“অগ্নি সাক্ষী” ধারাবাহিক বড়ো গল্পে রত্না চক্রবর্তী (পর্ব – ২)

পেশায় শিক্ষিকা আর তার সাথে সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক সহজাত
(১)
আজ কতদিন পর তুমি আসবে।আমি তাই পথ চেয়ে আছি।তুমি আসবে কি করে জানলাম?কেউ বলে নি।আমি বাতাসে তোমার গন্ধ পাই।মনে আছে তুমি যখন অফিস থেকে ফিরতে, মোড়ের মাথায়,আমি ঠিক বুঝতে পারতাম তুমি আসছ।দরজা খুলে দাঁড়াতাম।তুমি হেসে বলতে-“সাথী কি করে বোঝ।”
কতদিন পর তোমায় দেখব আজ।আমি একা একা বুকে কান্না চেপে ঘুরে বেড়াই এই বাড়িতে।তোমার টাই,লাইটার চিরুনি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি।ওগুলোতে তোমার স্পর্শ পাই। আর তোমার ওই কাটগ্লাসের গ্লাসটা। ওটার উপর খুব রাগ আমার।তোমার ওই মদ খাবার নেশা তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল।
আমি ছাদে এসে দাঁড়ালাম। তুমি এলে অনেক দূর থেকে তোমায় দেখতে পাব। পথচারীদের মধ্যে তো তুমি নেই। কোন রিক্সাতেও তোমায় দেখতে পাচ্ছি না রূপেশ। আমাদের বাড়ির গেটের সামনে বড় গাড়িটা এসে থামল। তুমি নামলে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে!কিন্তু তোমার সঙ্গে ওরা দুজন কারা। ওই ভদ্রলোক, আর ওই মেয়েটি? ওদের আমি চিনি না। লোকটি বলল-“কমপ্লেক্সটা বেশ বড়।অনেকটা জায়গা।”
মেয়েটা বলল-“যাই বল কেমন যেন ভূতুড়ে বাড়ির মত।
আমার রাগ হয়ে গেল। আমার ভালোবাসার বাড়িকে ভূতুড়ে বলছে। এখানে আমার বাবা মা দাদু ছিলেন। তারা নেই কিন্তু তাদের স্মৃতি তো আছে এই বাড়ির কোনায় কোনায়। আর রূপেশকে বিয়ে করেও তো এই বাড়িতেই ঘর বেঁধেছিলাম।সেই সব দিনের স্মৃতি…….
তাকে বলছে ভূতুরে….আমি মেয়েটাকে দেখার জন্য আলসে থেকে ঝুঁকলাম।মেয়েটা বলল-“রূপ ছাদে কে গো?ঝুঁকে দেখল।” আমি সরে এলাম।রূপেশ বলল-“কেউ না তো।আরে তালা দেওয়া বাড়ি। কে থাকবে?”মেয়েটা অবাক হয়ে একবার উপরে তাকাল।তালা খুলে ওরা ঘরে ঢুকল।মেয়েটা রূপেশকে রূপ বলে ডাকছে। কে ও?আমি এখনই ওদের সামনে যাবনা। নিজেকে লুকিয়ে রাখব।

(২)
রূপেশরা ঘরে ঢুকল। ব্যাগ থেকে ইমার্জেন্সী লাইট বের করে জ্বালালো। যখনই ওরা বাইরে আউটিং এ যায় এগুলো সঙ্গে রাখে। এবার অবশ্য ওরা আউটিং এ আসে নি।এসেছে কাজে।সাথীর এই বিশাল বাড়ি রূপেশ বিক্রি করে দেবে।জিতু প্রোমোটার। ও কিনবে। তাই দেখতে এসেছে।
রূপেশ বলে-“চল তোমাদের আশপাশটা ঘুরে দেখাই।” অহনা বলে-“না না আগে ফ্রেশ হই। এতটা লঙ ড্রাইভ খুব টায়ার্ড। তাছাড়া যা অন্ধকার। আগে স্নান করতে চাই।”
রূপেশ বলে “তবে এস বাথরুম আর শোবার ঘরগুলো দেখিয়ে দিই। আসার সময় বাচ্চুদার দোকানে বলে এসেছি। বাচ্চুদা এখুনি একটা কাজের মেয়ে পাঠিয়ে দেবে। সে এসে জল তুলে দেবে। ঘরও পরিষ্কার করে দেবে। “ওরা উঠে দাঁড়ায়।

(৩)
দোতলায় আমার শোবার ঘরে আরামকেদারাটাতে বসে আমি ভাবছি…এরা কারা?কে ওই মেয়েটা?জিতু বলে ওই ছেলেটার বৌ? রূপেশের গায়ে সবসময় ঢলে পড়ছে। রূপেশ আপত্তি করছে না কেন? রূপেশ তো এমনিতে খুব লাজুক। খুব পালটে গেছে ও। এসে থেকে একবারও আমার নাম করল না। কত খুশী খুশী লাগছে ওকে। অথচ টালিগঞ্জ হাসপাতালে যখন যেত পাগলের মত কাঁদত আমার জন্য।আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। আমি ঠিক করলাম ওদের উপর আড়াল থেকে নজর রাখব।
