথার রুম পেরিয়ে কিচেন,তার ওপাশে ওদের রুম। পৃথা হাসল,”ঠিক আছে,আমি ভোরেই উঠি,ডেকে দেব নাহয়।”
ওয়াও–উল্লাসে ফেটে পড়ে একঝাঁক চঞ্চল মুখ,”আপনিও যাবেন তাহলে আমাদের সাথে।”
পৃথা হাসে,”সে নাহয় হবে।কিন্তু তার জন্য আজ তাড়াতাড়ি ডিনার করে শুয়ে পড়তে হবে।অলরেডি টেন থার্টি কিন্তু -“
পাহাড়ে কেউ বেশি রাত অবধি জেগে থাকেনা এমনিও। কিচেনে সেই কমলা স্কার্ফ মেয়েটি ছাড়া সকলেই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছে।
রাতের আয়োজন সামান্যই।রুটি,আচার আর স্কোয়াশের তরকারি। খেতে খেতে পৃথা ভাবছিল,পাহাড় কি একাই জাগে সারারাত? নাকি ঘুম যায় মেঘের চাদরে ঢেকে,তারপর রাত পোহালে সূর্য এসে ঘুম ভাঙায় তার?
দেবর্ষি,কুশল,তীর্থ,দীপ্ত,হিয়া,রাজন্যা একসাথে কলকল করতে করতে রুমে গেল।যাওয়ার আগে দীপ্ত মনে করিয়ে দিয়ে গেল,”পৃথাদি,তুলে দিও কিন্তু। নাহলে কাল পাহাড়ি রাস্তায় মর্নিং ওয়াক আর সানরাইজ দুটোই মিস হয়ে যাবে।”
হালকা হেসে রুমের দিকে এগোয় পৃথা। চারপাশে পাহাড়ে পাহাড়ে গাঢ় হয়ে ঝুঁকে আসছে অন্ধকার। রাত্রির নৈঃশব্দ্যে মিশে যাচ্ছে পাহাড়ি মায়াস্তব্ধতা। পৃথা হাল্কা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,অরণি একসাথে কোনো পাহাড়ি মনকেমনের রাস্তায় কখনো হাঁটা হলনা আমাদের…
অরণি ভাবো,যদি এমন হত–খুব ভোরে,আমি কালো সোয়েটারে, তুমি সবুজ-সাদা পুলওভার আর সাদা হাতমোজায় পাশাপাশি সানরাইজ দেখব বলে হাঁটছি কোনে পাহাড়ি রাস্তায়। রাস্তার একপাশে উঁচু উঁচু পাইনগাছের বন,আর একপাশে লাল রডোডেনড্রনের সারি,লাল,নীল,সবজ,হলুদ রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগস ছুঁয়ে মুখে এসে লাগছে মেঘ। সূর্য ওঠার অপেক্ষায় পূবে চেয়ে আছি।
একটা পরিত্যক্ত বাড়ি,নির্জন পাথরের দেওয়াল,নীচু কাঠের ছাদ,তার সামনে নাম না জানা নরম আলোর মত সাদা ফুলের গাছ,খুব আস্তে আস্তে তার উল্টোদিকের ধূসর আকাশের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসছে সূর্যের লালচে কুসুম। ঘুমের ঘোরলাগা আলো এসে পড়ল পরিত্যক্ত বাড়ির গায়ে,সাদা ফুলের গোছায়…তোমার সবুজসাদা পুলওভারে…পেছনে ঢেউয়ের মত সবুজ পাহাড়,তারও পিছনে নীল পাহাড়,তার পিছনে আবার পাহাড় ,জলে ধোওয়া রং-এর মত হাল্কা হয়ে এসেছে সে পাহাড়ের নীল,তারপর ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ… অদ্ভুত একটা ফ্রেম…সূর্য আর পাহাড়ের ঘুম একসাথে ভাঙছে…
জানালার পর্দা সরায় পৃথা,দূরে ঘন পাইনের বন,,,গাঢ় অন্ধকার আর তার গায়ে জ্বলে থাকা হলুদ আলোকবিন্দুরা মিলেমিশে বুনেছে কী অদ্ভুত মায়াময় আলোছায়ার নকশা!
