গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

জীবন থেকে নেয়া
সাগরা পৃথিবীর কতটুকু আমরা জানি? কতটা জানা সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে? উত্তর হলো – একটুও না। জানিনা। আর সম্পূর্ণভাবে জানাতো একেবারেই সম্ভব নয়। আসলে এই পৃথিবীর প্রতিটা জিনিস তার স্বকীয়তায় ভরপুর। সাধারণ মানুষের কাছে তার রহস্য ভেদ করা একপ্রকার অবাস্তব চিন্তা বলেই মনে হয়। আমাদের সামনে আগত প্রতিটা মুহূর্ত এক একটা চমক নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে। কখনো আমরা সেই চমকে চমৎকৃত হই আবার কখনো কিছুই বুঝতে না পেরে মুখ ফিরিয়ে থাকি। কারণ এই পৃথিবীতে আমরা সবাই নবীশ । প্রতি মুহূর্তে শিখছি। এই শিক্ষা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়।এ’হলো বাস্তবের কষ্টি পাথরে ঠোকর খেয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে শেখা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের অক্ষর চিনতে শেখায়। কিন্তু জীবনে লড়াই করে বেঁচে থাকার মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে দিতে পারে না। বাস্তবের কঠিন লড়াই থেকে যে শিক্ষা মানুষ পায় সেটা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসে থাকেনা। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ নিজে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে না পরছে ততক্ষণ সেই অবস্থায় পরলে কি অনুভূতি হয় বা সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে গেলে কি করতে হয় সেটা জানা সম্ভব নয়। সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলে যে উপস্থিত বুদ্ধির দরকার সেটাও অর্জন করা সম্ভব নয়। আসলে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে পরলে পরেই কোনো না কোনো রাস্তা এমন বেরিয়ে আসে যেপথে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। আজ এতকথা কেন বলছি? বলছি তার কারণ হল আমার ভাইঝি মিষ্টি। নামে আর স্বভাবে একই রকম সে। সবসময় হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল। কিন্তু ক্লাস টেনে উঠে তার ব্যবহারে বদল দেখা দিল। কারো সাথে কথা বলতে চাইত না। দশটা কথা বললে একটার উত্তর দেয়। বৌদি অবশ্য খুব খুশি মিষ্টির এই পরিবর্তন দেখে। বলে, এতদিনে মেয়েটা বড় হয়েছে। বকবকানিটা এখন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু আমার মনে সন্দেহ জাগে। আসল ঘটনা জানতে আমি মিষ্টির সাথে ভাব করি। ওকে নিয়ে “আদি মোহিনী মোহনে” কাপড় কিনতে যাই, আইলেক্সে সিনেমায় যাই। একটু দুরে যে সব আত্মীয় বাড়ি আছে সেখানে ওকে সাথে নিয়ে যাই। এককথায় তো আর রাজি হয় না। একটু গাঁইগুঁই করে। তবে শেষ পর্যন্ত যায়। সেখানে গিয়ে ছোটদের সাথে যখন হুল্লোরবাজি করে তখন কে বলবে যে এই মেয়ে আজকাল কথা বলতে চায়না। যাইহোক, এইভাবেই ধীরে ধীরে আমি ওর মনের কাছাকাছি হতে পেরেছি। এখন সব কথা আমার সাথে শেয়ার করে। জানলাম, ওর এতদিনের বেস্ট ফ্রেন্ড বিক্রম ওর সাথে চিট্ করেছে। এনুয়াল এক্সামের পর থেকে ওদের কাট্টি হয়ে গেছে। বিক্রম এখন স্নেহার বেস্ট ফ্রেন্ড। বুঝলাম, মান অভিমানের জালে জড়িয়ে পরেছে মিষ্টি। ওকে তখন এই গল্প বলার ছলে একটু বোঝাবার চেষ্টা করি। শোন, আমি যা বলছি সেটা এখন তোকে মনদিয়ে শুনতে হবে। মাঝে কিন্তু একটাও কথা বলা চলবে না। ধর, কোন বাচ্চা স্কুলে খুব কথা বলে। তার টিচার তাকে চুপ করতে বলেন। কিন্তু বাচ্চাতো খুবই টকেটিভ। মুহূর্তেই নিষেধ বাক্য ভুলে যায়। এজন্য বাচ্চাটা শাস্তিও পায়। তবুও কথা বলা বন্ধ করানো যায়না। পরীক্ষার সময় তার কথা বলার সুযোগ নিয়ে বন্ধুরা তারকাছ থেকে উত্তর জেনে- নিজেদের খাতায় লিখে সময় মতো খাতা জমা করে ভালো রেজাল্ট করেছে অথচ সে উত্তর কমপ্লিট করতে পারেনি বলে মনেরমতো রেজাল্ট হয়নি। সে তখন একটু একটু করে বুঝতে শেখে যে তার কথা বলতে ভালো লাগার সুযোগ নিয়ে বন্ধুরা তাকে ঠকাচ্ছে। বন্ধুরা নিজেদের প্রয়োজনে ওর সাথে কথা বলছে। টিচাররা ওকেই বকছেন। এইভাবে ঠকতে ঠকতে সে যখন বড় হয়ে ওঠে তখন প্রচন্ড স্বার্থপর হয়ে যায় আর বড় হতে হতে ধীরে ধীরে কথা বলাও বন্ধ করে দেয়। সংসারের এটাই নিয়ম। নিজে থেকে না শিখলে কেউ কাউকে কিছু শেখাতে পারে না। ঠিক সেই ভাবেই দীর্ঘদিন ধরে কাউকে ঠকিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করা গেলেও বন্ধুত্ব করা যায় না। যে মানুষ কাউকে বিশ্বাস করে কাছে টেনে নেয় তার বিশ্বাস ভেঙে গেলে সে যে মুখ দেখতে চাইবে না, মনেপ্রাণে ঘেন্না করবে হয়তোবা জীবন থেকে দূর করে দেবে – এটাই তো স্বাভাবিক। সবাই তো ঝগড়া করতে পারে না। তাই বলে প্রতিবাদ করতে পারে না – তা তো নয়। অনেক সময় ভদ্র ব্যবহারে পাশকাটিয়ে যাওয়াটাও যে তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। আবার অনেকক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটা হাসিমুখ চরম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। এগুলো সবই জীবন থেকে নেয়া শিক্ষা। এভাবেই আমরা বয়সের সাথে সাথে বড় হই আর শিক্ষিত হয়ে উঠি বুঝলি। মিষ্টি এতক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার আমায় জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে দিল। যদিও চোখের জল আটকে রাখতে পারেনি। আমিও বারণ করিনি। ওর মনে যে কষ্টের পাহাড় রয়েছে সেটা গলে যাওয়া খুব দরকার। ও এখন হাল্কা হোক। জোয়ার আসুক চোখের জলের। তবেই তো মন শক্ত করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তাই ওর এখন কান্নাটা খুব দরকার। _____