নীচে নেমে এলাম।বাচ্চুদা যে মেয়েটিকে পাঠিয়েছে সে এসে ঘর পরিষ্কার করে দিয়েছে।রূপেশ ব্যাগ থেকে চাবি বার করে আমার আলমারী খুলল।চাদর বের করল।আমার গায়ে দেবার চাদরটা মাটিতে পরে গেল।ওটা আমার মাও গায়ে দিত। অহনা বলে মেয়েটা বলল-“এই রূপ, কি একটা পড়ে গেল।” রূপেশ বলল-“ওহ হো”…রূপেশ পায়ের বুড়ো আঙুলে তুলল চাদরটা। তারপর দলা পাকিয়ে ঢুকিয়ে দিল আলমারীতে। আমার বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। অহনা বলল-“যাক বাবা এতক্ষণে ঠিক লাগছে। চারদিকে যা ধুলো। আমার তো এলার্জী হয়ে যেত। এবার স্নান করে কফি খেয়ে সুস্থ হব।”
কাজের মেয়েটা বলল-“আমি রান্নাঘর পরিষ্কার করে বাসন টাসন মেজে দেব?” রূপেশ চেঁচিয়ে বলল-“না..কোন দরকার নেই।আমরা রান্না করা খাবার খাব না। বাচ্চুদা কে বলা আছে হোম ডেলিভারী খাবার আর মিনারেল ওয়াটারের বোতল পাঠিয়ে দেবে।” মেয়েটা থতমত খেয়ে গেল। রূপেশ পকেট থেকে দুটো একশ টাকার নোট বার করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল।মেয়েটা মনে হয় আশা করে নি। খুশী হয়ে চলে গেল। মেয়েটা চলে যেতে অহনা রূপেশের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। রূপেশের চোখে সেই পাগল করা দৃষ্টি। গভীর স্বরে ডাকল-“অহনা”….আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সেই এক স্বর। শুধু নামটা পালটে গেছে। অহনা মোচড় দিয়ে সরে এসে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল-“আগে স্নান করে আসি তারপর।” রূপেশ এই মেয়েটাকে ভালোবাসে। কত সুন্দর মেয়েটা? আমি ওকে সামনাসামনি ভালো করে দেখতে চাই। অহনা বাথরুমে ঢুকল। আমাদের বাথরুমটা বেশ বড়। ঘষা কাঁচের জানলা। আমি ঘষা কাঁচের জানলায় চোখ রাখলাম। আমাদের বাথরুমে সাওয়ার নেই।অহনা ওর পোশাক খুলে বালতি থেকে মগে জল তুলে গায়ে ঢালতে থাকে। সত্যি সুন্দর চেহারা মেয়েটার। আমার দীর্ঘশ্বাস পরে। অহনা কেমন চমকে ওঠে। তাড়াতাড়ি গা মুছে পোষাক পরে বেরিয়ে যায় বাথরুম থেকে। রূপেশ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। অহনা অস্বস্তি ভরা গলায় বলে-“রূপেশ তোমাদের বাথরুমটা এত বড় সব জায়গায় আলো পৌঁছায় না।আমার মনে হচ্ছিল কে যেন দেখছে।” রুপেশ হেসে বলে -“নিশ্চয় দেওয়ালের টিকটিকি মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে চেয়ে ছিল তোমার দিকে। আফটার অল তোমার যা ফিগার।” অহনা ধ্যাৎ বলে হাসতে হাসতে পাশের ঘরে আসে। এই ঘরে সেই আয়নাটা যেটাতে স্নান সেরে উঠে আমি সিঁদুর পরতাম।অহনা পাশের ঘর থেকেই রূপেশ কে বলল-“রূপেশ তুমি তো এখানে আসো নি বহুদিন। ঘরে এত ধূলো জমেছিল।কিন্তু আয়নাটা কি ঝকঝক করছে দেখ।” রূপেশ সেই পুরানো ভঙ্গীতে সোফায় গা হেলিয়ে দিয়ে চুরুট ধরিয়ে চাপা ঠোঁটে উত্তর দিল-“সবই তোমার অপেক্ষায় ডার্লিং।” বাব্বা কত ঘুরিয়ে কায়দায় উত্তর দিচ্ছে রূপেশ। এমন ভাবে কথা বলতেও জানত ও!? কই জানতাম না তো।আমি তো জানতাম ও লাজুক হাসতে পারে। আর আনমনে কি যেন সব হিসেব করে। আমি বাগানে এলাম।