কর্ণফুলির গল্প বলায় রবীন জাকারিয়া

ক্ষুদে শুকান্ত-অণুগল্প
রাহাত সাহেব এক মধ্যবর্তি পরিবার থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মানুষ৷ জীবনে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন৷ বাস্তবে একজন ছা’পোষা মানুষ ছাড়া কিছুই হতে পারেননি৷ এজন্য কোন দুঃখবোধও করেন না৷ তিনি বিশ্বাস করেন সবার কপালে সব কিছু হয়না৷ তাইতো একটি অফিসের কেরানির চাকরী নিয়েই নিজেকে সুখী মনে করেন৷ স্ত্রী, দু’টি সন্তান নিয়ে সাজিয়েছেন স্বপ্নের রাজ প্রাসাদ৷
অফিস, বাড়ির কাজ আর সন্তানদের লেখাপড়ার তদারকি এই বৃত্তের মধ্যেই আবর্তিত হন প্রতিদিন৷ বিষয়টা এমন যে, নিজ কক্ষে আবর্তিত হতে পৃথিবীর সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন, সূর্যের ২৫ দিন আর রাহাত সাহেবের ২৪ ঘন্টা৷
অথচ রাহাত সাহেব ছোট বেলা থেকেই অনেক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন৷ ভাল ফুটবল খেলতেন, স্কুলের সেরা এথলেট ছিলেন, চিত্র কর্ম, কবিতা ও সাহিত্য চর্চা ছাড়াও নাট্য কর্মি ছিলেন৷ সীমাহীন স্বপ্ন ছিল৷ কিন্ত দারিদ্র্য আর দায়িত্ববোধ হতে দেয়নি কিছুই৷ অন্যদিকে তিনি এটাও মনে করেন একসাথে এতগুলো উইংসে নিজেকে জড়িয়ে ফেলাটাও ঠিক হয়নি৷
তিনি মাঝে মাঝে স্মৃতির জাবর কাটেন ঠিকই তবে যাতনা বোধ করেননা৷
শুধুমাত্র একটি জিনিষ তিনি এখনো ছাড়তে পারেননি৷ সেটা হলো সাহিত্য চর্চা৷ সুযোগ পেলে দু”একটা গল্প-কবিতা লিখে ফেলেন৷
প্রকাশিত হলে পরিবারের সকলে মিলে খুব আয়েশ করে সেগুলো পড়েন৷
স্ত্রী’র চেয়ে ছেলে-মেয়ে দু”টি খুব এনজয় করে৷
এমনিতেই অনেকে ওদের নাম শুনেই বলে, “তোমাদের বাবা কি লেখক?” ছেলেটির নাম সৌজন্য আর মেয়েটি সৃজনা৷ আনকমন নাম৷ বাবার প্রকাশিত লেখা বই কিংবা ম্যাগাজিন সংগে করে স্কুলে নিয়ে গিয়ে গর্বের সাথে স্কুলের সহপাঠিদের পড়ে শোনায়৷ বোঝাতে থাকে তাদের বাবা একজন নামকরা লেখক৷
তিনি একটু লজ্জিত বোধ করলেও বাঁধা দেননা৷ ওদের এই নির্মল আনন্দটুকু নষ্ট করে কী লাভ৷ তাছাড়া প্রত্যেক সন্তানই চায় তার বাবার বীরত্বগাঁথা গল্প অন্যকে জানাতে৷
ছেলে-মেয়ে দু’টি লেখাপড়ায় খুবই মেধাবী৷ অবশ্য এজন্য ওদের মামনি’র কৃতিত্বই বেশী৷ কেননা চাকরীর কারণে রাহাত সাহেবকে দিনের বেশীর ভাগ সময়েই বাহিরে থাকতে হয়৷ সীমিত আয়ের সংসারের যাবতীয় কাজের পর তার স্ত্রী যেভাবে বাচ্চাদের যত্ন নেন৷ অকল্পনীয়৷ একে স্কুলে রেখে আসে তো ওকে কোচিংয়ে৷ আবার ওকে কোচিংয়ে রেখে আসে তো ও স্কুলে৷ যেন দৌড়ের উপর৷ সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আর্থিক সংকটের কারণে তাকে হেঁটে হেঁটেই যাতায়াত করতে হয়৷
রাতে আবার চার্ট অনুসারে পড়া তৈরি হয়েছে কী-না? সেটা আদায় করে নেয়৷
রাহাত সাহেবের কষ্ট হয়৷ তাই স্ত্রীকে তার এত হয়রানির জন্য সহানুভূতি জানান৷ তাঁর স্ত্রী বরং বলে তুমি এসব কী বল? হয়রানির কি আছে? এটাতো আমার দায়িত্ব৷ কেন তুমি যে সারাদিন কষ্ট করছো? কেন করছো? আমাদের ভরণ-পোষণের জন্যইতো! তুমি একদম ভেবো নাতো৷ একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে৷
