কর্ণফুলির গল্প বলায় রবীন জাকারিয়া

মৌলভির চিঠি – গল্প
আমার দাদু মৌলভী আলীম সরদার নামজাদা বামপন্থী পলিটিশিয়ান এবং সংস্কৃতি কর্মী৷ এলাকায় তাঁর প্রভার আর ক্ষমতা অকল্পনীয়৷ তাঁর কথাই শেষ কথা৷ বিচার, শালিস সবই তাঁর মর্জিতে৷ বরখেলাফ করলে কী ভয়াবহ ঘটনা কপালে জুটবে সেটা সকলের জানা৷ তাই কেউ টুশব্দটিও করেনা৷ দাদু সমাজতান্ত্রিক দল করতেন৷ বলা যায় প্রভাবশালী নেতা৷ অন্যদিকে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তাঁর বিচরণ তাঁকে নিয়ে গেছে এলাকার শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি৷ স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ইয়াতিমখানা, মসজিদসহ সকল প্রতিষ্ঠানের সভাপতি৷ অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীদের জন্য নারী পুনর্বাসন সেন্টার নামে একটি আশ্রম আছে৷ অবশ্য সেই আশ্রমে কেন যেন প্রায়শঃই নির্যাতিত নারীরা আত্মহত্যা করে! দাদুকে এসব সামলাতে বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়৷ তাছাড়া জনসেবা৷ এলাকার মানুষের খোঁজ খবর নেয়া৷ তাই বাড়িতে সব সময় দর্শনার্থিদের ভীর৷
আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল যে দাদুর নামের সামনে মৌলভী টাইটেলটা কেন? তিনিতো কোনদিনও টুপি পানজাবি পরতেন না৷ এমনকি দাড়িও ছিলনা৷ তিনি নিয়মিত নামাজও পরতেন না৷ বরং ধর্মবিরোধী অবস্থান ছিল তাঁর৷ কিন্ত মৌলভী হলেন কেন? অনেক পরে জেনেছি যে ঐ সময় মুসলিম ব্যক্তিদের নামের সামনে মৌলভী লেখা হতো৷ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামেও মৌলভী টাইটেল ছিল৷
দাদু কঠোর চীনপন্থী সমাজন্ত্রী ছিলেন৷ তাই তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও নিজ দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে নিরলস কাজ করেছেন৷
৭০ এর নির্বাচনে সারা বাংলাদেশে ১৬২ আসনের মাঝে দুইটি আসনে আওয়ামীলীগ
পরাজিত হয়। একটি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরেকটি ময়মনসিংহ সেন্ট্রাল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জয়লাভ করেন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ও ময়মনসিংহে পিডিপির নুরুল আমিন।
এরপর দেশ স্বাধীন হলে তিনি আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হন৷
দাদু নিজে উচ্চ শিক্ষিত হলেও তাঁর কোন সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করতে পারেননি৷ বরং প্রত্যেকে হয়েছে একেকটা সুবিধাবাদী আর ক্ষমতালিপ্সু মানুষে৷
দাদু পলিটিকস বোধ হয় বেশ ভালই জানতেন৷ যার কারনে তিনি যেমন জীবদ্দশায় সর্বদা PGP (Present Government Party) করতেন৷ ঠিক তেমনি তাঁর সন্তানেরা৷
আমাদের বাড়িতে আলেয়া নামক এক বয়স্ক গৃহকর্মী থাকেন৷ মানসিক প্রতিবন্ধী৷ দাদুর যৌবণকাল থেকেই তিনি আছেন৷ আমি তাকে আলেয়া দাদি বলে ডাকি৷ দিদি বললে আমার নিজের দিদি রাগ করেন৷ তাই দাদি বলি৷ মাঝে মাঝে যখন ওনার মাথা ঠান্ডা বা ঠিক থাকে তখন গল্প বলে৷ আদর করে৷ বেশ উপভোগ করি৷ কিন্ত মাথা বিগড়ে গেলে তখন হাতে একটা কাগজ নিয়ে সকলকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকবে “এই দ্যাখ মৌলভী আমাকে চিঠি লিখেছে”৷ মৌলভীর চিঠি মানে তার স্বামীর প্রেমপত্র৷ এলাকার এমন কোন মানুষ নেই যে তার এই প্রেমপত্রের কথা জানেনা৷ শুধু তাই নয় রাস্তা-ঘাট কিংবা মোড়ের রিক্সাচালক পর্যন্ত জানে৷ আমাদের সমাজে যা হয় পাগল দেখলে সহানুভূতির চেয়ে ক্ষেপাতে পারলে আনন্দ পাই৷ তার সাথে প্রতিদিন তাই ঘটতো৷ দিনশেষে এক টুকরো ছেঁড়া কাগজ নিয়ে আলেয়া দাদি ঘরে বসে কাঁদতো৷ আমার খারাপ লাগতো ভীষণ৷ কিন্ত কিছু করতে পারতাম না৷ আমিতো ছোট তাই৷
