গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

সমর্পণ
যদিও আকাশ নীল, তবুও মেঘের ঢল নেমেছে।
নেমেছে মনের আকাশে। এই ঘোড়ার বিলের কালো জলের থেকেও বেশি কালো সেই মেঘ।
বিশ্বাস করে যার হাতে নিজের সর্বস্ব তুলে দিয়েছিল সেই প্রেমিক যখন আকন্ঠ ভোগের পর নিজের সৃষ্টির দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে তখন পৃথিবী নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যায়। সুরঙ্গমার জীবনে আজ সেই অন্ধকার।
কাল পর্যন্ত তার এই মনের আকাশ ছিল শরতের নির্মল মেঘের পালকের মত। অনুরাগের পেঁজা তুলে সেখানে নীলসাদাতে সুখের আখর এঁকে দিয়ে গেছে। সেই আখরে স্বপ্নের জাল বুনতেই সে নতুন অস্তিত্ব টের পেয়েছে। নিজের সুখের কথা মনের মানুষের কানে দিয়ে রঙিন আগামীর সুখে মন যখন থির থির আবেশে দোলায়মান তখন প্রতিবেশী মহিলার অতলান্তিকে খোঁজ মিলেছে প্রেমিক মানুষটির। ভেঙে গেছে স্বপ্ন। মুছে গেছে আবেশ। নিজেকে নিঃশেষে মুছে ফেলবে আজ। মনস্থির করে ফেলেছে সুরো।
আজ তার সমর্পণের দিন। ঘোড়ার বিলের কালো জলে হবে আত্মসমর্পণ। সমাজ কিম্বা সন্তানের কাছে জবাবদিহির বালাই থাকবে না। তাইতো দিনান্তের নির্জনতাকে সঙ্গী
করে এখানে বসে থাকা সাঁঝের অপেক্ষায়।
দিগন্তের প্রান্ত রেখায় সাদা মেঘের ভেলায় বিন্দু বিন্দু ছবির মতো সুদূরপাড়ে ভেসে চলেছে বিহঙ্গের দল। আকাশের বুকে জ্যামিতিক রেখা চিত্রগুলো একের পর এক ঝাঁকে ঝাঁকে এগিয়ে চলেছে পশ্চিম পাড়ের কোনো এক ঠিকানায়। বিলের গভীর কালো স্থির জলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সুরঙ্গমা দেখে চলেছে আকাশের এই বিচিত্র চিত্র । ওদের মাঝেও তো আছে কোনো কারো কাছে নতুন জীবনের সন্ধান। ওরাও তো জীবনকে উপভোগ করে পছন্দের সাথীর সাথে।
হাতে ধরে থাকা কচিঘাসের মাথায় ফুটে থাকা ছোট্ট সাদা ফুলের সুড়সুড়ি বুলিয়ে নিচ্ছিল অধরের পরপাড়ে। যেন কারো গভীর গোপন পরশ ছিল ওই ঘাসের আগায়। ছিলই তো। সেই অবুঝ সবুজ ভালবাসার রসের জাড়ণে নির্ণীয়মান অবয়ব বুঝি রচে গেল আকাশপাড়ের চিত্রপট মনের আঙিনায়। উঠে দাঁড়ায় সুরঙ্গমা। আজ তার আত্মসমর্পণের দিন। তবে গভীর কালো জলে নয়। সমর্পণ করবে নিজের কাছে নিজেকে। প্রতিশোধ নিতে হবে ছলিয়া ছলনার। নিজেরই দৃষ্টির নাগালের মধ্যে রাখবে এই বহুরূপী ছলিয়াকে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে তাকে নিজের নবতম সংস্করণ। নিজের মধ্যে নিজের বিকাশে সৃষ্টি করবে পূর্ণাঙ্গ মানবীকে। দেহের আধারে জাগ্রত ছোট্ট প্রজাপতিকে নিয়ে আকাশের ত্রিভুজকে মাটির কোলে এঁকে দিতেই হবে এই সমর্পণ।