ড্রেসিংটেবিলের ঘরটার একটা জানলা বাগানের দিকে।সেই জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম।আমাদের বাড়ির জানলাগুলো খড়খড়ি দেওয়া। অহনা ড্রেসিংটেবিলের সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে।আমি খড়খড়ি সরালাম ওকে ভালো করে দেখব বলে।অহনা চমকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।আমি দ্রুত সরে গেলাম।রূপেশ ছুটে এল।অহনা আঙ্গুল তুলে জানলাটা দেখিয়ে ঢোঁক গিলে বলল-“এখানে কেউ ছিল।”রূপেশ কাউকে দেখতে না পেলেও খড়খড়ি তোলা দেখল। দ্রুত বাগানে এল। আমি তখন অন্ধকারে মিশে গেছি।ও চারদিক খুঁজে দেখল। তারপর অহনাকে বলল-“এতদিন ফাঁকা পরে আছে বাড়িটা। নিশ্চয় পাড়ার ছেলেরা আড্ডা জমায় বাগানটাতে।তাদেরই কেউ নিশ্চয় উঁকি মারছিল। খেয়াল রাখতে হবে। তুমি ভয় পেও না।” অহনা কেমন অস্বস্তি নিয়ে বলে “এসে থেকে মনে হচ্ছে কে যেন দেখছে সবসময়।”
আমি উপরে আমার ঘরে এলাম।এভাবে আড়ালেই থাকব আমি।নজর রাখব ওদের উপর।আমার পছন্দের আর ব্যবহারের টুকটাক সামগ্রী পরিষ্কার করে রাখি আমি।ড্রেসিং টেবিলটা তাই তো পরিষ্কার দেখেছে অহনা। কিন্তু ওদের সামনে এখন আমি যাব না।

(৪)
অহনা মেয়েটা বেশ দমে গেছে। পাশের ঘরে এসে সোফায় বসল। রূপেশ আয়েস করে ওর কোলে মাথা রেখে শুলো। অহনা বলল-“যাই বল,এই বাড়িতে এসে থেকে আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। সবসময় মনে হচ্ছে কে যেন আড়াল থেকে আমাদের উপর নজর রাখছে।”
রূপেশ বলে-“ও কিছু নয় অহনা।আসলে আমরা চিরকাল ফ্ল্যাটবাড়িতে মানুষ তো। তাই এই হাভেলী গোছের এত বড় বাড়িতে এসে কেমন কেমন লাগছে। বাট ডোন্ট ওড়ি। আমরা তো এখানে চিরকাল থাকব না। জীতু এই বাড়িটা নিয়ে নেবে। ফ্ল্যাট বানাবে। আর আমরা যা টাকা পাব তাই দিয়ে অন্য জায়গায় ফ্ল্যাট কিনে বিয়ের পর সেখানেই থাকব।”

(৫)
দারুণ চমকালাম আমি। আমার সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে। গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। এতগুলো ধাক্কা কি একসাথে সামলানো সম্ভব? আমার ভালোবাসার বাসা ভেঙে যাবে। ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। আমার স্বামী রূপেশ আমায় ভুলে গেছে। সে অহনাকে বিয়ে করবে। আমি ওর জন্য কেঁদে কেঁদে পাগল। ওর জন্যই আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যেতে পারিনি। অথচ ও আমার কথা ভুলে গেছে। আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। অনেক চেষ্টা করছি চাপার। কিন্তু পারছি না।
(৬)
রূপেশের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছিল অহনা। তিনপেগ খেয়ে রূপেশও ঘুমিয়ে পরেছিল।হঠাৎ হালকা ফোঁপানির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল অহনার। ও কান খাড়া করে শুনে রূপেশকে ডাকল-“রূপেশ…এই রূপেশ…শোন কেউ যেন কাঁদছে।” রূপেশেরও ঘুম ভেঙে যায়। সত্যি তো কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। এত রাতে এই ফাঁকা বাড়িতে কে কাঁদবে। তাও বোঝা যাচ্ছে গলাটা মেয়ের। ভ্রু কুঁচকে ওঠে রূপেশের। কান্নাটা দোতলার ঘর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।