কর্ণফুলির গল্প বলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রবীন জাকারিয়া (অন্তিম পর্ব)

(এই ধারাবাহিক গল্পের প্রত্যেকটি পর্বই স্বতন্ত্র৷ বলা যায় একেকটি গল্প৷ তাই একটি পর্বের পর অন্য পর্ব না পড়লেও পাঠকদের অসুবিধা হবেনা৷ তবে প্রত্যেকটি পর্ব পাঠ করলে একটা উপন্যাসের স্বাদ পাবেন বলে আশা করি৷)
ভাই
বড়দার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারটা যেন একেবারে ভেঙ্গে পড়লো৷ বিশেষ করে মা আর যেন স্বাভাবিক হতে পারলো না৷ একদিকে বড়দা’র অভাব আর অন্যদিকে আর্থিক সংকট৷ আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটা মস্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল৷ নিকটাত্মীয়রা একটু টিটকিরি মারতে শুরু করলো৷ এটাই আমাকে আর মাকে প্রচন্ডভাবে জাগিয়ে তুললো৷ যুদ্ধ করতে হবে নিরন্তর৷ হয় লড়ে যাও নয় মরে যাও৷ সমস্ত প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে আবারো লড়াইয়ে নেমে পড়লাম৷ এ লড়াই আমার একার নয়৷ আমার বাবা আর বড়দা’র আত্মত্যাগ৷ আমার মায়ের অধরা স্বপ্ন৷ যাকে লালন আর পূরণ করার জন্য তার এত সংগ্রাম৷ এ স্বপ্ন আমাকে পূরণ করতেই হবে৷ দেশ মাতৃকার জন্য যদি এত মানুষ নিজের জীবন অকাতরে দিতে পারে৷ সেই স্বাধীন দেশের সন্তান হয়ে কেন আমি মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না?
আমাদের এই দূর্দিনে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখলো জোতদার তারেক চাচা৷ নিয়তির কী অদ্ভূত ঘটনা! বড়দা’র সাথে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ের কথা যখন পাকাপাকি৷ বড়দা তখন অন্যলোকে পাড়ি জমালো! জয়িতা৷ আমার ভাবি৷ যদিও বয়সে আমার ছোট৷ কিন্ত সে আমাদের এই ক্রান্তিকালে সবচেয়ে সাহস জুগিয়েছে৷ যে মেয়ে তার হবু স্বামীকে চিরতরে হারালো৷ তাকেতো আমাদেরই সহানুভূতি জানানো প্রয়োজন৷ নতুবা কিছুই হয়নি ভাব দেখিয়ে তার কেটে পড়বার কথা৷ নিজের ভবিষ্যত চিন্তা করেই৷ অথচ সে সারাদিন মাকে সান্তনা দেয়৷ রান্না-বান্না করে৷ সেবা যত্ন করে৷ এখনো সে মাকে মা বলে ডাকে৷ আর মার এককথা ও হলো আমার বৌমা৷ আমার মেয়ে৷ জোতদার চাচা মেয়েকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে৷ লাভ হয়নি৷
ইদানিং মা একটু চলাফেরা করে৷ আশে পাশে হাঁটে৷ গল্প করে৷ ভাল লাগে৷ সময় পাল্টায়৷ পরিবর্তিত সময়ের সাথে মানুষ খাপ খাইয়ে নেয়৷ এটাই জীবন৷ আসলে সব কিছুই এক সময় স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ কিংবা হতে হয়৷ কথায় আছে না Time is the best sealer, killer also. সময় সব ক্ষত মুছে দেয়৷
ধীরে ধীরে আমরাও নতুন স্বপ্নের বাতিঘরের দিকে নাও ভাসিয়ে দেই৷ জীবনের আখেরী লক্ষ যে পূরণ করতেই হবে৷
সমস্ত প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে অবশেষে আমি ডাক্তার হলাম৷ বিসিএস কমপ্লিট করে সরকারী চাকরী পেলাম৷ কর্মএলাকাও আমার পাশের জেলার লাগোয়া উপজেলার হাসপাতালে৷ তাই বাড়ি যাতায়াত প্রতিদিনই বলা যায়৷ মা এখন ভীষণ খুশী৷ তার আচরণে বোঝা যায় জীবন যুদ্ধে জয়ী এক জয়িতা৷ নিজের অজান্তে মাকে স্যালুট জানাই৷ এ শুধু আমার মা নয়৷ হার না মানা এক সংগ্রামী৷ এক বীরঙ্গণা৷
চাকরী পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই মা আমার বিয়ে ঠিক করলেন৷ পাত্রী তিনি নির্বাচন করেছেন৷ বড়দা’র মত আমিও বললাম “তুমি যাকে ঠিক করবে আমি তাকেই বিয়ে করবো৷” অবশেষে মার পছন্দের মেয়েকেই আমি বিয়ে করলাম৷ সে আর কেউ নয়৷ আমার হবু ভাবি রেবেকা৷
মা যে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷ সেটা ঘুনাক্ষরে বুঝতে পারিনি৷ একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি৷ একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে৷ কেন যেন মনে হতে থাকলো৷ বড়দা’র সবকিছুই আমরা হাতিয়ে নিচ্ছি৷ জীবদ্দশায় তার উপার্জন, ত্যাগ এমনকি শরীরের একটা অঙ্গ নিয়েও থেমে থাকলাম না৷ বরং মৃত্যুর পর তার হবু স্ত্রীকেও ছিনিয়ে নিচ্ছি৷ কী লজ্জা!
