কর্ণফুলির গল্প বলায় রবীন জাকারিয়া

পরকীয়া
জয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থায় সহপাঠী জয়িতাকে গোপনে বিয়ে করে৷ তিন বছরের প্রণয়ের সম্পর্ক রূপ পায় পরিণয়ে৷ তার পরিকল্পনা ছিল পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে একটা চাকরি জোগাড় করার পর বাবা-মাকে জানাবে৷ যদিও হৃদয় কোণে একটা সুক্ষ্ম অপরাধবোধ কাজ করে৷ তবুও কিছু করার নেই৷
জয়িতা এক অতি সাধারণ পরিবারের মেয়ে৷ বাবা গৃহস্থালী কাজ করেন৷ দুই ভাই টেনেটুনে মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে৷ জয়িতা মাঝারি টাইপের মেধাবী হলেও উচ্চাকাঙ্খি৷ অত্যন্ত বৈষয়িক আর সংগ্রামী৷ যে কোনো মূল্যেই সে তার স্বপ্ন পূরণে বদ্ধ পরিকর৷ এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা প্রাইভেট স্কুলগুলোর একটায় স্বল্প বেতনের চাকরি করত৷ চাকরির বেতনের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্কুলের ব্র্যান্ডটাকে কাজে লাগিয়ে টিউশনির ফি-টা বেশি পাওয়া৷ কয়েকটি টিউশনি, স্কুলের বেতন আর নিজের স্কলারশিপের টাকা আয় হিসাবে মন্দ নয়৷ সুন্দরী হবার কারণে অনেকের ক্রাশ ছিল৷ স্থানীয় কলেজের মেধাবী সহপাঠী ও বড় ভাইদের সাপোর্টটুকু কৌশলে নিতে পারত৷ সকলের সাথে সাবলীল মেলামেশার কারণে জনপ্রিয়তার কমতি ছিল না৷ তাই বিত্তবান বন্ধুরাও তাকে আর্থিক সাহায্য করত৷ সে ‘‘এসব চাই না, শুধু দোয়া কোরো তোমরা’’-এসব বললেও কখনও তা প্রত্যাখান করেনি৷
গৃহস্থ বাবা-মা সহজভাবেই মেয়ের এসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করেনি৷ শুধু দোয়া করেছে আর হাহাকার করেছে তাদের মেয়ের জন্য তেমন কোন সাহায্য না করার অপরাধে৷ ভেবেছে ইশ! মেয়েটাকে যদি আরো একটু খরচাপাতি দিতে পারত!
মাধ্যমিক থেকে ভার্সিটির পরীক্ষা পর্যন্ত ওকে সবচেয়ে সহায়তা করেছে রাশেদ৷ ওর এক ক্লাশ সিনিয়র৷ ও বড়লোকের ছেলে এবং ভীষণ মেধাবী৷ রাশেদ জয়িতাকে ভালোবাসত৷ পাগলের মতো ভালবাসতো৷ ওকে হারানোর ভয়ে রাশেদ ওর সমস্ত ব্যয়ভার বহন করত৷ শুধু পড়াশুনার খরচ নয়৷ হাত খরচ, কাপড়-চোপড়, গহনা-পাতি সব৷ জয়িতার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করার জন্য সে তার সাথে পুনরায় পরীক্ষা দিত এবং একসাথে ফরম ফিলাপ করত যেন পাশাপাশি সিট বসে৷ আর সে জয়িতাকে সাহায্য করতে পারে৷ প্রেমিক রাশেদের অফুরান ভালোবাসা আর সাপোর্টে জয়িতা অবশেষে চান্স পেয়ে গেল ভার্সিটিতে৷ কিন্ত দুঃখজনকভাবে রাশেদ ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেলেও জয়িতা পেল রাজশাহী ভার্সিটিতে৷ রাশেদ এরপরও খরচ চালিয়ে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ জয়িতাই তাকে আর টাকা পাঠাতে নিষেধ করল৷ জানাল এখন সে নিজে বহন করতে পারবে৷