রূপেশ হাতে টর্চ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।বাইরের বসার ঘরটায় আসে।এখান থেকে দুটো সিঁড়ি দুদিক দিয়ে দোতলায় উঠে গেছে।রূপেশ বাঁদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। পিছন পিছন অহনাও আসে।রূপেশের এখন একটু এলকোহলিক ফ্যাট জমেছে। ইদানীং একটা হার্টের প্রবলেমও ধরা পড়েছে। দ্রুত সিঁড়ি ভাঙলে হাঁফ ধরে। কয়েকধাপ ওঠার পর রূপেশ দেখে সাথীর ঘরের পর্দার একটা দিক ঝুলে গিয়ে হাওয়ায় মাটিতে ঘষা খাচ্ছে।তার থেকেই এরকম শব্দ উঠছে।একটা নিশ্বাস ফেলে ও। নেমে আসতেই যাবে, এমন সময় পাশের ডানদিকের সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। অহনা অস্ফুট চিৎকার করে উঠল। রূপেশ ওর দিকে টর্চ ঘোরাতেই অহনা ফ্যাকাশে মুখে বলল-“ওদিকের সিঁড়ি দিয়ে কে যেন নেমে ওই ঘরটায় ঢুকল।” অহনা আঙ্গুল দিয়ে যে ঘরটা দেখাল সেটা রান্নাঘর। রূপেশ যেন কেমন হয়ে গেল। অহনা বলল-“জীতুকে ডাকব?দেখবে?” রূপেশ বলল-“না”। শক্ত হাতে অহনার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে ঘরে নিয়ে এল।অহনা দেখল রূপেশের হাত কাঁপছে। অনেক রাত অবধি ওদের ঘুম এল না। পরেরদিন যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। কাজের মেয়েটা এসে ঘর পরিষ্কার করে দিল। রূপেশ বাচ্চুদার দোকান থেকে একটা তালা আনিয়ে রান্নাঘরে নিজে হাতে লাগিয়ে দিল।
(৭)
আজ জিতু বলে ছেলেটা কোন এক উকিল বন্ধুর বাড়ি এই বাড়ির দলিলপত্র নিয়ে গেল। অহনা স্নানে গেল। রূপেশ আলমারি থেকে চাবি বার করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল আমি দোতলা থেকে চিলেকোঠার সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়ালাম। রূপেশের ভ্রূ কুঁচকে আছে। কেন রূপেশ? তুমি আমায় মনে করে আমার ঘরে এসেছ। তোমার মধ্যে দু:খ থাকবে। ভালোবাসার ব্যাথা ভরা স্মৃতি থাকবে। কিন্তু এমন সন্দেহ কুটিল মুখ কেন? রূপেশ চাবি বার করল দরজা খুলবে বলে। অবাক হয়ে দেখল তালাটা দরজার একটা আংটায় ঝুলছে। ও তো জানে না আমি এই ঘরেই থাকি। ও ঠেলা দিয়ে দরজা খুলল।আমি একটা জানলা খুলে রেখেছিলাম। সেখান দিয়ে রোদ এসেছে। টেবিলের উপর রাখা আমার আইবুড়ো বেলার ছবিটার উপর পড়েছে। টেবিলে আমার লেখার কলমটা ঢাকা খোলা অবস্থায় পরে আছে। রূপেশ হাতে তুলে দাগ টানল।লেখা পড়ল না। কালি শুকিয়ে গেছে। রূপেশ সোফার দিকে ঘুরল। আমার ঘরে পরার শাড়ীটা রাখা।আর সোফার সামনে আমার ঘরে পরার চপ্পলটা।রূপেশ বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়াল।জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলল।দেখল গামলার জলে মগটা দুলছে। বাথরুমের জানলা বন্ধ। হাওয়া নেই….তাও দুলছে। রূপেশ দুপা পিছিয়ে এল। আর তখনই দারুণ চমকে দেখল বাথরুমে রডের উপর আমার আধপোড়া হলুদ লাল জয়পুরী শাড়ীটা। বিস্ফারিত চোখে পিছু হাঁটতে হাঁটতে দেওয়ালে ধাক্কা খেল রূপেশ। পিছন ঘুরতেই দেখল টেবিলে নয়, আমার ছবিটা বাথরুমের মুখোমুখি বইএর তাকে। ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
(৮)
