গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী (পর্ব – ৩)

নর্মদার পথে পথে
জালেশ্বর মন্দিরের ভিতরে সব সময়ই মাটির তলা থেকে জল এসে ভিজিয়ে দেয়। এখান থেকেই নর্মদা ভীমগর্জনে পশ্চিমঢাল অনুসরণ করে বয়ে গেছে আরব সাগরের দিকে।
—-
বছরটা দু’হাজার দশ। আমার ক্যান্সার অপারেশন হয়েছে। ছ’টা কেমোথেরাপি
আর ঊনচল্লিশটা রেডিয়েশনের মরণ ধাক্কার
ফলে আমাকে তখন দেখতে লাগত রোস্টেড চিকেনের মতো। মাথায় চুল নেই। চোখের পলক নেই। ভ্রূ’র কোনো চিহ্ন নেই। গায়ের চামড়া কুঁচকে ঝলঝলে হয়ে গেছে। পরিচিত লোকজন আমাকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। প্রথম প্রথম প্রতি সপ্তাহে সোমবার কলকাতা এপোলো হসপিটালে যাওয়া আর শুক্রবার আসানসোল ফিরে আসা ছাড়া আমি বাইরে বেরোই না।
দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় কতদিন লাগবে? আদৌ আমি বেঁচে থাকব কি না – এইসব বিভিন্ন বিষয়ে তখন আমার অফিসের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশিক্ষা মিশনের স্টাফরা এস – আই এর সবরকম সহযোগিতা করলেও তাদের দায়িত্ব সার্কেল বা ডিস্ট্রিক্ট কেউ নেয় না। আমাদের
অফিস বস আমার হসপিটাল পেপারস্ রিসিভ করেছেন তবে লিভ উইদাউট পে ‘করে দিয়েছেন বলে অফিস যেতে পারছি না। পরে অবশ্য সহকর্মীদের চাপে পড়ে আমাকে অফিসে যাবার পারমিশন দিয়েছিলেন। পাড়াপরশি – পরিচিতজনেরা আমার সামনাসামনি হলে
মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। কেউ একবার জিজ্ঞেস করে না “কেমন আছো?” আপনজন বলে যারা
জোর খাটাতো সেই পরিযায়ীরা কর্পূরের মতো
হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আত্মীয়রা অপেক্ষা করছেন কখন “মৃত্যু সংবাদ” আসে।
নিজের জীবনের এইরকম চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতি আমাকে একটু একটু করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। সারাক্ষণ যে বাড়িতে লোকজনের আসাযাওয়া লেগে থাকতো সেই বড়িটাই ভূতুরে বাড়ি হয়ে গেছে। এরমধ্যেই সব সময়ের জন্য যে মেয়েটিকে রাখা হয়েছিল সে ও কান্নাকাটি করে বিদায় নিল।
সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। তখন ডিপ্রশন কাটাতে যেখানে যে বই পাচ্ছি প্রায় গোগ্রাসে গিলছি। তখনই হাতে এল শ্রী শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রীর লেখা “তপোভূমি নর্মদা”।
বইটা পড়তে পড়তে আমি যেন একটা স্বপ্নের দেশে চলে যেতাম। নিজের অসুস্থতা কোথায় যেন হারিয়ে যেত। মনের মধ্যে ভালোলাগার
একটা নদী কুলুকুলু রবে নীরবে বয়ে যেত।
আমার চেতনায় বয়ে চলা সুরধূনীর মূর্ছনায় আমি বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। এই বই যেন আমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছিল। বইটা আমাকে ধীরে ধীরে সুস্থ করে তুলেছে। একটু একটু করে আবার মনের জোর ফিরে পেয়েছি। বইটা পড়তে পড়তে মনের মধ্যে চলার আনন্দ জেগে উঠেছে আর একই সাথে জেগে উঠেছে নর্মদা পরিক্রমার অদম্য ইচ্ছা। আমি আরো একবার মৃত্যুর সাথে চোখে চোখ রেখে উত্তর দিতে পেরেছিলাম নর্মদার মহাবীজ জপ করে।
আবারো আমার ছুটে চলা শুরু হল জীবনের পথে।