জানালার বাইরে ব্যালকনির নীচে গিয়ে পড়ছে তার ঘরের ত্রিকোণাকার আলোটুকু। সেই আলো গায়ে মেখে,বিস্তৃত ঘুমের অন্ধকার স্থির বুকে, লাল হয়ে জেগে আছে একটা ঘুম না আসা খেয়ালী রডোডেনড্রন।
পৃথার মনে পড়ে,সেজদাদুর ঘরের দেওয়ালে একটা ছবি ছিল–পাহাড়ী টিলা,রাস্তার বাঁকে সাহেব আর মেম হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে,পেছনে রক্তিম রডোডেনড্রন,একপাশে গভীর খাদ–দিদার হাতে বানানো,মাছের আঁশ আর তুলো দিয়ে।
দোতলায় সেজদাদুর সেই ঘরে বসেই অরণি তাকে প্রথম মোঁপাসা পড়িয়েছিল। বাইরে হঠাৎ ঝেঁপে বৃষ্টি এল সেদিন,হু হু হাওয়া, পাওয়ারকাট।
এক আদ্যোপান্ত ভীরু সমতলের ছেলে সেই সন্ধেয় চিনেছিল পাহাড়ি টিলা,বৃষ্টিমুখর বাঁক আর দুঃসাহসিক খাদ।
জানালার বাইরে তখন ভেজা হাওয়ায় দুলছে রক্তকরবী অথবা রডোডেনড্রন–পৃথিবীর যাবতীয় গোপন পাপ লালে লাল হয়ে ফুটে আছে।
সেসব গল্পের গা বেয়ে সময় গড়িয়ে গেছে জলের মত -তাদের গায়ে প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর শ্যাওলা–গাঢ় থেকে গাঢ়তর অথৈ বিষাদ।
ঝুরোঝুরো হয়ে ভেঙে যেতে যেতে কবে যেন হাওয়ায় মিশে গেছে পুরনো গল্পগাছা।
হারিয়ে গেছে সময়ের হিসেব ভুলে যাওয়া সেই বৃদ্ধ দেওয়ালঘড়ি, সেই প্রবীণ পিয়ানো,মাছের আঁশ আর তুলোর তৈরি সেই সাহেব-মেম।
সেজদাদুর মোঁপাসা রচনাবলীর শরীর থেকে ন্যাপথলিনের গন্ধ উড়ে গেছে উদাসী হাওয়ায়,বৃষ্টির জলে ভেসে গেছে তার হলদে পাতারা।
রক্তকরবী গাছটাও শুকিয়ে গিয়েছিল।
ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁয়েছে কখন যেন।বাইরে মেঘের ডাকে সম্বিৎ ফেরে পৃথার। দেখে,প্রবল হাওয়ায় উথালপাথাল হচ্ছে রডোডেনড্রন। দূরে পাহাড় ছুঁয়ে ছুটে আসছে বৃষ্টি,, অঝোর ধারায় ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে সব,দূরবর্তী হচ্ছে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসা রডোডেনড্রন।
পর্দাটা টেনে দিতে দিতে স্বগতোক্তির মত ফিসফিস করে পৃথা,”অরণি,আর কেউ জানবেনা কোনোদিন,কিন্তু তুমি তো জানো,গাছও আত্মঘাতী হয় অভিমানে–আসলে শরীরময় পাহাড়ি মেঘ,হঠাৎ বৃষ্টি নিয়ে সমতলের রক্তকরবী আসলে তো এমনই একটা পাহাড়ি রডোডেনড্রন হতে চেয়েছিল!”