সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রিতা মিত্র (পর্ব – ২)

মেদলা ওয়াচ টাওয়ার
এবার গাইড মহাশয় বলল টাওয়ার একটু দূরে। যদিও আমরা টাওয়ার দেখতে পাচ্ছি। ততটা হেঁটে যেতে হবে। মিনিট দুই লাগবে। মেঠো পথ ধরে হাঁটা আরম্ভ করলাম চারিদিকে গাছ। তার শুকনো পাতা পড়ে আছে পথে। খচখচ শব্দ হচ্ছে পায়ের নিচে পড়ে।
আমাদের ডানপাশে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের জন্য দেখতে পাচ্ছি না তবে জলের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
অবশেষে ওয়াচ টাওয়ার এর পাদদেশে এসে পৌঁছলাম। গাইড বলল উপরে উঠুন আস্তে আস্তে কেননা টাওয়ারের সিঁড়ি পেচানো পেচানো। আমার দিদি বলল তোরা যা আমি যেতে পারবনা।
দুই ছেলে দৌড়ে উঠে পড়ল। আমি আর পাপিয়াদি হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছলাম।
আহা কী অপরুপ দৃশ্য। যতদূর নজর যায় একদিকে সবুজ ঘন জঙ্গল আর নদীর ওপারে লম্বা ঘাসের জমি। ঘাসগুলো ধূসর রঙের। তার ওপারে আর কিছু চোখে পড়ে না।
হঠাৎ গাইড বলে উঠল ওই দেখুন গন্ডার। দেখতে পেলাম দুটো গন্ডার ঘাস জমি ছেড়ে নদীর জলে নামছে। সন্দীহান দৃষ্টিতে কী যেন দেখছে চারদিকে। ধীর লয়ে দুজনে জলে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর জল খেয়ে এপারের ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেল। কয়েটা ছবি তুললাম কিন্তু তাতে কিছু স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই। চুপ করুন, আস্তে কথা বলুন। দেখুন একদল হরিণ নদীর চরে নামছে। তারা জল খেতে এসেছে।
সত্যি সত্যি একদল হরিণ খুব সজাগ দৃষ্টি রেখে চরে নামতে লাগল। বেশিরভাগ ভাগ চিতল হরিণ। হঠাৎ কীসের গর্জন শোনা গেল বাতাসে। ব্যস হরিণ গুলো এক লাফে উধাও। কিসের গর্জন। আমরাও একটু ভয় পেয়েছিলাম বটে। গাইড বলল চিতাবাঘ। মানে লেপার্ড এর ডাক। যদিও চাক্ষুস দেখা হলনা তাকে।
আবার ধীরে ধীরে হরিণ গুলো জলের কাছে এলো। জল খেল। কয়েকটি হরিণ অল্প বিশ্রাম নিলো বালিতে বসে। তারপর আবার হারিয়ে গেল ঘাসবনে।
দূরে কয়েকটি কালো বিন্দু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ঠাওর করতে পারছিনা সেটা কী। গাইড বলল বাইসনের দল। ঘাস খেতে
মগ্ন।
বেশ কয়েকটি ময়ুর আপন মনে কি যেন খুটে খাচ্ছে। আর আমাদের বাঁহাতের দিকে যে সবুজ জঙ্গল সেখান থেকে হাতির ডাক শোনা যাচ্ছে। গাইড বলল কুনকী হাতি। ফিরছে ঘরে। সত্যি বেশ কয়েকটি হাতি ফিরল। মাহুত বাবাজি পিঠে বসে আছে। মাঝে মাঝে হীট হীট বললে কী ইঙ্গিত করছে কে জানে তবে হাতি বাবাজি ঠিক বুঝে যাচ্ছেন। এক ফালি সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা যেন। তার মধ্যে সিমেন্ট বাধানো একটা বেদি। গাইড বলল পশু পাখির জন্য ওই বেদিতে লবণ রাখা হয়। বেশ কয়েকটা শুকর ঘুরছে। লবণ চাটছে। ঘাস খাচ্ছে মাঝে মাঝে গুঁতোগুঁতি করছে নিজেদের মধ্যে
সাদা বকগুলো গুকরের পিঠে বসে মুফ্ত কী সওয়ারির লাভ তুলছে। ছোটো ছোটো কত পাখি ওই বেদির উপর এসে বসলো। কী জানি কী পাখি! তবে উড়তে পারে যখন তখন তো পাখি বটেই।
একটা বাঁশপাতি পাখি টাওয়ারের সামনের গাছে ডালে এসে বসল। বেশ ছবি পেলাম। ফুরুত করে উড়ে যায় বাতাসে ডিগবাজী খায় আবার ডালে এসে বসে। লক্ষ করলাম প্রতিবার তার ঠোঁটে একটি করে ফড়িং থাকে। ডিনার সেরে ফেলছে সে।
টেঁ টেঁ করে একঝাঁক টিয়াপাখি উড়ে এসে সবুজ ঝাকড়া গাছে এসে বলল। সব সবুজে সবুজ। আলাদা করে চেনা বড়োই কঠিন।
একজোড়া ধনেশ পাখি আমাদের পেছন দিকের গাছে এসে বসলো। সেই মগডালে। চোখ ধন্য হল দেখে।
এবার নেমে আসার জন্য বলল গাইড। অন্ধকার হতে দেরি নেই তার আগে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।
আবার সেই মোষের গাড়ি চড়তে হল নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিল। আমরা জীপসি তে উঠে পড়লাম। পাথুরে পথে গাড়ি চলতে লাগল। অন্যদিন হলে এখানে গ্রামে আদিবাসী নাচ দেখানো হয়। তার পয়সা টিকিটের সঙ্গে কেটে নেওয়া হয়। আজ বন্ধ। আর আমাদের নাচ দেখার ইচ্ছে ছিল না। গ্রাম পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের পথে গাড়ি ছুটছে। পথের দুই ধারে অজস্র জোনাকি। ঝোপঝাড় আলোকিত করে রেখেছে যেন দেওয়ালির টুনিবল্ভ জ্বলছে। কত বিকট পোকামাকড়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
