T3 || ঈদ স্পেশালে || লিখেছেন রবীন জাকারিয়া

মিডিয়া কাভারেজ

আমি একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারী সংস্থায় রংপুরে কর্মরত ৷ আমার ডিরেক্টর স্যার ডেকে বললেন যে “HIV-AIDS বিষয়ে দেশের সর্বাধিক পঠিত একটি জাতিয় দৈনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দল ও আমাদের সংস্থা যৌথভাবে মাঠ পর্যায়ে Floating and Residential protituteদের উপর একটি Survey করা হবে ৷ যেহেতু আপনার বাসা রংপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে এবং পরিচিতি আছে তাই সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে ৷ নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে জানানো হয়েছে এবং প্রত্যেকের আইডি কার্ড দেয়া হবে ৷ আপনি আজ রাতে হোটেল রজনীগন্ধায় গিয়ে অন্যান্য কলিগদের সাথে পরিচিত হবেন এবং সকলে মিলে একটি স্কেজ্যুয়াল তৈরি করে কাজে নেমে পড়বেন ৷”
সেল ফোন নম্বর দেয়া ছিল ৷ অচেনা কলিগদের সাথে যোগাযোগ করে রাত আটটার সময় হোটেলে গেলাম পরিচিত হয়ে পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্যে ৷ সেখানে পৌঁছানোর পর দেখলাম দু’টি ছেলে ও দু’টি মেয়ে আমার অপেক্ষারত ৷ পরিচয় পর্বে জানলাম ছেলে দু’টির নাম রেজা ও সেলিম আর মেয়ে দু’টির নাম রেবা ও জয়িতা ৷ সকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৷ আমিও নিজের পরিচয় দিলাম ৷ কিন্ত অদ্ভুত বিষয় হলো ওদের কাউকেও কেন জানি পছন্দ হলো না ৷ বিশেষ করে রেজা ও সেলিমকে কেন জানি মাদকাসক্ত মনে হলো ৷ যদিও এটা আমার সন্দেহ ৷
যাহোক সকলে মিলে একটা প্ল্যান তৈরি করলাম ৷ গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে রাত বারোটার দিকে দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে কাজে নেমে পড়লাম ৷ স্পট সুরভি উদ্যান ৷ ফুটপাত, বাগানের ভেতর, ল্যাম্প পোস্পের নীচে উগ্র সাজে কিছু নারীদের এলোমেলোভারে হাঁটা হাঁটি লক্ষ করে তাদের সাথে কথা বলা শুরু করলাম ৷ প্রথমে খদ্দের ভেবে বেশ আন্তরিকতা দেখালেও আমাদের উদ্দেশ্য জানার পর একে একে সকলে কেটে পড়লো ৷ আমাদের দ্বিতীয় দলটি যারা রংপুর কলেজের রাস্তায় মিশন চালাচ্ছে তাদের অবস্থাও অনুরুপ ৷ ভীষন মুসকিল৷ চিন্তার বিষয় ৷ অবশেষে কৌশল পাল্টিয়ে খদ্দেরের ভুমিকায় অবতীর্ণ হলাম ৷ ভাগ্যক্রমে একজনকে পেলাম কিন্ত সে বললো আমরা আপনাদের কোন উত্তর দেবনা আমাদের লিডার ছাড়া ৷ লিডারকে আনা হলো ৷ বলা হলো তাদের নষ্ট হওয়া সময়ের জন্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে ৷ রাজি হলো ৷
নাম জিজ্ঞেস করতেই বললো, জড়িনা ৷
সাথে একথা সাফ জানিয়ে দিল তারা সকলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে ৷
