বই : স্বপ্নের ধূসর রঙ কবি : মৃণালিনী প্রকাশনা : বার্তা প্রকাশন প্রচ্ছদ : সৌরভ বিশাই ১ম প্রকাশ : ২০১৭
সম্প্রতি, প্রিয় একটি সাহিত্যপত্রিকার অগ্রজ সম্পাদক বলছিলেন, “উন্নততর সমাজব্যবস্থা ছাড়া কবিতা কেউ পড়বে না”।কোনো তার্কিক মহাসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অনেকেই হয়তো করতে পারেন; অবিশ্যি এটা তাঁরাই করবেন ~ যাঁরা দৈনন্দিন চিন্তনের অনুশীলন সম্পর্কিত চর্চা থেকে বিরত হয়েই নিজস্ব যাপনপর্বটিকে অতিবাহিত করে যান।যদিও, অহেতুক বিতর্ক বাদ দিয়েও একথা বলাই যায় ~ “উন্নততর” শব্দটি নিজেই একটি অভিজাত ও জটিল এবং কখনোসখনো ‘ইউটোপিক্’ বা কষ্টকল্পিত বিষয়।কারণ, আজ অবধি পৃথিবীতে কোনো স্থানে ~ না এমন কোনো সময় এসেছে বা পর্ব এসেছে।যদি আসতো কবি হিসেবে আমরা সকল মানুষকেই পেতাম; অর্থাৎ কবি ও পাঠক :: উভয় অংশটিই আলাদা হয়ে থেকে যেতো না।বিদেশেও দেখেছি, পাঠকসংখ্যা সুনির্দিষ্ট।
আর ভিন্ন ধারার চেতনা সমন্বিত কবিতাতে; এই সংখ্যা আরোই কম।নতুবা সকল কবিই হতেন সর্বজনবিদিত সেলিব্রিটি।কিন্তু জীবদ্দশায় এমোন বিষয়ের পুনরাবৃত্তি খুব একটা আমরা দেখি না।অতএব এই স্থানটিকে আরো একটু বিশ্লেষণ করলেই; আমরা যা পেতে পারি : “কবিতা হলো চেতনার গতিপ্রাপ্ত এমনই এক প্রকাশ, যা সময় সাপেক্ষ এবং মুহূর্ত থেকে প্রতিনিয়ত মূর্ততা ও বিমূর্ততা’র আন্তঃসম্পর্কিত ধারকটিকে জানান দেওয়ার সাক্ষী।এটি মূলতঃ দুই প্রকার, প্রথমটি হলো সময়ের একরৈখিকতা’কে আশ্রয় করে স্থানীয় অঞ্চলে বসবাসকারী পাঠককে, সেই নির্দিষ্ট সময়টির গতির প্রতি আকর্ষিত করা।দ্বিতীয়টি হলো বর্তমান সময়বলয় থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন একটি সময়বলয়ে প্রবেশ এবং তার সাপেক্ষে নতুন অজানা যাত্রপথে থেকে আশেপাশের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যগুলির অনুসন্ধান ও প্রয়োগকরণ; যা একপ্রকার ভিন্ন মাত্রার নিরীক্ষা-প্রবণতা বিশেষ।”
অতএব কবিতা বিষয়ক যে প্রকরণটি সংক্ষিপ্ত স্তরে পেতে পারি ~ (১) সময়োচিত কবিতা :: বিমূর্ততা’র গায়ে মূর্ততা’র আবরণটিকে নিয়ে চর্চা ও অনুশীলন এবং (২) ভবিষ্যৎমুখী গতিপ্রাপ্ত বহুরৈখিক সময়ের কবিতা :: বিমূর্ততা’র গা থেকে মূর্ততা’র আবরণটিকে সরিয়ে ফেলে নগ্ন ও প্রকৃত’র অনুশীলন।অর্থাৎ সহজ কথায় নিজস্ব ভাষার বিন্যাসে কবিতা প্রকাশের প্রক্রিয়াটি একটি বিপরীতমুখী দ্বান্দিক্ পর্যায়; যদিও উভয়ের যাত্রাপথই ~ মূর্ততা এবং বিমূর্ততা গুণাবলী’র অভ্যন্তরে থাকা কোনো কিছুর সাথে আন্তঃসম্পর্কিত।পাঠক বলতেই পারেন ~ একটি বইপাঠ নিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া বলতে গিয়ে এতোশতো কথা কিসের? উত্তরে বলি, এই নাতিদীর্ঘ ভূমিকাটি ছাড়া, বর্তমানে বইটির আসন্ন আলোচনা প্রসঙ্গান্তরই হতো।কারণ, কবিতা নামের বর্গমূলটিকে সমাধান করতেই করতেই উৎসে পৌঁছানোর অভ্যাসটি রাখা উচিৎ।আর এটিই সত্য ও সরলতম রাস্তা।