এ সময়ে জয়িতার সাথে জয়ের পরিচয় হয়৷ সে জানতে পারে জয়ের বাবা পুলিশ অফিসার৷ শহরে তাদের চারটি বাড়ি৷ গ্রামে কয়েক একর আবাদি জমি৷ সেখানে খামার বাড়ি আছে৷ মাঝে মাঝে বিনোদনের জন্য তারা সকলে মিট টুগেদার করে৷ এলাকায় তাদেরকে জমিদার হিসেবে মান্য করে৷ জয়রা দুভাই-বোন৷ বাবা পুলিশ অফিসার আলতাব হোসেন৷
জয়কে দেখেই ভালো লেগে যায় জয়িতার৷ অন্যদিকে জয়িতার জীবন সংগ্রাম জয়কে মুগ্ধ করে৷ তাই করুণা নয় বরং ভালোবেসেই জয় জয়িতার পড়াশুনাসহ যাবতীয় খরচের দায়ভার নিয়ে নেয়৷ এভাবেই চলতে থাকল তিন বছর৷ হঠাৎ একদিন জয়িতা তাকে বিয়ে করতে বলে৷ তা না হলে বাবা-মা তাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেবে৷ এমনকি পড়াশুনাটাও বন্ধ করে দিতে হবে বলে জয়িতা কাঁদতে শুরু করে৷ ওর কান্না দেখে জয় কোনো কিছু চিন্তা না করেই সেদিন কাজী অফিসে বিয়ে করে ফেললো৷
পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে জয় একটা চাকরির জন্য ছুটে বেড়াতে লাগল৷ জয়িতা আর এক বছর পর বেরিয়ে আসবে৷ হাতে মোটে একটা বছর৷ অবিরাম চেষ্টার পরও কোনো চাকরি জুটল না৷ জয়িতা পড়াশুনা শেষ করে বের হলো৷
কোনো উপায় না দেখে অবশেষে জয় জয়িতাকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে এলো৷ সকলে ভীষণ খুশি৷ উচ্চ শিক্ষা শেষ করার জন্য বাবা পার্টি দিলো৷ হৈ হুল্লোর হলো৷ এরপর একদিন যায়৷ দুদিন যায়৷ এমনিভাবে প্রায় মাস শেষ হতে চলল৷ কিন্ত মেয়েটা কেন এখনো চলে যাচ্ছে না! মহা মুশকিল৷ এতদিন বন্ধুর বাড়িতে একটা মেয়ের যেমন থাকাটা শোভনীয় নয় তেমনি আলতাব সাহেব নিজে থেকে চলে যাবার কথাও বলতে পারছেন না৷ তিনি স্ত্রীকে ডেকে বিষয়টা হ্যান্ডল করতে বললেন৷
এক ফাঁকে জয়কে ওর মা জয়িতা চলে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন৷ জয় মাথা নিচু করে শুধু বললো “ও তোমাদের বৌমা”৷ আমি তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছি৷
আলতাব সাহেব এটা শুনে কিছুদিন ছেলের সাথে কথাই বন্ধ করে দিলেন৷ বন্ধুসুলভ বাবার এমন গম্ভীর আচরণে জয় অবাক! কিন্ত ভয়ে কিছু বলতে পারছে না৷
এর মধ্যে আলতাব সাহেব স্হানীয় থানা থেকে জয়িতার জীবনবৃত্তান্ত যোগাড় করেন৷ তাঁর মতে দরিদ্রতা অপরাধ নয়৷ সকলেই অভিজাত পরিবারের হবে এমন কোনো কথা নাই বরং জয়িতাদের পরিবারের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানাটাই উদ্দেশ্য ছিল৷ কারণ একজন পুলিশ অফিসার হয়ে কোনো ক্রিমিনালদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাটা নীতি বহির্ভূত৷ কিন্ত তিনি জয়িতার লাইফ স্টাইল দেখে আশ্চর্য হয়েছেন৷ মেয়েটি নিজের স্বার্থে যে কাউকে যেমন ব্যবহার করতে পার, তেমনি যে কোনো জঘণ্য কর্মকাণ্ডও ঘটাতে কুন্ঠিত হবে না৷