দশ বছর যাবৎ এ পেশায় আছে ৷ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ৷ ভালবেসে একটি ছেলের সাথে পালিয়ে এসে ঘর বাঁধে ৷ স্বপ্নের এক ঘর ৷ যা প্রত্যেক নারী হৃদয়ে লালন করে ৷ কে জানতো তার স্বপ্নের সেই রাজকুমারটা একটা ঠগ৷ বাটপার৷ নারী পাচারকারী? একদিন সন্ধ্যায় সে বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে সাজিয়ে-গুজিয়ে একটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বললো, “তুমি একটু বসো আমি আসছি৷” আর কখনোই সে আসেনি ৷ পরে জানতে পারলাম “আমাকে সে বিক্রি করে দিয়েছে৷” কিছুক্ষণ থেমে থাকলো, তারপর হু হু করে কাঁদতে থাকলো জড়িনা ৷ বাঁধা দিলাম না ৷ বরং নিজেদের চোখে কিছু একটা পড়েছে এমন ভান করে নিজের চোখের নোনা জলটুকু মুছে ফেললাম সুকৌশলে ৷ আমি চাইনি এ দৃশ্যটা আমার কলিগ জয়িতা দেখুক ৷ কেননা কোন নারীই কাঁদুনে পুরুষ পছন্দ করে না ৷
কিছুক্ষণ পর আবার জড়িনা তার জীবনের করুণ কাহিনী বলতে লাগলো ৷ আমার নতুন ঠিকানা হলো “পতিতালয়” ৷ জোর করে এরা আমাকে এ পেশায় আসতে বাধ্য করলো ৷ তাছাড়া বাড়ি ফেরার পথটাতো নিজেই চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছি ৷
একেবারে নতুন অবস্থায় রোজগার বেশ ভালই হতো ৷ ভাল-মন্দ খাবার জুটতো ৷ আপনাদের মতো অনেক সাহেব ২-৩ দিনের কন্ট্রাকে বাহিরে কিংবা পার্টিতে নিয়ে যেত ৷ তখন ক্ষমতাও ছিল ৷ বখাটেরা বিরক্ত করতো না ৷ কিন্ত এখন? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জড়িনা বললো আজ দু’দিন ধরে বৌনি নেই ৷ কিছুক্ষণ আগে একজন সরকারি দলের মস্তান এসে স্ফুর্তি করলো ৷ টাকাতো দিলই না উল্টো হুমকী দিল যাতে কেও জানতে না পারে৷ কী বলবো ভাই! যখন ভাটিখানায় পতিতালয়টা ছিল ৷ তখন থাকার একটা জায়গা ছিল ৷ নিরাপত্তা ছিল ৷ আর এখন কুকুর-বিড়ালের মতো লোকে ঘৃণা করে ৷ অথচ রাতে ওরাই পয়সার বিনিময়ে আদর খোঁজে ৷ আমাদের বাঁচান ৷ এ পথে থাকতে চাই না ৷
এইডস ও অন্যান্য যৌণরোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলে সবই জানি কিন্ত কী হবে আর বেঁচে থেকে? আর যারা রাতে সোহাগ কিনতে আসে ৷ সেসব শয়তানগুলো মরলেতো দুনিয়ার মঙ্গলই হবে ৷ মাঝে মাঝে কিছু লোক এসে কনডম দিয়ে যায় কিন্ত ওরা কনডম ব্যবহার করতে চায় না৷
এরপর জড়িনা’র মতো আরো অনেকের সাথে কথা বললাম দু’টি দলই ৷ জানতে পেলাম এ পেশায় কেউ এসেছে প্রেমের ফাঁদে৷ কেউ সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে ৷ কেউবা এসেছে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার টাকা যোগাড়ের জন্য ৷ তবে কেউই স্বইচ্ছায় আসেনি ৷
প্রায় ভোর হয়ে এলো তাই সেদিনের মতো “মিশন” শেষ করলাম ৷
