বইমাত্রিক রাহুল গাঙ্গুলি

সমান্তরাল রশ্মি ও
প্রতিফলিত জোনাকি রহস্যভেদ

বই আলোচনা : ৪০২ নং জোনাকি;
কবিতা : দুর্লভ সরকার
প্রকাশনা : তাবিক (১-ফর্মা সিরিজ, ২০১৮)

কিছুকিছু বই আছে; যার আলোচনা খুব স্বাভাবিক গতিতে হয়।তার অনেক কারণ আছে।আবার, তেমনই কিছুকিছু বই আছে ~ যার আলোচনা, অনেক কারণ থাকা সত্ত্বেও হয়ে ওঠে না।আসলে, হয়ে ওঠা বা না হয়ে ওঠে : সম্পূর্ণ স্থানটিই ১টা শর্তাধীন প্যারাডক্স, যে নিজেই সমাধান অথবা অসমাধান বিষয়টিকে অতিক্রম করে, আপন খেয়ালেই ৩য় ধারায় প্রবাহিত।আজ এরকমই ১টি কবিতার বইয়ের ওপর, কিঞ্চিৎ আলো-ফোকাস্ করার প্রচেষ্টা
কবিতা” শব্দটিকে উল্টে দিয়ে “তাবিক” পত্রিকার আত্মপ্রকাশ করা (২০১৭), আবহমান প্রবাহো সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ বাংলা কবিতার মুক্তির সম্ভাবনাময় শর্তগুলিকে নিয়ে।পরপর, ৩টি সংখ্যাতেই তারা দেখিয়ে দিয়েছিলো, তারুণ্যময় খোলা জানলার ভিতর দিয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস।তার মধ্যেই, তাদের প্রকাশনা শুরু।এবং অভিষেকেই স্বমেজাজে ওভারবাউন্ডারি মেরে শতরান; যার ফলস্বরূপ : একাধিক্ ১ফর্মার কবিতার বই (যার প্রত্যেকটিই, যোগ্য আলোচনার দাবিদার)।এই বইটি সেই সিরিজেরই অন্তর্গত ১টি।আমি স্রেফ বইটিকে ১টি নমুনারূপে পাঠ-আবিষ্কার করতেই পারি, শুধু এই ভেবে : যে কতোটা শক্তিশালী কলমে জারিতো “তাবিক”; এই কথাটির বিষয়ে
না, দুর্লভ সরকারের লেখার সাথে আমার কোনো পাঠাভ্যাস ছিলো না।যা, এই পত্রিকাটির সূত্র ধরে গড়ে উঠেছিলো।আর এই বইটিতে, তাঁর বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ।তার বহুরৈখিক লেখার সম্ভাবনাগুলো, ফুটে ওঠে শিরোনাম “৪০২ নং জোনাকি”র মধ্য দিয়ে।জোনাকি এখানে ১টি কেবলমাত্র, অভিধানে লেখা বিশেষ্য বা সিলেবাসের স্রেফ পতঙ্গ নয়, বরং আলো ও অন্ধকারের ভিতর ঘটা নিষেকের মাধ্যম।যার গভীরতা ও ব্যাপ্তিকে বুঝতে গেলে, অসীম অভিমুখী সাধনার স্তরযাপন করতে হবে।সৈকত সরকারের করা ক্যালিগ্রাফিও প্রচ্ছদ বা মসৃণতা বাদ দিয়ে, অমসৃণ কভার পেজ : এরা য্যানো প্রতিটি বিষয়েরই যোগ্য সঙ্গত্।বইটির উৎস্বর্গ সংক্রান্ত কথায়, দুর্লভ লিখেছে “প্রথম দু-মলাট তারই…/ যাকে প্রথম ডেকেছিল ঠোঁট / মা”
সূচীপত্রহীন গোটা বইটিতে ছোটো থেকে মাঝারি দৈর্ঘ্যের মোট ১৩টি পূর্ণ কবিতা রয়েছে; যার প্রতিটি অংশই সেই পাওয়া / না-পাওয়া; চাওয়া / না-চাওয়া; দেখা / না-দেখা; বোঝা / না-বোঝা; প্রভৃতি দ্বন্দ্বের লীক-অলীক পেরিয়ে ভিন্ন ধারার সন্ধান।পাঠক নিশ্চিত অন্য ভাবনার পথে পাড়ি দেবেন; য্যামোন ১ম কবিতা ‘তাই’ থেকে শুরুর ৪টি লাইন : “বহুদিন আমি জোনাকি দেখিনি। দেখিনি। / আর দেখিনি বলেই বহু, / বহুদিন, বহুদিন… / কি যেন বেশ একটা করা হয়ে ওঠেনি…”
আবার, পরবর্তী কবিতা ‘রাত’ থেকে : “কোনো রাত কুমারী হয় না। / সর্বদা যুবতী, ফেরোমেন উড়িয়ে / টেনে আনে পতঙ্গ জোড়। / ফাঁকা পূর্ণিমা মাঠ / অথবা নিকষ অমাবস্যা ছাদ, কোনো রাত / কুমারী হয় না।”
‘ডার্কহোল’ কবিতায় য্যামোন : “নিভিয়ে দেওয়ার পর বাতি, / বাটি ভরতি জ্যোৎস্না উপুর করেছিলে বিছানায়। / আমি সাঁতার জানি না, তুমি জানতে…”
অথবা, ঠিক এর পরবর্তী পঙতিতে “অতঃপর মৃত্যুকে চুমু খেয়ে / ঢেকুর তুলেছিলাম, আর বধ করেছিলাম / পঁচিশটা জোনাকি। আমার কি গারদবাস হবে?” ~ আমরা সেই ৩য় ধারার দ্বন্দ্বগুলিকে বারংবার অনুরণিত হতে দেখি, হয়তো বা এই অনুরণন আরো অনেককিছুর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’ঈর্ষা’ কবিতায় : “আর ঈর্ষা করি / তোমার সোনালি লকেট, (বিভাজীকায় হারানো) / তোমার টেবিল ঘড়ি, (সর্বদা তাকানো) / তোমার নিয়ন আলো, (শরীরময় চোবানো) / আমি ঈর্ষাবিদ্ধ রাত, আমি ঈর্ষাবিদ্ধ রাত।”এরকমই প্রতিটা কবিতায়, সে তার ভাষাকে করেছে ৩য় ধারার বহুমুখী।সে দেখেছে এবং প্রকাশ করতে চেয়েছে সেই মহাজাগতিক বিস্ময়, যা সবসময় খেলা করে বেড়াচ্ছে চারপাশে প্রতিনিয়ত।’মহেঞ্জোদারো’ কবিতায়, যখন সে লেখে “পিক্টোগ্রাফিক ভাষায় / শুনিয়েছিলাম / অমাবস্যার কবিতা।” বা “সেদিন তুমি আঙুল নেড়ে, / এ মৃত্যুভূমির নাম দিয়েছিলে, / মৃতাক্ষরী।”; তখোন এই মহাজাগতিক বিস্ময়কালই য্যানো চোখের সামনে বা আড়ালে, মস্তিষ্কের ভিতর সৃষ্টি করে বা বলা ভালো সৃজন করে / রোপণ করে ~ আলোকবর্ষের বীজ

