আসাদ সাহেব একজন সাধারন চাকুরীজীবি মানুষ৷ তাঁর উপার্জনে চারজন মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়৷ আটপৌঢ়ে জীবন নিয়েই তিনি নিজেকে পৃথিবীর সুখী মানুষ ভাবেন৷ ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি, নাট্য চর্চাসহ ভাল ফুটবলার ছিলেন৷ ইচ্ছে ছিল বড় কিছু হবেন৷ দারিদ্র্যের কারণে কিছুই হয়ে উঠেনি৷ পরিবারের প্রতি কর্তব্য ও নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগান দিতে কখন যে সব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে৷ বুঝেননি৷ এখন শুধুই অসংখ্য স্বপ্নের মৃতদেহের সাথে তাঁর সহবাস৷ বাহিরে প্রকাশ করেননা৷ নিজের সীমাবদ্ধতা লুকানোর জন্য ইদানিংকালে তিনি লেখালেখির দিকে মনযোগি বেশী৷ এজন্য স্ত্রী’র কথা শুনতে হয় অবিরত৷ নির্বিকার থাকেন৷ তবে তিনি নির্বোধ বা দূর্বল চিত্তের নন৷ অত্যন্ত যুক্তিবাদী, সংগ্রামী ও প্রতিবাদী মানুষ৷
আসাদ সাহেবের দু’টি সন্তান৷ বড়টি ছেলে নাম আবীর আর পুচ্চিটা মেয়ে নাম আশকারা৷ কী সুন্দর যে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বলে মেয়েটা৷ প্রাণ জুড়িয়ে যায়৷ এদের জন্য বহুদিন৷ অযুত-নিযুত বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে৷ ছেলেটি যেমন মেধাবী তেমনি চঞ্চল৷ বলা যায় দূরন্ত৷ ও যেটা আবদার করবে সেটা তাকে এনে দিতেই হবে৷ মাঝে মাঝে ভীষণ রাগ হয়৷ পরক্ষণে মনে হয় এরাতো পিতা-মাতা’র সীমাবদ্ধতাই বুঝতে শেখেনি৷
আবীরের বয়স তখন চার বছর হবে৷ ও জেদ ধরলো৷ ওকে সাইকেল কিনে দিতে হবে৷ বন্ধুদের দেখেছে৷ ওকেও সাইকেল দিতে হবে৷ আসাদ সাহেব হাসতে লাগলেন৷ হাসি দেখে তাঁর স্ত্রী জানতে চাইলে বললেন৷ ওর থেকেতো সাইকেলই বড় হবে৷ চালাবে কী৷ হা হা হা৷ জেদ দেখে আসাদ সাহেব ছেলেকে বোঝালেন ঠিক আছে আগামী মাসে যেভাবেই হোক তোমাকে সাইকেল এনে দেব বাবা৷ মন খারাপ কোরোনা৷
ক’দিন পর আবীরের প্রবাসী মেজ চাচা দেশে আসলেন৷ উনি দীর্ঘদিন যাবৎ বিদেশে আছেন৷ বছর কয়েক পর পর দেশে আসেন পরিবারের সাথে দেখা করতে৷ শহরের বিভিন্ন এলাকায় তিনি প্রচুর সম্পদ করেছেন৷ বড় চাচা চাকরি করেন৷ তিনিও বিত্তবান৷ অন্য চাচারা ব্যবসা করেন৷ আবীরের মেজ চাচা সকলকে দাওয়াত করলেন৷ সে-তো ভীষণ উদগ্রীব৷ কবে মেজ চাচার সাথে দেখা হবে৷ নির্দিষ্ট দিনে আসাদ সাহেব স্বপরিবারে মেজ ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলেন৷ বেশ মজা হলো৷ খাওয়া-দাওয়া, গল্প-গুজব হলো৷ সময়টা বেশ কাটছিল৷ হঠাৎ আবীরের মেজ চাচা বললো “বল তুই আমার কাছে কী চাস?” আসাদ সাহেবের সন্তানেরা বাবা-মা ছাড়া কখনো কারো কাছে কোন আব্দার করে না৷ পরিবার থেকে সে শিক্ষাই দেয়া হয়েছে৷ তাই ওরা কিছুই চাইলো না৷ শুধু