দ্বিতীয় দিনের “মিশন” Residential Prostituteদের মধ্যে যারা কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইন্সটিটিউটের হলে কিংবা ছাত্রী নিবাসে অবস্থান করে ৷
এখানের অভিজ্ঞতা বড়ই দুঃখজনক ও লজ্জাষ্কর৷ এরা কেউই দারিদ্রের কিংবা অসহায়ত্বের কারণে এ পথ বেছে নেয়নি বরং বাড়তি রোজগার, দামি উপঢৌকন, নামকরা রেস্তোরায় ফাও খাবার আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেত্রী হিসেবে দলীয় ক্ষমতার ফোকাসে থাকার অভিপ্রায়ে ৷ এদের এ বিষয়ে কোন অপরাধবোধ দেখিনি বরং নোংরামোকে আধুনিকার ফ্লেভার দেয়ার অবিরাম চেষ্টা ৷ ভাসমান পতিতাদের জন্য আমাদের প্রচন্ড দুঃখ হয়েছে কিন্ত এদের জন্য ঘৃণা ছাড়া অবশিষ্ট ছিল না কিছু ৷ হায়রে শিক্ষা ৷
শেষ দিন আমাদের “মিশন” হলো Residential Prostituteদের মধ্যে যারা অভিজাত এলাকায় প্রশাসনের সহযোগিতায় রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে যারা ছোট-থাট আধুনিক পতিতালয় বানিয়ে চাকুরির প্রলোভনে বিভিন্ন মেয়েদেরকে উচ্চ রেটে এ পথে নামাতে বাধ্য করেছে ৷ তারই একটি চিত্র ৷
আমরা সকলে শহরের অভিজাত এলাকা ধাপে অবস্থিত একটি প্রাসাদোপম বাড়ির প্রধান ফটকের কাছে যেতেই দারোয়ান আটকিয়ে জিজ্ঞেস করলো কার কাছে যাবেন ৷ গেটে লাগানো নেমপ্লেট দেখে তৎক্ষণাৎ নামটা বললাম “শাবরিনা আক্তার পপি ম্যাডাম” ৷ উত্তর দিল উনার স্বামীতো আমেরিকাতে থাকেন ৷ ম্যাডাম ওনার তিন কণ্যা ও তার ভাগ্নিকে নিয়ে থাকেন ৷ তাছাড়া ম্যাডাম সরকারী মহিলা দলের নেত্রী ৷ আপনারা অনুমতি ছাড়া ভেতরে যেতে পারবেন না৷
হঠাৎ রেবা আর জয়িতা বললো আমরা দলীয় কাজে ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছি ৷ উনিই ডেকেছেন ৷ দারোয়ানের কাছে ছাড়া পেয়ে বাড়ির দরজায় দাঁড়ালাম ৷
কলিং বেল বাঁজানোর সময় ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছে ৷
কয়েকবার কলিং বেল বাঁজানোর পর দরজা খুললো ৷ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অসম্ভব সুন্দরী ও স্মার্ট একটি মেয়ে ৷ ও দেখতে যতটা সুন্দর তারচেয়েও চরম বেয়াদব বলে মনে হলো ওর আচরণে ৷ কর্কশ স্বরে বললো কাকে চাই? পপি আপা ৷ উনি বাড়িতে নেই ৷ পরে আসবেন বলে দরজাটা বন্ধ করছিল ৷ আমি দৃঢ় এবং ধমকের সুরে বললাম ৷ দাঁড়ান ৷ আপনি চেনেন আমাদের? উনি আমাদের আসতে বলেছেন ৷ মেয়েটি কিছুটা ভীত হয়ে নরম স্বরে বললো, ভেতরে আসুন ৷ ড্রয়িংরুমে একটি সোফায় বসতে বলে চলে গেল ৷ অন্য কামরা থেকে “কে এসেছেরে রিতা”? বলে আর একজন ললনা ঢুকলেন ৷ কুশল বিনিময়ের পর তার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে থাকলাম৷ সুকৌশলে পপি আপা আসলে কী করেন ৷ কী তার পরিচয় সেসব বিষয়ে ধারণা নিতে থাকলাম ৷ মেয়েটির নাম ছন্দা ৷ ওর সাথে গল্প করে জানা গেল সে তার ভাগ্নি নয় ৷ তাকেও চাকরির মিথ্যে আশা দিয়ে এখানে আটকে রেখেছে ৷ সে তার প্রস্তাবে রাজী নয় বলে অকথ্য নির্যাতন করছে ৷ কিন্ত পালাবার পথ পাচ্ছে না ৷ আমরা তাকে আশ্বস্থ করায় সে সমস্ত গোঁমর ফাঁস করে দিল ৷ যেটা জানা গেল তার সারাংস হলো ৷ পপি আপা আসলে দলীয় ও নারী নেত্রীর ছদ্মবেশে উঁচু দরের একজন Prostitute এবং চাকুরির প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষমতা আর প্রভাব খাটিয়ে অনেক সহজ-সরল মেয়েকে এ জঘণ্য পেশায় নিয়োজিত করেছে ৷ ওনার তিন মেয়ে ও Husband আমেরিকা প্রবাসী সব মিথ্যে কথা ৷
আমরা পাঁচজনই হতবাক ৷ এ যে হুমায়ুন আহমেদের কোথাও কেউ নেই নাটকের বাকের ভাইয়ের মত অবস্থা ৷ ভয় করতে লাগলো ৷ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় পালাতে বলছে ৷ সকলে ঠিক করলাম এখনি চলে যাব কিন্ত বাঁধ সাধলো ছন্দা ৷ সেও আমাদের সাথে পালাবে ৷ যেহেতু কথা দিয়েছি তাকে Protect করবো তাই তাকে তাড়াতাড়ি রেডি হতে বললাম ৷ ও আসছি বলে ভেতরে গেল৷ কিছুক্ষণ পর একটা লাগেজ নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিল ৷ কিন্ত কথায় আছে না “যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়” ৷ ঠিক সই সময় পপি আপা হাজির ৷ ভেতরে ঢুকেই তিনি বললেন আরে কী ব্যাপার আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন ৷ এতক্ষণ অপেক্ষা করলেন ৷ অথচ কথা না বলে চলে যাচ্ছেন ৷ এটা কি ঠিক হচ্ছে? বসুন, বসুন ৷ একটু চা-নাস্তা খাই ৷ গল্প করি ৷ তারপর ভেবে দেখা যাবে আপনারা আজ আমার অতিথি হবেন ৷ নাকি চলে যাবেন ৷
পাশ ফিরে ছন্দার দিকে তাকিয়ে বললেন ৷ বাহ্! আপনারা কি ছন্দার বাপের বাড়ির লোক? ওকে কি নাইওর খেতে নিয়ে যাচ্ছেন?
পপি আপা ফোনে কারো সাথে কথা বললেন৷ বুঝতে পারলাম পুলিশে খবর দিয়েছেন৷ আমরা অসহায়ভাবে বসে আছি আর দোয়া-দরুদ পড়তে থাকলাম৷
কিছুক্ষণ পর হুইসেল দিয়ে পুলিশের ভ্যান এসে হাজির৷ আমাদের কোন কথা না শুনেই ছন্দাসহ আমাদের ছয়জনকে থানায় আনা হলো৷ আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়! আমাদেরকে কারো সাথে যোগাযোগ করতে দেয়া হলো না৷
ঘন্টাখানেক পর আমাদের লকআপ থেকে বের করে আনলো পুলিশ৷ টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললো গলায় ঝুলানো আমাদের আইডি কার্ড৷ পরিবর্তে ঝুলিয়ে দিল বড় হরফে প্রত্যেকের নাম লেখা বোর্ড৷ সারা দুনিয়া লাইভ টেলিকাস্টে দেখলো অসামাজিক কার্যকলাপরত অবস্থায় পুলিশ কর্তৃক তিন জোড়া কপোল গ্রেফতার৷
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!