রাহাত সাহেব ভাবেন৷ ছেলে-মেয়ে দু’টো যে ব্রিলিয়্যান্ট৷ ওদেরকে যদি একটা ভাল স্কুলে পড়াতে পারতাম৷ তাহলে ওরা আরো ভাল কিছু করতো৷ কিন্ত এখন নামীদামি স্কুলে পড়াতে গেলে যে খরচ৷ সেটা নির্বাহ করা অসম্ভব৷ দেশটার যে কী হয়ে গেল৷ গুণগত শিক্ষা শিশুর অধীকার৷ অথচ এটাই পরিণত হয়েছে পণ্যে৷ বাণিজ্যে৷ আপনা-আপনিই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে৷ নিজের অসহায়ত্বের কথা মনে হতেই চোখে নোনাজলের অস্তিত্ব অনুভব করেন৷
প্রতিদিন তিনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে পুরো বাড়িটা চেক করেন৷ দরজাগুলো লাগিয়েছে কী-না? লাইট, ফ্যান অফ করেছে কী-না! বাচ্চারা সময় মতো ঘুমিয়েছে কী-না! এসব৷
ক’দিন ধরে তিনি লক্ষ্য করছেন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর প্রতিদিন ছেলেটা খাতায় গভীর মনযোগ দিয়ে কী যেন লেখে! তিনি জানতেন সে হয়তো অঙ্ক করছে তবুও মানা করতেন৷ বলতেন বাবা এত পড়তে হবে না৷ ঘুমটাও জরুরী৷ কিন্ত তখন কী আর জানতেন আসলে সে কী করছে? আজ স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ওর মামনিকে ডেকে পাঠায় তার কক্ষে৷ তাঁর স্ত্রী অনেকটা ভীত হয়৷ ভাবতে থাকে লেখাপড়ায় সে স্কুলের সেরা ছাত্র সন্দেহ নেই কিন্ত ওতো ভীষণ চঞ্চল আর দুষ্টু৷ নিশ্চয়ই বেয়াদবী করেছে! তাঁর স্ত্রী অনুমতি নিয়ে প্রিন্সিপ্যালের কক্ষে ঢুকতেই ইশারায় তাকে চেয়ারে বসতে বলেন৷ তিনি একটা খাতা খুলে মনোযোগ সহকারে কী যেন পড়ছেন৷ তারপর মুখ তুলে বললেন, “আপনার ছেলেতো মারাত্মক… এতটুকু শুনেই তাঁর স্ত্রী বললেন, আসলেই ও মারাত্মক দুষ্টু, ক্ষমা করবেন৷ প্রিন্সিপ্যাল বললেন, “মারাত্মক দুষ্টুতো বলিনি? বলছি সে মারাত্মক কবিতা আর গল্প লেখে বলেই সজোড়ে হেসে খাতাটা তাঁর স্ত্রী”র দিকে এগিয়ে দেন৷ সেটা দেখে আবেগ দমন করতে পারে না৷ বাসায় এসে রাহাত সাহেবকে যখন পুরো বিষয়টা খুলে বললো এবং খাতাটা দেখাল তা দেখে তিনি অভিভূত৷ শুধু বললেন চালিয়ে যাও বেটা৷ মনে রেখো সকলে সৃজণশীল হতে পারেনা৷ ছেলে বললো আসল লেখাগুলোতে অনেক কাটাকাটি ও ভূল আছে৷ পরে ফ্রেশ করে তুলেছি৷ তিনি বললেন তোমার ঐ কাটাকাটি ও ভূল লেখাগুলোই দাও৷ ওটাই তোমার পান্ডুলিপি৷ রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িতে গিয়ে যদি তাঁর কাটাকাটি পান্ডুলিপি দেখতে পারি৷ তাহলে তোমারটা নয় কেন?
রাহাত সাহেব আনন্দে উদ্বেলিত! ৮-১০ বছরের একটি বালক তার নিজের জীবন দর্শন নিয়ে কবিতা-গল্প লিখতে পারে ভাবতেই ভাল লাগছে৷ তিনি চিন্তা করলেন যে করেই হোক এই সব সৃজণশীল বালকের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে৷ এদের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভাবিত দর্শন, চিন্তা-চেতনাকে কাজে লাগাতে হবে৷ কিছুতেই এদের প্রতিভাকে হারানো যাবেনা৷
যেহেতু তিনি নিজেই টুকটাক লেখালেখি করেন৷ সেজন্য বিভিন্ন প্রকাশনার সাথে তাঁর সখ্যতা আছে৷ তাই তিনি সৌজন্য’র কবিতা ও গল্পগুলোকে বিভিন্ন দৈনিকে ও ম্যাগাজিনে প্রকাশ করতে থাকলেন৷ এতে ক্ষুদে লেখকের পরিচিতি তৈরির পাশাপাশি উজ্জীবিত করলো ভীষণভাবে৷ এই স্বীকৃতি দরকার৷ নাহলে প্রতিভার বিকাশ সাধন সম্ভব নয়৷
আমরা যেমন অনেক প্রতিভাকে নষ্ট করেছি৷ বিকশিত হতে দেইনি৷ অন্যদিকে শুকান্ত’র ন্যায় বিশ্ময়কর কিশোর কবিকে আমরা পেয়েও হারিয়েছি৷ প্রকৃতি কেড়ে নিয়েছে কিংবা আমরা বাঁচাতে পারিনি৷
এখন সময় এসেছে৷ আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি আর সুন্দর আগামীর জন্য নার্সিং করতে হবে এই সব ক্ষুদে শুকান্ত’র৷