বললো জানো মেজ”চা আগামী মাসে বাবা আমাকে সাইকেল কিনে দেবে৷ মেজ চাচা বললো, লাগবে না বাবা বরং আগামী বছর আমি আবার দেশে আসলে তোকে সাইকেল কিনে দেব৷ একথা শুনে আসাদ সাহেব ভীষণ অপমানিত বোধ করলো৷ একজন সদ্য বিদেশ ফেরত ব্যক্তি, যার কিনা অর্থের সংকট নেই৷ তিনি তার ভাস্তেকে একটা সাইকেল কিনে দিতে আরো একবছর প্রবাস কাটাতে হবে? অপমানে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে৷
পরের দিন আসাদ সাহেব সহকর্মির কাছে টাকা ধার করে ছেলেকে কিনে দিল সাইকেল৷ ছোট্ট ছেলে৷ সাইকেল চালাতে গিয়ে না পড়ে যায়৷ সেজন্য দু’দিকে বাড়তি চাকা৷ সামনে বাস্কেট৷ আরো কত কি৷ নতুন সাইকেল পেয়ে আবীর প্রথমদিনতো ঘুমাতেই পারলোনা৷ বার বার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে৷ খাটের সামনে সাইকেল স্ট্যান্ড করে রেখে তাকাচ্ছিল৷ ওর চোখে-মুখে যে কী আনন্দ৷ সেটা শুধু পিতা-মাতাই বোধ হয় বুঝতে পারে৷
এখন আবীর অনেকটা বড় হয়েছে৷ ক্ল্যাশ ফোরে পড়ে৷ ছোট্ট সাইকেলটা পড়ে আছে৷ ওটা আর ও চালাতে পারেনা৷ এখন ওটা শুধুই খেলনা৷
টাঙ্গাইল থেকে পরিচালিত “মাহীন ক্যাডেট স্কুল ও কলেজ” রংপুর জেলায় একটি শাখা আছে৷ স্কুলের পরিচালক মাহীন সাহেব অত্যন্ত ধর্মীয়মনা হিসেবে পরিচিত৷ আসাদ সাহেবের দু”টি সন্তানই এ স্কুলে অধ্যয়ন করে৷ দু’জনই কৃতি শিক্ষার্থী৷ বাবা’র কাছ থেকে তারা স্পোর্টস, শিল্প-সংস্কৃতি’র সাধারণ ধারণাগুলো পেয়েছে৷ বিশেষ করে আবীর সুন্দর আবৃর্ত্তি করতে পারে৷ অসাধারণ উপস্থাপনা তার৷ একবার “মাহীন শিক্ষা পরিবার” দেশব্যাপী তাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনলাইন আবৃর্ত্তি প্রতিযোগীতার আয়োজন করলো৷ প্রত্যেক প্রতিযোগী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট তারিখে আবৃর্ত্তির ভিডিও স্কুলের ওয়েবপেজে আপলোড করবে৷ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে যত বেশী রিএক্ট, কমেন্ট ও শেয়ার পাবে সে সেরা হবে৷ প্রথম পর্যায়ের আবীর সারাদেশে ১ম হয়ে সেরা পাঁচের প্রতিদ্বন্ধীতায় অবতীর্ণ হলো৷ চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিযোগীতায় দেখা গেল আবীর ছাড়া প্রায় সকলেই শাখা প্রধানের সন্তান, আত্মীয়-স্বজন৷ আবার প্রত্যেক শাখা প্রধান মাহীন সাহেবের আত্মীয় এবং টাংগাইলের অধিবাসী৷ বিষয়টি পরিচালক মাহীন সাহেবকে জানালে তিনি বললেন নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে৷ আবীবের আবৃর্ত্তি আপলোড হওয়ার পর বেশ সাড়া পেল৷ প্রতিনিয়ত তার ভোট বাড়তে লাগলো৷ সকলকে টপকিয়ে যাচ্ছে৷ আসাদ সাহেব ও তার স্ত্রী ভীষণ খুশি৷ আবীর উদ্বেলিত৷ প্রতিদিন সকলে বর্তমান অবস্থা জানতে চায়৷ আসাদ সাহেব গর্ব বোধ করে৷ এসব শুনে আবীরের বড় চাচা বললো “তুই যদি ফার্স্ট হোস তাহলে তোকে নতুন সাইকেল কিনে দেব”৷ আবীর আনন্দে আত্মহারা৷