একদিন আলতাব সাহেব জয়কে ডেকে পুরো কাহিনিটা তুলে ধরলেন৷ রাগ করলেন না বরং যৌক্তিক বিশ্লেষণ করতে বললেন৷ অবশেষে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তটা ছেলেকে জানিয়ে দিলেন৷ বললেন তোমার কাছে দুটো অপশন: প্রথমত যদি আমাদের সাথে থাকতে চাও তাহলে তোমার স্ত্রীকে আইনগতভাবেই ত্যাগ করতে হবে৷ দ্বিতীয়ত তোমার স্ত্রীর সাথে থাকতে চাইলে আমাদের ত্যাগ করতে হবে৷ তুমি যে সিদ্ধান্তই নাও না কেন তা আগামী তিনদিনের মধ্যেই জানাবে৷
তিনদিন পর আজ বাড়িতে ভীষণ কান্নাকাটি৷ একদিকে মা চিৎকার করে কাঁদছে৷ অন্যদিকে ছোট বোন৷ ব্যালকনিতে একটি রকিং চেয়ারে বসে আলতাব সাহেব দূর আকাশে চেয়ে আছেন৷ অভিব্যক্তি বোঝা দায়৷ জয় বাড়ি ছেড়ে একেবারে চলে যাচ্ছে জয়িতাকে নিয়ে৷ কোনো ঠিকানা জানাবে না সে৷ সেওতো কম জেদি নয়৷
জয় জয়িতাকে নিয়ে অন্য এক জেলা শহরে সংসার গড়ে৷ এক রুমের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে৷ কয়েকটি টিউশনি করে চালাতে থাকে সংসার৷ মাস ছয়েকের ভেতর একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকুরি পায়৷ বেতন মন্দ নয়৷ তবুও টিউশনিগুলোও চালাতে থাকে৷ তার জেদ যে করেই হোক প্রতিষ্ঠিত হতে হবে৷ জয়িতার জন্য যারা বাড়ি ছাড়া করেছে৷ একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েই তাঁদের সামনে দাঁড়াব৷ বলব সংগ্রাম করে নিজেও প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়৷
এভাবে দিন গড়াতে থাকে৷
জয়-জয়িতার সংসারের সমৃদ্ধি আসতে থাকে৷ এখন তারা একটা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে৷ এলাকাটা অভিজাত৷ সুন্দর আর গোছানো সংসার৷ আল্লাহ্ যখন দেয় তখন বেহিসাবি দেয়৷ তাইতো বছর দেড়েক পর তাদের ঘর আলোকিত করে এলো ভালোবাসার সন্তান৷ একটি নয়, দুটি৷ যমজ সন্তান৷ একটি পুত্র আরেকটি কন্যা৷ ভালোবাসা আর সুখে ভরে উঠলো তাদের সংসার৷
বছর দুয়েক পর জয় জাপানে যাবে বলে ঠিক করল৷ তখন বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো৷ যে কেউ টুরিস্ট ভিসা নিয়ে সেখানে যেতে পারে৷ সকলেই যাচ্ছে৷ প্রথমে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে ঢুকতে হবে৷ এরপর কোনো জাপানি নারী বিয়ে করে বিশেষ কায়দায় দীর্ঘদিন থাকা যায়৷ নতুবা পালিয়ে বিভিন্ন কারখানায় চাকরি করা যায়৷ পারিশ্রমিক মন্দ নয়৷ বিষয়টা নিয়ে জয়িতার সাথে আলাপ করলো৷ আর জানাল যে করে হোক দশটা বছর কাটাতে পারলে নিজেরাই গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে যাব৷ জয়িতা নিষেধতো করলই না বরং উৎসাহ যোগালো৷
অবশেষে একদিন জয় তাদের ছোট্ট দুটি যমজ সন্তানকে রেখে আকাশচুম্বি স্বপ্ন পূরণের জন্য দেশ ত্যাগ করল৷ প্রথম প্রথম জয়িতার খারাপ লাগলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে যায়৷ জয় যাবার আগেই তার নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলে সেখানে বেশ কিছু টাকা রেখে দিয়েছে৷ বলেছে টাকা পাঠানো শুরু করা পর্যন্ত এই টাকা দিয়ে চলতে৷ আর মাঝে মাঝে ব্যাংক একাউন্ট চেক করতে৷ টাকা পাঠালাম কি না জানতে৷