“স্বপ্নের ধূসর রং” বইটি নিয়ে আলোচনায়, একটা কথা বারংবার বলতে চেয়েছি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন ~ মূর্ততা এবং বিমূর্ততা বিষয়দ্বয়ের আন্তঃসম্পর্ক।যা গতিশীল একটি স্তর থেকে আরেকটি গতিশীল উৎসে উত্তরণ-প্রবণতা।প্রবণতা একারণেই যে ~ উত্তরপর্বে এই প্রবণতাটির নিজেকে আরো প্রকট করে তোলা।
প্রচ্ছদটি নিয়ে প্রথমত বলা উচিৎ ~ একটি ছায়াশরীরের আলোর দিকে ধাবমানতা, তথা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অশেষ।চারপাশে তার পাখিদের ছায়াশরীর।সে নগ্ন ও তুমুল সেই পাখিশারিরীক চরিত্রগুলির মতো; য্যানো বিবর্ণ দেওয়ালকে টপকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তার শুরু এবং এটাই মজ্জাজাত।আর এখান থেকেই আরো ভিতরের মলাট; আর সেখানে থাকা শব্দক্ষর সাজানো হয়েছে এরকম ~ “কবিতায় কবিতায় রাখা থাকে ঘরে ফেরার পথের নিশানাগুলি।আমাদের সহজ বাঁচার স্বপ্নেরা ঠিক কতটা দূরে চলে গিয়েছে, একবার আসুন মেপে নিই কবির এই আখরার বুকে দাঁড়িয়ে।” নিজের সবচেয়ে বড়ো শান্তিস্থল, সেই আত্মজ বাবা এবং মাকে উৎস্বর্গকৃত কাজটির পর মোট ১০২টি সোলো ছোটোবড়ো কবিতা।যার প্রত্যেকটি যাপনাংশের বিভিন্ন ঘটনাবলী থেকে শুরু হয়ে একাধিক বহুরৈখিকতায় মিলিয়ে যেতেযেতে একঝলক বোধি’র বাতাস সৃজনপত্তন করে।কিভাবে ~ কয়েকটি প্রিয় কবিতাই পাঠক উপলব্ধি’র পক্ষে যথেষ্ট।আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক :
কবিতা ‘পুনরুত্থান’ ~ “গীটারের ছেঁড়া তার / বেজে উঠল / বেসুরো তানের একঘেয়েমি / পার করেছে শতাব্দী / মহাশূন্যেও / বিস্তার / প্রসার / নাভিশ্বাস / মৃত ইতিহাসও পরিক্রমা করে / প্যানপ্যানানির সুর বদলে / অলৌকিক নামাবলির / চাদর জড়িয়ে / রমণ প্রিয় পুরনো প্রেয়সী / নবজন্মের দায়ভার / উত্তরাধিকার সূত্রে।।” ~ ছোটোছোটো আংশিক বাক্যে লেখা প্রতিটি লাইন য্যানো দার্শনিকের আয়নায় জারিত করতে চাইছে, প্রতিটা উপলব্ধি ও বোধ।হয়তো ভাষা নতুন নয়, কিন্তু প্রকাশ করার সত প্রবণতাটি স্বতন্ত্র।আরেকটি কবিতা ‘ককটেল’ ~ “সার্কাস নেমে এসেছে / শহরের রাস্তায় / হোল্ডিং ঝুলতে থাকা মন পর্দায় / খেলোয়াড় মেতে উঠেছে / তার নতুন পুরনোর / ককটেল। / এবার নতুন পোশাকি রঙে / সেজে উঠবে; / হোর্ডিং / উৎসবের লাল নীল সবুজ / হরেক রকম রঙের হোলিতে / আবিরের গন্ধ মাখবে / নিরুত্তাপ বাতাস।” ~ ছোটোছোটো আংশিক বাক্য আর বিয়োগ পরবর্তী যা অবশিষ্ট সেই মনের ভেতর থেকে উঠে আসা কোথায় য্যানো মিশে যাওয়া।এভাবেই বাকি কবিতাগুলিতেও সেই পূর্বোক্ত বক্তব্য অনুযায়ী (১)নং স্তর।আমরা নিশ্চিত, এভাবেই চর্চা ও অনুশীলনের ভিতর দিয়ে কবি মৃণালিনী তাঁর চিন্তন স্তরটিকে (২)য় অংশে নিয়ে যাবেন, আমি নিশ্চিত।পরিশেষে আরেকটি কথা বলে শেষ করবো ~ আজ অতিপ্রিয় এক আপনজন চিরতরে যখোন ছেড়ে গেলেন; চিতাভষ্ম পরবর্তী সময়টুকু য্যানো এই বইটির সাথে মিলেমিশে গ্যালো।তবে, অতিরিক্ত বানান দুর্বলতা খুব চোখে পড়ে বইটিতে; তবুও মৃণালিনী’র সেই স্বতন্ত্র বোধ ও উপলব্ধি যেভাবে নাড়া দেয় শারীরিক সত্ত্বাকে ~ এককথায় পাঠকের, কবির এই প্রকাশিত প্রথম বইটি পাঠ অবশ্যকরণীয় কাজ।