সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১৬

মর্তকায়ার অন্তরালে

||১৬ ||
বিশিষ্ট বিপ্লবী, ইতিহাস লেখক, প্রখ্যাত সাংবাদিক নলিনীকিশোর গুহ তাঁর ‘বাংলার বিপ্লববাদ’ গ্রন্থে লিখছেন : “পরাধীনতা যে জাতির সর্বাঙ্গীণ মুক্তির পরিপন্থী হইয়া রহিয়াছে সে কথা স্বামী বিবেকানন্দের বজ্র-বাণীতে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল | অধ্যাত্মজগতে যেমন ভারত প্রভু হইবার অধিকারী – আচার্যপদ লাভ করিতে সক্ষম, তেমনি রাষ্ট্রনৈতিক বশ্যতার অবসান ঘটিবে, রাষ্ট্র ক্ষেত্রেও ভারত নিজের প্রভু হইবে | বিবেকানন্দের পাশ্চাত্যে দিগবিজয় বাংলার যুবকগণকে আত্মসম্বিতে সচেতন করিল – ত্যাগী ব্রহ্মচারী স্বদেশপ্রাণ সন্ন্যাসী সাজাইল | স্বামীজী সম্পর্কে আমেরিকার প্রখ্যাত অধ্যাপক হেনরি রাইট মন্তব্য করেন : ‘Here is a man who is more learned than all our learned professors put together.’ – একজন বিদেশী পণ্ডিতের এই অকপট উক্তি ও স্বীকৃতিতে বাংলার বিপ্লবী কর্মীদের বুক ভরিয়া উঠিল – সেই সম্বিৎ ও আত্মবিশ্বাসের বুঝি তুলনা নাই |

বস্তুত সে যুগে বহু বিপ্লবকামী প্রকৃতপক্ষে স্বামীজীর আদর্শে জীবন গঠন করিতে, তাঁহারই বাণী জীবনে সার্থক করিতে শ্রদ্ধাশীল হইয়া উঠিল | সাক্ষাৎভাবে না হইলেও, স্বামীজীর বীর মূর্তিই যেন গুরু- তাঁহারই নিকট তরুণ বাংলা লইল দীক্ষা | স্বামীজী যে তদ্ গত চিত্ত, বীরভক্ত যুবকদের কামনা করিয়াছিলেন- সেই আদর্শে জীবন গঠন করিবার জন্যই ত্যাগী ব্রহ্মচারীর জীবন তাঁহারা যাপন করিতেন | গীতা তো ছিলই, তাঁহার সঙ্গে স্বামীজীর বক্তৃতাবলী, বিবিধগ্রন্থ, স্বামীজীর শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর ‘স্বামী শিষ্য সংবাদ’ হইয়া উঠিল নব গীতা, নবজীবন বেদ |”

স্বামী অখণ্ডানন্দের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে সমকালীন ভারতবর্ষের আর এক স্মৃতিকথা | “যতীন্দ্রনাথের তখন বয়স অল্প, ১৮-১৯ হবে | আমার ( স্বামী অখণ্ডানন্দ ) সঙ্গে খুবই বন্ধুত্ব | নরেনকে তাঁর কথা মাঝে মাঝে বলতাম | …..সে একদিন যতীনকে দেখতে চাইল |….আমি নরেনের সাথে যতীনের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি | …আমি যতীনকে নিয়ে এলাম | …স্বামীজী একটা চৌকিতে আধশোয়া হয়ে তামাক খাচ্ছিলেন | যতীন ঘরে ঢুকতেই তিনি আলবোলার নলটা হাত থেকে নামিয়ে রাখলেন | চেয়ে রইলেন যতীনের দিকে | সেদিন সেই সময়ে মনে হল যেন আগুন আগুনকে গিলে খাচ্ছে | আমাকে ঘর ছেড়ে বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন | ….প্রায় ঘণ্টাখানেক কী-যে তাদের কথা হল – স্বামীজী দরজা খুলে তাঁকে বাইরে নিয়ে এলেন | যতীনের কাঁধের উপর বা হাতটা রেখে বললেন, ‘আত্মীয়তা যেন মাঝে মাঝে দেখা করে বজায় রেখো |’ বলেই হেসে ঠাট্টা করলেন , ‘জানই তো মানুষের কুটুম আসতে যেতে |’ ….যতীন তারপর প্রায়ই আসত, কিন্তু কী যে তাদের কথা হত জানতে পারিনি |” ২৬ কথার ফলশ্রুতিতেই কি বুড়ীবালামের যুদ্ধ ? গবেষকগণ এ কথার উত্তর নিশ্চয় ভবিষ্যতে দেবেন |