বিষয়টা নিয়ে মা’র সাথে কথা বললাম৷ এ পর্যন্ত জীবনে ঐ একরারই মা’র মুখোমুখি দাঁড়ালাম৷ কিন্ত সে যে ব্যাখ্যা দিল৷ তা আমার সমস্ত অনুভূতি নাড়া দিল৷ মা বললো আমাদের সমাজে ঐ মেয়েকে আর কে বিয়ে করতে চাইবে? আমাদের সবচেয়ে বিপদের সময় যে মেয়েটি এত সাহসের সাথে সহযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছে৷ সাহস আর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে৷ দিন রাত আমার সেবা করেছে৷ তাকে কি ফেলে দেয়ার নাম মানবতা বাবা? তোর বড়দা”র সাথে বিয়ের কথা ছিল৷ বিয়েতো হয়নি৷ তাছাড়া ধর্মীয় বা আইনী কোন বাঁধা নেই যে তুই অপরাধবোধে ভুগবি৷
তবুও বিয়ের প্রথম দিকে আমাদের দু’জনের ভেতরে একটা জড়তাবোধ কাজ করতো৷ পরে সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে যায়৷
আমাদের দুটি সন্তান৷ দুটিই ছেলে৷ মা দুই নাতিকে নিয়ে এখন সারাদিন ব্যস্ত৷ আমার ধারণা রেবেকার চেয়ে মা-ই ওদের বেশি তদারকি করে৷ আমরা দুজনেও চাই মা ওদেরকে নিয়ে একটু হৈ-হুল্লোর, আনন্দ-স্ফূর্তি করুক৷ জীবনটাকে উপভোগ করুক৷ সারাটা জীবনতো শুধু কষ্টই করলেন৷ এটুকু তো তিনি প্রত্যাশা করতেই পারেন৷
দাদাবাড়িতে অবহেলিত আর অসম্মানে পড়ে থাকা কবর থেকে বাবার কবরটাকে বড়দা’র কবরের পাশে স্হানান্তরিত করেছি৷ কবরের পাশের আতা গাছটা বেশ বড় হয়েছে৷ যেন মমতা ভরা ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে৷ গাছ ভর্তি কাচা-পাকা আতা৷ ডালে অনেক পাখির বসতি৷ মন ভরা দৃশ্য৷ ভাল লাগে৷ মনে হয় এইতো আমাদের মাঝেই আছে সে৷ আমি দেখছি না৷ কিন্ত সে নিশ্চয়ই দেখছে৷ ভাল থাক তোমরা৷ মানুষের জন্য, নীতির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা দুই যোদ্ধার কবর আর অবহেলিত হতে দেবো না৷ এ আমার অঙ্গীকার৷ এরা আগামীর বিপ্লবীর প্রেরণা৷ এদের মৃত্যু নেই৷
আমার শশুর আর আমি দুজনে মিলে একটা ফাউন্ডেশন তৈরি করেছি৷ নাম দিয়েছি “মানব সেবা ফাউন্ডেশন৷” শশুর একটি বড় পুকুরসহ পাঁচ বিঘা জমি দান করেছেন৷ ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ সম্পৃক্ত হয়৷ যা অভাবনীয়৷ এমনকি দরিদ্র ও প্রান্তিকগোষ্ঠির লোকজন মুষ্টির চাল সংগ্রহ করে সহযোগীতা করে আসছে৷ এছাড়াও বড়দা’র বন্ধু-সহপাঠিরা দেশ-বিদেশ থেকে আর্থিক সহায়তা অব্যহত রেখেছে৷ বিদেশি বেশ কিছু শুভাকাঙ্খি ও দানশীল ব্যক্তি দরিদ্র কিছু শিশুর Sponsorship child এর নামে অর্থ পাঠান৷ আসলে ভাল উদ্যোগ কখনো বিফলে যায় না৷ পৃথিবীতে এখনো ভাল লোক আছে অনেক৷ শুধু আমরা জানি না৷ সকলের সহযোগীতায় নির্মাণ করেছি ইয়াতীমখানা, আধুনিক মাদ্রাসা৷ স্পোর্টস ক্লাব৷ কারিগরি শিক্ষা৷ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র৷ যেখানে সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করে নিজের ও দেশের কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে পারে৷ হয়তো ক্ষুদ্র পরিসরে৷ কিন্ত একদিন এটাকে মানুষ আরো এগিয়ে যাবে৷ কেননা সহজাতভাবেই মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন চায়৷