নির্দিষ্ট সময় যখন শেষ হলো৷ আসাদ সাহেব দেখলেন ভোটের দিকথেকে আবীর প্রথম৷ দ্বিতীয় ও তৃতীয় যথাক্রমে নারায়নগঞ্জ ও ঢাকার প্রতিযোগী৷ আসাদ সাহেব মোবাইলে স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলেন৷ তার ছেলেকে ভোট দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন৷ একটা এলাহি কান্ড৷ রেজাল্টের অপেক্ষায় আসাদ সাহেব ও তার স্ত্রী ঘুমোতে পারেনা৷ পারেনা আবীর৷ তার স্বপ্ন সে দেশব্যাপী প্রথম হবে৷ পুরষ্কার পাবে৷ বড় চাচা নতুন সাইকেল কিনে দেবে৷ সে স্বপ্নে বিভোর৷
অবশেষে রেজাল্ট প্রকাশ করলো৷ সেখানে আবীরের কোন স্থান নেই৷ কেন? পরিচালক মাহীন সাহেব- যিনি অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ- তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে বললেন, “আবীরের ভোটগুলো ঠিক ছিলনা, তাই তাকে নির্বাচিত করা হয়নি৷” নিরপেক্ষ(?) ভোটে যারা জয়ী হলো তারা প্রত্যেকে শাখা প্রধানের তথা মাহীন সাহেবের স্বজন৷ আসাদ সাহেব ভাবেন আর কতদিন এ বঞ্চনা আর বৈষম্য চলবে? রাষ্ট্র যন্ত্র কী নির্বিকার৷ কোমলমতি শিশুদের নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এমন অন্যায় করে৷ তাহলে তারা কী শিখবে? গুণগত শিক্ষা কিংবা প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন হবে কী করে?
দূরন্ত আবীর শান্ত হয়ে বাসায় মন খারাপ করে বসে আছে৷ শুধু কাঁদে৷ ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করা ছেড়ে দিল৷ আসাদ সাহেব বোঝান৷ চিন্তা কী? বড় চাচাতো তোকে সাইকেল কিনে দিবে বলেছে৷ সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা৷
কিছুদিন পর আবীর কিছুটা স্বাভাবিক হলো৷ আর অপেক্ষায় থাকলো কবে বড় চাচা সাইকেল কিনে দেবে৷ দিন যায়, মাস যায়৷ ওকে সাইকেল কিনে দেয়না৷ আবার ও নিজে থেকে কখনোই চাচার কাছে কিছু চাইবেনা৷ অবশেষে সে তার বাবার কাছেই জেদ ধরলো সাইকেল কিনে দিতে হবে৷ যে-সে সাইকেল নয় দূরন্ত সাইকেল৷ আসাদ সাহেব নিজের রাগ সামলান৷ লক্ষ করলেন তার ছেলের ভেতর জন্ম নিয়েছে সেই পুরোনো জেদ৷ যেভাবেই হোক এ জেদটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে৷ এটাই একদিন ওকে কাঙ্খিত লক্ষে নিয়ে যাবে৷ জীবনে প্রচন্ড জেদ ছাড়া কিছুই অর্জন করা যায় না৷ তিনি তা ভাল করেই জানেন৷ তাই আসাদ সাহেব আবীরকে কিনে দিলেন নতুন সাইকেল৷ দূরন্ত আবীরের দূরন্ত সাইকেল৷ কেননা পিতা হিসেবে তাঁর সন্তানের জন্য তিনি দিয়ে যেতে চান এক নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও স্বপ্নময় Life cycle.