মাস তিনেক পর থেকে জয় টাকা পাঠাতে লাগল৷ বাড়িতে টেলিফোন লাগানো হলো৷ প্রায় দিন জয় টেলিফোন করে৷ কথা বলে৷ স্বপ্ন দেখায়৷ জয়িতা বিভোর হয়৷ জয় বলেছে একটা জমি কিনতে৷ সেই জমিতে জাপানের বৌদ্ধ টেম্পলগুলোর মতো একটা বাড়ি বানাতে৷ নাম হবে টোকিও হাউজ৷ জয়িতা একটা জিনিস বুঝতে পারে না৷ প্রবাসিরা যে দেশে থাকে তারা নিজ দেশে সাধারণত: সেই দেশের কিংবা রাজধানীর নামে বাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করে৷ যেমন সিঙ্গাপুর হাউজ, সৌদি ভিলা, নিপ্পন কার, নিপ্পন ভিডিও ইত্যাদি৷ এটা অবশ্য বাহিনীর লোকদের মধ্যেও দেখা যায়৷ যেমন সেনা হোটেল, সৈনিক স্টোর, রাইফেলস স্টোর ইত্যাদি৷
দিন বদলে যেতে লাগল৷ বদলাতে লাগল জয়িতা৷ প্রবাসী স্বামীর পাঠানো অর্থ আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক আধিপত্য তাকে লোভী করে তুলল৷
এ সময়ের মধ্যে হঠাৎ করে তার পুরোনো প্রেমিক রাশেদের সাথে দেখা হয়৷ কাকতলীয়! বসন্ত বরণ উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জয়িতা দেখল রাশেদ নামে এক কবি স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন৷ চমকে উঠল সে। রাশেদ এখানে কেন? অনুষ্ঠানের শেষে সে তার সাথে দেখা করে৷ কথা হয়৷ জানতে পারে রাশেদ বিসিএস কমপ্লিট করে একটা সরকারি কলেজের প্রভাষক৷ ওর পোস্টিংটা হয়েছে এ জেলাতে৷ বাংলার শিক্ষক, তাই যথারীতি সাহিত্যচর্চার সাথে জড়িত৷ ইতিমধ্যে বেশ ক’খানা বই প্রকাশ করেছে৷ জনপ্রিয় লেখকের তকমা পেয়ে গেছে৷ জেলার বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নিয়মিত৷ এখনো বিয়ে করেনি৷ প্রতিষ্ঠিত, সুদর্শন আর অবিবাহিত এক জনপ্রিয় লেখকের জন্য অনেক মেয়েই ক্রাশ খাবে এটাই স্বাভাবিক৷ রাশেদের পিছনে অন্য নারীর সম্পর্ক জয়িতা মানতে পারে না৷ ঈর্ষা হয়! প্রচণ্ড রাগ লাগে৷ ভুলেই যায় যে সে অন্যের স্ত্রী এবং তাদের দু’টো সন্তান আছে৷
সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে জয়িতা আর রাশেদের যোগাযোগ নিয়মিত হতে থাকে৷ অবশ্য টেলিফোনেই বেশি কথা বলা হয়৷ কারণ এখন বাইরে বেশি সময় দেওয়ার সময় নেই৷ বাচ্চা দুটো বড় হয়েছে৷ প্রায় আট বছর৷ ভালো স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির জন্য চাপ আরো বেড়ে গেছে৷ স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট পড়াতে নিয়ে যাওয়া৷ আবার বাড়িতে এসে হোম ওয়ার্কগুলো করানো৷ রান্না-বান্নাসহ সংসারের সব কাজ একাই সামলানো৷ ওদের বাবা প্রবাসে থাকার কারণে সেই তাদের বাবা৷ সেই তাদের মা৷ তাছাড়া বাচ্চা দুটো হয়েছেও মা ঘেঁসা৷ সবকিছুতেই আম্মু৷ এখনো ওদের না খাইয়ে দিলে নিজ হাতে খাবে না৷ ঘুমানোর