গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

কঙ্কাল
এত রাতে আজ এখানে একা জেগে আছে প্রতীক। কারো সাথে একটু কথা বলে যে মনটা হাল্কা করবে তেমন কেউ নেই এখানে। একা একা কখনো হসপিটাল কড়িডোরে পায়চারি করছে কখনো বা চেয়ারে বসে বসে ঝিমাচ্ছে। ।
সুতপা মেয়ের সাথে রয়েছে মাল্টিন্যাশনাল এই হসপিটালের গাইনোকোলজিতে। আফটার আ প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি অব সেভেন মান্থস গার্ল চাইল্ড, বহ্নিকে ক্রিটিক্যাল কেয়ারে রাখা হয়েছে। বহ্নি ওদের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই খুব আদরে বড় হয়েছে। অভাব কি জিনিস জানেনি কখনো।
প্রতীক নিজে ছোটবেলা থেকে অনেক স্ট্রাগল করে আজ “নিকোলাস এন্টারপ্রাইজে”র মার্কেটিং হেড হয়েছে। প্রাচুর্যের চূড়ায় থেকেও শৈশবের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো আজও তাড়া করে বেরায় ওকে। তাই ওর সন্তানেরো যেন সেরকম নাহয় সেটা ও সবসময়ই চেষ্টা করেছে। তাইতো মেয়ের ছোটবড় সব আব্দার নির্দ্বিধায় পূরণ করে গেছে।
মেয়ে যখন ছোট ছিল তখন সুতপা প্রতিবাদ করেছে। বার বার বুঝিয়েছে প্রতীককে যে অভাব না থাকলে মানুষ কখনোই কোন জিনিসের কদর করতে শেখেনা। মেয়েকে বাস্তবটা চেনাতে হলে কিছুটা অভাব রাখতেই হবে। কিন্তু তাতে উল্টো ফল হয়েছে। দিনের পর দিন সংসারে অশান্তি করে ও নিজেই সুতপার থেকে দুরে সরে গেছে। কত দিন এমন গেছে যে অফিসে কাজ আছে বলে রাতে বাড়িতেও ফেরেনি। ওর পি. এ. মিসেস চড্ডা ফোন করে জানিয়েছে, ” আজ রাতে স্যার অফিসেই থাকবেন। আপনি চিন্তা করবেন না।” সুতপা জানে, এই সব সময়ে মিসেস চড্ডা প্রতীকের সাথেই থাকে। এমনকি প্রতীক যখন অফিসের কাজে বাইরে যায় তখনও দুজন একসাথেই থাকে।
তবে এসব ব্যাপার নিয়ে সুতপা কখনো কোনো কথা বলেনি। ছোটবেলা থেকেই সুতপা জানে যে সংসারে থাকতে হলে অনেক কিছু মুখ বন্ধ করে সহ্য করতে হয়। পুরুষ মানুষের পয়সা থাকলে একটু আধটু ”বা’রমুখো” হয়েই থাকে তবে ‘দিনের শেষে পাখি বাসাতেই ফেরে’- এই প্রবাদটাকে ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে।
এখন শুধু মেয়েটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের নানান চাহিদা থাকে । ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা তো হয়না শুধু ইচ্ছেপূরনের চাহিদাতে ভেসে চলা।
প্রতীক শুধু মেয়ের চাহিদা মত টাকার যোগান দিয়ে গেছে। বাবা হিসেবে কখনও মেয়ের কাছে বসে ওর মনের কথা জানতে চায়নি। কখনও মেয়ের বন্ধু হয়ে ওঠে নি।
উঠতি বয়সের আকর্ষণে প্রচুর ছেলেবন্ধু আছে বহ্নির। ওদের সাথেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে। চালচলনেও একটা রুক্ষ পুরুষালি ভাব রয়েছে এই মেয়ের। সে যে কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরবে, এভাবে প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবে এটা ভাবতেও পারেনি সুতপা।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বহ্নিকে ওয়াশরুম থেকে বেরোতে দেখে জিজ্ঞেস করে – “আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে পরলি যে? কোথাও যাবি না কি?”
নাতো! কোথায় আবার যাবো? ভোরবেলা থেকে কেমন গা গুলিয়ে উঠছে, আর মনে হচ্ছে” – – বলতে বলতে মুখে হাত চাপা দিয়ে ছুটে যায় ওয়াশরুমে।
সুতপা বেশ কিছু দিন ধরেই লক্ষ্য করছে যে মেয়ে অনেক খাবার এভোয়েড করছে। জিজ্ঞেস করলে বলেছিলো -দেখোনা, আমার কেমন ভুঁড়ি হচ্ছে। কেমন মোটু হয়ে যাচ্ছি আজকাল।
তবে আজ সকালের এমন ঘটনা দেখে আর দেরি না করে ডাক্তার বিপাশার সাথে কথা বলে পৌঁছে যায় ওঁর ক্লিনিকে। বিপাশা ওকে দেখে বলেন, ইটস্ অলরেডি টোয়েন্টিটু উইকস্ ওভার। এখন আর কিছু করা যাবে না। আর দু’এক মাস ওয়েট করতেই হবে। একটু ডেভলপড্ হলেই ওপেন করে বাচ্চা তুলে নেয়া যাবে। কেউ জানতে পারবেনা। একটু ধৈর্য ধরতেই হবে এখন।
ব্যপারটা প্রতীককে যখন বলেছে তখন সুতপাকেই নানা রকম কথা শুনতে হয়েছে। তবুও মেয়ের কাছে জানতে চায়নি কখন কোথায় কিকরে এসব হয়েছে!
বহ্নি যখন আজ নিজের চোখে দেখল ওর কোমরে ইনজেকশন দিয়ে লোয়ার পোর্শন অবশ করে পেট কেটে বাচ্চা তুলে নেয়া হচ্ছে তখনই সেন্সলেস হয়ে পরে। মেয়েকে এডমিট করা হয়েছে বলে প্রতীক আজ সকাল থেকেই রয়েছে এখানে। বার বার মনে হয়েছে সুতপা এতদিন ধরে যা বলতে চেয়েছে সব ঠিক। সুতপার কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করলে আজ হয়তো মেয়েটার জীবনে এতবড় দুর্ঘটনা ঘটতনা। বড্ড দেরি হয়ে গেল সংসারের হাল ধরতে। দীর্ঘ দিনের একটা
সম্পর্কের সমীকরণ কখন যে কিভাবে বদলে গিয়ে বাস্তবের রুক্ষমাটিতে দাঁড় করিয়ে দেয় তা আমরা আন্দাজ করতেও পারি না। তবে শক্ত হাতে হাল না ধরলে সম্পর্কের সোনালী দিনগুলি হারিয়ে যায় জীবন থেকে। পরে থাকে বহু অপমান নিয়ে বেঁচে থাকা সম্পর্কের একটা কঙ্কাল।