আমি একটা জিনিষ দেখে অবাক হতাম৷ দাদুকে নিয়ে যে যাই বলুক৷ কিন্ত মানুষটা আসলে মহান৷ নাহলে একজন গৃহকর্মীর জন্য এত ভালবাসা আর দায়িত্ববোধ থাকে? যখন যা চাচ্ছে তাই এনে দেয়৷ কেউ বাঁধা দিলে বলে “পাগল মানুষ একটা আবদার করেছে দিয়ে দাও, আমরা বিনির্মাণ করবো এক সাম্যবাদি সমাজ৷ যেখানে থাকবে না কোন শ্রেণি বৈষম্য”৷ দাদুর কথা কেউ ফেলতে পারেনা৷
দিদিকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম উনি কীভাবে পাগল হলো? এমনকি ওনার একটা ছেলে সেও পাগল৷ বিষয়টা কী? দিদি বললেন যদিও তুই ছোট মানুষ সব বুঝবি না৷ তবুও বলি শোন্ আলেয়ার বিয়ে দেয়া হয়েছিল এক মৌলভীর সাথে৷ পাশের মসজিদের খাদেম ছিল৷ এরপর ওর ছেলেটা পেটে আসে৷ এমন সময় ওর স্বামী ওকে রেখে পালিয়ে যায়৷ এই দুঃখে ও আস্তে আস্তে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকে৷ ও কোন কিছু না বলে হঠাৎ হঠাৎ করে নিখোঁজ হতো৷ পেটে সন্তান অন্যদিকে এভাবে শরীরের উপর টর্চারের কারণে প্রসব জটীলতা সৃষ্টি হয়৷ উপায়ান্তর না থাকায় ডাক্তার সাত মাসেই তার বাচ্চাকে প্রসব করাতে বাধ্য হয়৷ অপ্রাপ্ত শিশু৷ বাঁচা মরা অবস্থা৷ মা পাগলি৷ ঠিকভাবে দুধ পায় না৷ মায়ের সঠিক যত্নের অভাব৷ সব মিলিয়ে দেখা গেল ছেলেটাও প্রতিবন্ধী৷ পাগল৷ একদিকে স্বামীর শোক৷ অন্যদিকে ছেলের এমন অবস্থা দেখে আলেয়া একেবারেই পাগলী হয়ে গেল৷
একদিন হঠাৎ করেই দীর্ঘ আয়ুর দাদু মারা গেলেন৷ তাঁর বয়স হয়েছিল ১০২ বছর৷ বাড়িতে শোকের ছায়া৷ পরিবারের মাথার ছাতাটা ভেঙ্গে গেল৷ সময় সব ক্ষত মুছে দেয়৷ জীবন নতুন করে সাজে৷ পরিবর্তন হয় নেতৃত্বে৷ এখন আমার বড় বাবা হলেন পরিবারের নেতা৷ তাঁর আনুগত্যে কারো অসন্তোষ নেই৷ আবারো সব কিছু ঠিক ঠাক৷
ক’দিন আগে বড়বাবা কিছু লেবার লাগিয়েছে দাদুর ঘরটাকে পরিস্কার করবে বলে৷ অপ্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, ফার্নিচার পুড়িয়ে ফেলে ঘরটাকে বসবাস উপযোগী করবেন বলে৷ লেবার-মিস্ত্রি বাড়িতে কাজ করলে আমার ভালো লাগে৷ আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখি৷ অনেক সময় পুরোনা কোন খেলনা, মার্বেল কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া পিচ দিয়ে বানানো নিজের হাঁতুরি দেখলে খুশি হই৷ ওগুলো আবার সংরক্ষণ করি৷ এমন সময় দেখলাম লাল কাপড়ে মোড়ানো একটা মোটা খাতা৷ আমি ওটাকে নিজের কাছে রাখলাম৷ ওটা আসলে ডায়েরী৷ দাদুর ডায়েরী৷ নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখলাম৷ রাতে পড়তে লাগলাম৷ মজা লাগছিল৷ দাদু কত স্মৃতিকথা লিখে রেখেছেন৷ যেন গল্পের বই৷ একটা নেশা চেপে বসলো৷ প্রতিদিন রাতে একটু একটু করে পড়ি৷ কত অজানা আর ভয়ঙ্কর কাহিনী জেনে গেলাম৷ তা বাড়ির কাউকে শেয়ার করলাম না৷
এর বেশ কিছুদিন পর একদিন ঝড়ের রাতে আলেয়া দাদি মারা গেলেন৷ চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা দাদিকে দেখে মনে হচ্ছে যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন৷ বুকের উপরে রাখা একটি হাতে শক্ত করে ধরে আছে এক টুকরো কাগজ৷ যেটাকে তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন স্বামীর প্রেমপত্র বা মৌলভীর চিঠি হিসেবে৷ আর এই মৌলভীর চিঠিটা আর কারো নয় বরং বিশ্বাসঘাতক আমার দাদুর৷