সময় দুজনকে দুদিকে রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে গুনগুন করে গান না গাইলে ঘুমাবেই না৷ মাঝে মাঝে ভালো লাগে৷ কিছু সময় বিরক্ত লাগে৷ জয়িতা অনেক সময় ধমক দিয়ে বলে তোদের আম্মু যদি মরে যায়? ওরা বলবে আমরা মরে যাব তবু তোমাকে মরতে দিব না৷ তুমি না থাকলে ভয় করে আম্মু৷ মনে হয় কারা যেন আমাদের মেরে ফেলছে! জয়িতা ধমক দিয়ে চুপ করে দেয়৷
আস্তে আস্তে রাশেদের সাথে ওর সম্পর্ক আরো গভীর হতে থাকে৷ একদিকে পুরোনো প্রেমের জাগরণ আর অন্যদিকে প্রবাসীর স্ত্রী—যে কি না বায়োলোজিক্যাল ডিমান্ড থেকে বঞ্চিত—এক ডেজার্ট ফক্স৷ যা তার নৈতিক ও চারিত্রিক স্খলন ঘটায়৷ যার ফলশ্রুতিতে রাশেদ এখন নিয়মিত তার বাসায় যাতায়াত শুরু করে৷
বাচ্চারা প্রতিদিন আংকেলের বাসায় আসাটা অপছন্দ করতে থাকে৷ জয়িতা রাশেদকে কিছু একটা সমাধানের পথ বের করতে বলে৷ রাশেদের এক কথা জয়িতাকে সে বিয়ে করতে রাজি কিন্ত বাচ্চাদের ছাড়তে হবে৷ জয়িতা দোটানার মধ্যে পড়ে যায়৷ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না৷
হঠাৎ একদিন কোচিং থেকে এসে বাচ্চারা জয়িতা এবং রাশেদকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে৷ জয়িতা হতবাক এ সময়ে তো ওদের ছুটি হয় না৷ পরে জানা গেল মিস অসুস্থ্য তাই ছুটি দিয়েছে৷ প্রজনন বিষয়ে ওদের গভীর জ্ঞান না থাকলেও এটা যে পচা কাজ তা তারা বুঝতে পারে৷ বিব্রতকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জয়িতা আর রাশেদ ওদের সাথে রাগ না করে বরং চাইনিজ খেতে নিয়ে যায়৷ বিষয়টা যেন এখানেই শেষ হয়ে যায়৷
রাতে জয় টেলিফোন করল৷ জয়িতা আদুরে গলায় অনেক কথা বলতে লাগল৷ বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে চাইলে বলল ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে৷ কিন্ত বাচ্চারা দৌড়ে এসে টেলিফোন ধরে বললো ওরা ঘুমায়নি৷ অগত্যা জয়িতাকে টেলিফোনটা ছেড়ে দিতে হলো৷ সবই ঠিক ছিল কিন্ত হঠাৎ ওরা রাশেদের সাথে ঘটনাটা তাদের আব্বুকে বলে দিলো৷ ভয়ের একটা শীতল স্রোত জয়িতার মেরুদণ্ড বরাবর নামতে থাকল৷ রাগে আর ভয়ে কাঁপতে থাকল৷ এতদিন যে দোটানার মধ্যে ছিল৷ তা ঝেড়ে ফেলল৷ এক পৈশাচিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো৷
পরের দিন রাশেদকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানাল৷ জয়িতা ভাবলো ব্যাংকে জয়ের পাঠানো প্রচুর টাকা৷ ইচ্ছে করলেই এগুলো আমার হতে পারে৷ আর একটা কঠিন কাজ করলে রাশেদও আমার৷ জয়িতার সুন্দর মুখে ফুটে উঠে ক্রুর হাসি৷ যে হাসিটাকে জয়িতা নিজেই কখনো দেখেনি৷