আমরাও আনন্দে আত্মহারা। গল্পে মশগুল। হঠাৎ গাড়ি ঝাকুনি দিয়ে থেমে গেল। আমরা দুজন দাঁড়িয়ে ছিলাম টাল সামলাতে পারলাম না অনেকটা সামনে ঝুকে ঝটকা খেয়ে পেছনে হেলে পড়লাম। সামনে গাড়ির রড দিয়ে পাঁজরে লাগল একটু। কী হল? কেন হল? । গাইড ধমক দিয়ে বলল একদম চুপ। সামনে দেখুন একদল বাইসন।
সবাই জানে বাইসন সাংঘাতিক প্রাণী। রেগে গেলে তেড়ে আসবে। দূর্ঘটনা ঘটাতে এক মিনিট সময় নেবে না। গাড়ির ইন্জিন বন্ধ করে লাইট অফ করে দেওয়া হল। প্রতাপ ততক্ষণে ভয়ে দিদির সিটের তলায় ঢুকে আমাকে বাঁচাও বলে কাঁপতে আরম্ভ করেছে। ভয় যে আমি পাইনি তা বলছি না তবে রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি মনে হচ্ছে।নিজেকে বীর পুরুষ না ভাবলেও বীরাঙ্গনা ভাবতে বাধা কোথায়? মোবাইল এর নাইটমোড অন করে ক্যামেরায় ভিডিও করতে লাগলাম। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু জোনাকীর আলো নীভছে জ্বলছে। পোকামাকড়দের কোরাস। শুকনো পাতার খরখর ধ্বনি এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে। ভয় হচ্ছে যদি হাতির পাল এসে পড়ে। যদি গাছ থেকে লেপার্ড ঘাড়ে লাফ মারে তখন কী করব? বাবারে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ নিজের কানে লাগছে। তবুও ক্যামেরা অন।
দেখতে পেলাম আমাদের বাঁদিকে জঙ্গল থেকে একদল বাইসন রাস্তা পেরোনোর তোড়জোড় করছে। দলে কয়টা বাচ্চা আছে। একটা বাইসন একটা গাছের গুড়ির আড়াল থেকে আমাদের উপর লক্ষ রাখছে। একবার গুড়ির এপাশ থেকে তো একবার ওপাশ থেকে দেখছে। যেন মনে হয় লুকোচুরি খেলছে।
তারপর একটা বেশ বড়োসড়ো আকারের বাইসন রাস্তার উপর এসে দাঁড়াল। চারিদিকে নিরিক্ষন, পর্যবেক্ষণ করছে খুব সতর্ক দৃষ্টি রেখে। বুঝলাম ইনি দলপতি। তার কাঁধে পুরো দলে সুরক্ষার দায়িত্ব। সে কর্তব্য পরায়ন দলপতি। নিজের কাজ সুচারু রুপে সম্পন্ন করতে সচেষ্ট।
হালকা একটা আওয়াজ। তারপর পরপর কতগুলো বাইসন যে রাস্তা পেরোলো গুনতে পারিনি। বাধ সাজল একটা বাচ্চা বাইসন। সে হঠাৎ পথের মধ্যে শুয়ে পড়ল। হাঁপিয়ে গেছে বোধ হয়। কিন্তু এবার। গাইড বাবাজিও চিন্তায় পড়ল। বলল যতক্ষণ না শিশু বাইসন ঘুম থেকে উঠছে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বাইসনের দল। আর আমাদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এখন রাত। পুরো জঙ্গল এখন পশুদের দখলে।
মিনিট কত কাটল জানিনা। ভয়ে ঘড়িও দেখিনি। গাড়ির ইঞ্জিন চালু করা হল। হেডলাইট জ্বালানো হল। তখনও শিশু বাইসন শুয়ে আছে। দু তিনবার গাড়ির ইঞ্জিন এর শব্দ করা হলে মা বাইসন শিশুটিকে পা দিয়ে খোঁচা দিতে আরম্ভ করল। একটু পরে বাচ্চাটি উঠে দাঁড়াল তারপর ধীরে ধীরে পাশের ঝোপে ঢুকে পড়ল। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু গাইড জানাল বাইসন খুব চালাক। তারা একদম চুপটি করে পথের ধারে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে হামলা করে।
আমাদের গাড়ি এগোতে লাগলো। আমরা লক্ষ করলাম পথের ধারের ঝোপে জোড়া জোড়া চোখ জ্বলছে। গাইড বলল দেখছেন তো বাইসন গুলো ধারেই রয়েছে গায়ের রঙ এত কালোযে দিনের আলোতেই দেখা সম্ভব না এখন তো অন্ধকার রাত। বাইসনদের কাছাকাছি এসে জোরে জোরে ইঞ্জিন এর শব্দ করতেই বাইসন গুলো চমকে উঠে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। আমাদের গাড়ি তখন অনেকটা পক্ষিরাজের ঘোড়ার মতো ছুটছে। পাথুরে রাস্তায় আরো জোরে শব্দ হচ্ছে।। মনে হচ্ছে কত তাড়াতাড়ি জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারি।
অবশেষে টিকিট কাউন্টারের গেটে এসে গাড়ি থামল। আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এক অদ্ভুত অনন্য অনুভূতি নিয়ে হোটেলের দিকে যাবার পথ ধরলাম।