চাকরীর পাশাপাশি আমি গ্রামে ছোট্ট পরিসরে একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছি৷ একেবারে দাতব্য বলাটাও ঠিক হবে না৷ কেননা ১০০/- টাকা ভিজিট নেয়া হয়৷ সবটাকাই দেয়া হয় ফাউন্ডেশনে৷ যাদের সামর্থ নেই৷ তাদেরকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা ও ঔষধ দেয়া হয়৷ উদ্দেশ্য একটাই যেন অবহেলিত মানুষগুলো চিকিৎসা সেবাটা পায়৷ এটা মায়ের শুধু স্বপ্ন নয় আদেশও বটে৷
অফিস, ফাউন্ডেশনের কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে স্ত্রী-সন্তান-মা সকলকে নিয়ে ঘুরতে বেড়াই৷ এখন রাস্তা ঘাট আগের মত নেই৷ গ্রামের রাস্তাও পাকা৷ তাই গাড়ি নিয়ে ঘুরতে সমস্যা হয়না৷
আজ সকলে এসেছি আমাদের সেই স্কুলে৷ স্কুলটার একপাশে নতুন তিন তলা বিল্ডিং হয়েছে৷ অন্যপাশে স্মৃতি বিজড়িত সেই স্কুল ঘর এখনো আছে৷ বিরাট খেলার মাঠ৷ মাঠের এক কোণে গাড়িটা দাঁড় করলাম৷ সবাই নামলাম৷ মাঠে নেমেই আমার ছেলে দুটো ছোটাছুটি শুরু করে দিল৷ কে কাকে ধরতে পারে! মা ওদের পেছনে ছুটতে চাচ্ছিল৷ মানা করলাম৷ কেননা তাকে সংযত থাকতে হবে৷ তিনি হচ্ছেন এক কিডনীওয়ালা মানুষ৷ আমাদেরকে বানোয়াট গল্প বানিয়ে যেটি দান করেছে আমার বড়দা৷ যেটা আজো মা জানে না৷ আমি জানাইনি৷ কেননা তাতে মা আহত হবে৷
মাঠে ঘুরতে ঘুরতেই কখন যে মন্ত্রমুগ্ধের মত পুরাতন স্কুল ঘরের সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি৷ যেখানে একদিন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলাম৷ পাশে মমতা আর ভালবাসায় ভরা বড়দা’র অশ্রুসজল মুখ৷ হেল্যুশিনেশন তৈরি হয়ে আমি যেন নিমিষে সেই মূহুর্তকে দেখতে পাচ্ছি৷ বড়দা বলছে চল বাড়ি যাই৷ মা জিজ্ঞেস করলে বলবি পড়ে গিয়ে মাথা ফেটেছে৷
“তোর খুব ক্ষেদে লেগেছেরে ছোট৷ এই নে আতা ফল৷ খেয়ে নে৷ ভাল লাগবে৷” পিছন থেকে কেউ একজন কথাগুলো বললো৷ আরে এটাতো বড়দা’র কথা৷ তবে কি…৷ ঘুড়ে দেখা মা দাঁড়িয়ে৷ হাতে এক জোড়া আতা ফল৷ মার চোখে ভাল করে তাকিয়ে থাকি৷ কিন্ত একি সেখানে দেখতে পাই বড়দা’র প্রতিচ্ছবি৷ আবেগ আপ্লুত হই৷ মা জিজ্ঞেস করে৷ কিরে ছোট কাঁদছিস কেন? কিন্ত কিছুতেই বলতে পারি না যে ইদানিং আমি মায়ের চোখে দুটো মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাই৷ একটি মা স্বয়ং৷ অন্যটি হলো বড়দা৷
আচ্ছা আমি কি “সাইকো” হয়ে যাচ্ছি? ইদানিং আমি সবকিছুতেই বড়দাকে দেখি৷ মায়ের চোখে৷ রেবেকার মাঝে৷ এই যে মাঠে সন্তান দু”টো ছুটোছুটি করছে৷ একজন আরেকজন ধরে ফেলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা৷ আসলে ওরা কারা? আমাদের সন্তান নাকি কুড়ি বছর আগের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আকাশচুম্বি স্বপ্ন দেখা সেই সাজু-রাজু! আমি এবং বড়দা৷ প্রিয় দুই ভাই?