সারাদেশ হঠাৎ করে একটা তোলপাড় করা খবর জানতে পারল৷ জ্বর নাশক ঔষধ সেবনে একই পরিবারের দুটি শিশুর মৃত্যু৷ সরকার নিমিষের মধ্যেই সেই ঔষধটি বিক্রয়-বিপণন বন্ধ করা শুধু নয়, বাতিল করে দিলো৷ নির্দিষ্ট ঔষধের নির্দিষ্ট ব্যাচ নম্বর নিয়ে গবেষণাগারে গবেষণা করা হতে থাকল৷ কী ক্ষতিকর কারণ থাকতে পারে যার জন্য দুটো শিশুর প্রাণহানী ঘটল? রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতামূলক বার্তা দিতে থাকল৷ সকলেই বিশেষ করে যাদের ছোট শিশু আছে তারা আতঙ্কিত৷
দুইদিন পর সবাই সত্যটা জানল৷ আসলে ঔষধের কারণে নয়৷ বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ঘটেছে তাদের৷ নিজের মা, গর্ভধারিণী, একইসাথে হত্যা করেছে দুই সন্তানকে৷ প্রথমে বিষ খাইয়েছে৷ তারপর তাদেরকে ঔষধ খাইয়েছে৷ যাতে সকলকে মিসগাইড করা যায়৷ কিন্ত বিধিবাম৷ ডাক্তাররা সেই মায়ের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখে পুলিশকে খবর দেয়৷
প্রাণচঞ্চল আলতাব সাহেব এখন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষে পরিণত হয়েছেন৷ তাঁর একমাত্র ছেলে আজ প্রায় দশ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে গেছে কিন্ত কোনো যোগাযোগ নেই৷ সে কি বেঁচে আছে নাকি…
প্রমোশন পেয়ে তিনি এই জেলার পুলিশ সুপার হয়ে এসেছেন৷ এই কিছুদিন আগে৷ এর মধ্যে এই জেলায় ঔষধ খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু৷ ভাইরাল৷ পুলিশ হেড কোয়ার্টার, মিনিস্ট্রি থেকে চাপ আসছে৷ হালনাগাদ রিপোর্ট করতে করতে বেহাল অবস্থা৷ তার ভাবতে অবাক লাগে সমাজের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এতটাই? সকলেই বিশ্বাস করি যে একজন স্ত্রী খারাপ হতে পারে৷ একজন নারী খারাপ হতে পারে৷ কিন্ত একজন মা কখনো খারাপ হতে পারে না৷ পারে না বলেই আমরা মায়ের জন্য জীবন দিই৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য নয় মাসে তিরিশ লক্ষ প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছি৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতা এনেছি জনযুদ্ধে৷ আমারাইতো একমাত্র সেই জাতি যারা মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি সবচেয়ে কম সময়ে৷ অথচ আজ একি ঘটছে?
আলতাব সাহেব ড্রাইভারকে বললেন মর্গে যেতে৷ এমন দৃশ্য দেখতে ইচ্ছে না করলেও তাঁকে শিশু দুটির লাশ দেখতে হবে৷ বেডে সাদা কাপড়ে ঢাকা দুটো লাশ৷ চাদর সরানো হলো৷ তিনি দেখলেন ছোট্ট দুটি যমজ শিশুর নিথর দেহ৷ দুজনের চোখগুলো খোলা৷ তিনি চিন্তা করলেন মরার আগে হয়তো ওরা খোলা চোখে তাদের মাকে খুঁজছিল৷ বিশ্বাস ছিল মা আসলে ওদের কিচ্ছু হবে না৷ কিন্ত ওরা জানে না ওদের মা-ই হত্যাকারী৷
আলতাব সাহেব বাইরে এলেন৷ একটু সময় নিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন৷ গাড়িতে উঠলেন৷ উনি এখন থানায় যাচ্ছেন৷ নিজের যমজ দুটি সন্তান হত্যাকারী মাকে দেখতে৷ গাড়ি চলছে৷ পুলিশ সুপার ঘামছেন৷ তাঁর প্রচণ্ড রাগ লাগছে৷ তবে আলতাব সাহেব এখনও জানেন না যমজ শিশু দুটি কিংবা হত্যাকারী আসলে কে!