বাঘা যতীন বিবেকানন্দ ও ঠাকুরের প্রতি কতখানি অনুরক্ত ছিল তা চার্লস টেগার্টের একটি গোপন রিপোর্ট থেকে জানতে পারি | ঐ গোপন রিপোর্ট থেকে জানা যায় – অমরেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, মাখন সেন, যতীন্দ্রনাথ মুখার্জি ও অন্যান্য বিপ্লবী সদস্যরা ১৯১৪ এর ফেব্রুআরিতে শ্রী রামকৃষ্ণ জন্মোৎসবে যোগদান করেছিলেন | ২৭ এটাই বাঘাযতীনের শেষ যোগদানের সুযোগ |`এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, আমৃত্যু বিবেকানন্দের ভাব ও চিন্তায় তন্ময় ছিলেন |

আর একজনের কথা না বললে প্রবন্ধ অনুসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই পর্বটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে | তিনি শুধু বিপ্লব আন্দেোলনকে সমর্থনই করেননি, করেছেন পূর্ণ সহযোগিতা | তিনি নিজেও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য( কর্মী) ছিলেন | স্বামীজির স্বপ্নকে সফল করতেই বোধহয় নিবেদিতা এই পথটি বেছে নিয়েছিলেন | নিবেদিতা সঙ্কল্পবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি আমৃত্যু স্বামীজির কাজ করে যাবেন | সুতরাং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে চরম পন্থার যে নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাকে স্বামীজির কাজ বলে মেনে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত | দীনেশ সেনও লিখিয়াছেন : “নিবেদিতা রাজনৈতিক চরমপন্থী ছিলেন |” অনেকেই এই মতকে সমর্থন করেননি | কিন্তু সত্য কারুর মতামতের উপর নির্ভর করে না | নিবেদিতার সঙ্গে বিপ্লবী আন্দোলনের সংস্রব ছিল – যার জন্য তিনি সদা সর্তক থাকতেন | তিনি গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ ধারণ করতেন | এ তাঁর নিজেরই কথা | “I am travelling incogas Mrs. Thate Margot and have got quite used to any new signature.”২৮

১৯০১ সালের ১জুলাই মদনলাল ধিঙ্গড়া যখন কার্জন উইলিকে হত্যা করেন তখন তিনি ছদ্মবেশে ইউরোপে রয়েছেন এবং মিসেস মার্গট নামে পরিচিত | ( নিবেদিতা লোকমাতা, ৩য় খণ্ড, শঙ্করীপ্রসাদ বসু) ছদ্মবেশ ধারণে নিবেদিতা এতটাই নিখুঁত যে গোয়েন্দা রিপোর্টে এর কোনো উল্লেখ নেই |

বিদ্রোহাত্মক সংবাদপত্র ‘বন্দেমাতরম’ এ ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের পক্ষে স্বেচ্ছায় জামিন হতে চেয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা |

তাঁর ( নিবেদিতার ) বৈপ্লবিক কাজের সমর্থনে বলা যেতে পারে – নলিনীকান্ত গুপ্তকে বোমা তৈরির সুযোগ করে দেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবরেটরিতে, বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে স্বদেশী ও বয়কট নীতির প্রচার, ১১মার্চ টাউন হলে লর্ড কার্জনের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদী সভায় প্রতিবাদ, লালা লাজপত রায়ের বিপ্লবকে সমর্থন ইত্যাদি ইত্যাদি |
ক্রমশ …..

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!