তবে এসব কথা সত্ত্বেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ দুর্লভের বিরুদ্ধে আনা প্রয়োজনীয়।যার ভিতরে প্রধানতো ৩টি বিষয়ে উল্লেখ করবো : (১) যতিচিহ্নের আবহমান প্রয়োগ ~ যখোন, এ সময়ে বাক্যের নির্মোহ আসক্তির ওপর জোর দেওয়া উচিৎ, তখোন যতিচিহ্নের এই আবহ ক্যানো ভিন্ন ধারার পরিপন্থী নয়; (২) আমি / তুমি যাতীয় বিষয়গুলির প্রয়োগ মনে হয়েছে অতিরিক্ত, কারণ শব্দার্থের প্রয়োগ এই সময়ে (এরকা আন্দোলন পরবর্তী কালপর্বে) হওয়া উচিৎ অমোঘ / অবিচ্ছিন্ন।সেখানে, এই শব্দগুলি ছাড়াও, বিষয়গুলি দাঁড়িয়ে থাকে; (৩) চেনা আবহের ভিতর, কেবলমাত্র শব্দকল্প দিয়ে ম্যাজিক রিয়েলিজম্ বা জাদু বাস্তবতা আমাদের অপরিচিত নয়।সুতরাং আবহকে আরো অচেনা করার প্রয়াস আগাম সতর্কীকরণ ছাড়াও করা নিয়ে ভাবাই যায়
আসলে ~ এই সমালোচনা একারণেই করা, যে তাঁর কবিতা তো আর কপিপেস্ট করা নয়।এ তাঁর নিজস্ব আধারেরই পর্যবেক্ষণ।যেখানে, যৌথতার ১দিকে য্যামন দুর্লভ; তেমনই বিপরীতেও রয়েছে আরেকজন দুর্লভ।হয়তো তাঁর ১ম কবিতার বই হিসেবে সেই ভয়ডরহীনতা দেখা গ্যালো না, তবে নিশ্চিত : সে এগুলোর সম্ভাবনাগুলি নিশ্চয় ভবিষ্যৎে খতিয়ে দেখবে এবং আরো ধারালো হবে তার প্রয়োগ।এপর্যন্ত বলে, তাকে শুভকামনা জানাই আর অপেক্ষায় থাকলাম তাঁর কামব্যাক্ করার সময়পর্বটির জন্যে।পরিশেষে, দুর্লভের জন্য কয়েকটা লাইন না লিখে থাকা গ্যালো না

কিভাবে দেখবে? দেখো || ইশারাধীন্
পর্দায় বোনা ~ রহস্যগোছা পিরামিড
শীত [বড্ড হুহুকার
পরস্পর ওম-বাষ্প কাছাকাছি
আরো বেশি ক্ষয়াংশ || বাতিল
শূন্যস্থান-পূরণ অহেতুক হাওয়াহানা
নিঃশর্ত ব্যর্থ শরীর
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।