রূপেশ জোর করে ভাবতে চেষ্টা করে,সে অকারণ ভয় পাচ্ছে। সাথীকে সে নিজে হাতে পুড়িয়েছে।আত্মা ভূত এসবে সে বিশ্বাস করে না।কিন্তু কেন জানি না মনের ভিতর জোর পায় না।
সেদিন সারাদিন ওরা বাইরেই কাটালো।বোটানিক্স ঘুরতে গেল। অহনা বলল-“দেখ মনে হচ্ছে আমরা কচি প্রেমিক প্রেমিকা।” সারাদিনের হৈচৈ তে মনে জমা কালো ছায়াটা একটু হালকা হল রূপেশের। সন্ধ্যায় ওরা বাড়ি ফিরল। বাড়ি ঢুকেই অহনা বলল-“আহ…লাভলী…কি সুন্দর রজনীগন্ধার গন্ধ দেখ। তোমাদের বাগানে রজনীগন্ধার গাছ আছে বুঝি।” রূপেশেও পেয়েছে গন্ধটা। খুব পরিচিত এই গন্ধ। সাথী প্রতি সন্ধ্যায় টাটকা রজনীগন্ধা ফুল রাখত ফুলদানি তে। ওর খুব প্রিয় ছিল। বাগানে রজনীগন্ধার গাছ নেই। বন্ধ ঘরে এত তীব্র রজনীগন্ধার গন্ধ!…মাথা নাড়ে রূপেশ। কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া দিয়ে।
অহনা বাথরুমে গেল।জিতু নিজের ঘরে ফ্রেস হতে গেল। রূপেশ সোফায় গা এলিয়ে দিল।অহনার বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে। হাঁচছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে অহনা বলল-“ইস জল কম আছে,ভাবলাম একটু স্নান করব।” রূপেশ বলল-“ঠান্ডা লাগিয়ে হাঁচছ। আর এর মধ্যে স্নান করবে?” অহনা বিস্মিত হয়ে বলল-“ঠান্ডা!ঠান্ডা আমাকে ভয় পায় মশাই। আমি এভার হট। আমার কোন হাঁচি টাচি হয় নি।” অহনা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসে। কিন্তু তা রূপেশকে তাতাতে পারে না। সাথীর এলার্জী ছিল। রোজ সকাল সন্ধ্যে পরপর দশ বারোবার হেঁচেই যেত। খুব বিরক্ত লাগত রূপেশের যদিও বুঝতে দিত না। রূপেশ একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুলো। সে জানে ঘুম আজ তার আসবে না। আগামী কাল বাড়ির কাগজপত্র দেখে জিতুর সাথে বাড়ির ব্যাপারটা ফাইনাল হবে। হলেই তারা পরশু চলে যাবে এখান থেকে।
পরেরদিন বেশ বেলায় ঘুম থেকে উঠল ওরা।রূপেশের মনের ভয় সকালের সোনারোদে ফিকে হয়ে আসে। ও বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়। আর তখনই শুনতে পায় বন্ধ রান্নাঘরে কে পরপর চারবার হাঁচল। সকালের রোদটা কেমন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল রূপেশের কাছে। অহনা ঘুম থেকে উঠে বলল-“কি মি:কোল্ড। আমাকে তো খুব ঠান্ডা লাগার কথা বলা হচ্ছিল। আর নিজেই ঠান্ডা লাগিয়ে হাঁচছ।” অহনাও তবে হাঁচির শব্দ শুনেছে। রূপেশ যেটাকে ভুল শুনেছে,মনের কল্পনা ভেবে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছিল সেটা আর পারল না। আজও ওরা সারাদিন বাইরে বাইরে কাটাবে ঠিক করল। রূপেশ বাড়িতে থাকতেই চাইছে না। আজই সব ফাইনাল হয়ে যাবে। আজ রাতটুকু থেকে কালই ওরা চলে যাবে এখান থেকে।
(৯)
আর আমার হাতে সময় নেই রূপেশের মুখোমুখি হবার।ওকে যে অনেকগুলো প্রশ্ন করার আছে আমার।অনেক কিছু জানার আছে।হ্যাঁ, আজই আজই ওর মুখোমুখি হব আমি।
(১০)
রাতে ফিরে ওরা আজ বেশ কয়েক পেগ খেল।জিতু জানিয়েছে বাড়িটা ও নেবে। রূপেশ মনে মনে ভাবছে-“ব্যাস শুধু আজকে রাতটুকু।”রূপেশ আজও ঘুমের অষুধ খেল।একটা সাউন্

সমাপ্ত…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!