গদ্য বোলো না তে রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা নিক্ষেপন চায় এই মুহূর্তে জীবন

একটানা কাজ করে চললে কখনও কখনও একটু থামতে হয়৷ শীতলপাটি বিছিয়ে খানিক জল গড়িয়ে খেলে মন্দ না! বিশ্রাম প্রয়োজন হলে শরীর ইঙ্গিত দেয়৷ যেমন বৃষ্টির আগে আকাশে গাঢ় কালো মেঘ বেশ জাঁকিয়ে সংসার পাতে৷ ইঙ্গিত এমনি৷ আমরা তখন ছাতা নিয়ে বের হই৷ শরীরের উপসর্গগুলোও তেমনি কখনও কখনও নড়েচড়ে বসে৷ ইশারায় কান পাতলে, দক্ষিণের দ্বার খুলে যায়৷ তুমি জিতেও বা জেতে পার৷ মাত দিতে পার মোক্ষম চালে৷ আর যদি এড়িয়ে যাও সে ইঙ্গিত, নিজের মর্জিতে ভেসে চল বলাকার মত, অবাধ্যের মত অতিক্রম কর আরও দীর্ঘ পথ, তবে সে পথের শেষে কোন অনভিপ্রেত দৃশ্য অপেক্ষারত রয়েছে তোমার জন্য৷ হতে পারে৷ হতেই পারে৷
কাজ আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক আড্ডা আড্ডা মরশুম, সে ভারি আলো আঁধারি খেলা৷ কিন্তু সে আড্ডায় আজ মনখারাপি সুর৷ একে অন্যের থেকে দূরে৷ যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ৷ যেন পৃথক পৃথক বৃত্ত৷ সব মোড়ে মোড়ে জবুথুবু সময়ের এক একটা মূর্তি ৷ রাস্তার গলিতে উপগলিতে আড্ডা ঘরগুলোর ভেতর চেয়ার টেবিল, আয়না পাখা মলিন হয়ে এসেছে৷ পেয়ালার ঠুং ঠাং, পিরিচের দানী, চামচ কাটাচামের লড়াই, ঝিম ধরা মিউঝিক, সবেতে এখন বিরতির অতিদীর্ঘ শীতঘুমের ছোঁয়া লেগেছে৷ হিমসাগর গোলাপখাস পেয়ারাফুলি ফজলি আর কত কত আম যেন খদ্দেরহীন বাজারে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে৷ এযেন এক নেই রাজ্যের আরব্যরজনী৷
জীবনে মাঝেমধ্যে অবসরটা যেন কেকের মধ্য ভ্যানিলা এসেন্সের মত৷ বেশি দিলে, কড়া উগ্র হয়ে যায় গন্ধ৷ তাই কাজের ফাঁকে অবসর বেশ জলভরা সন্দেশের মত৷ রসটা যখন জিভে পড়ে, সে চরম আহ্লাদ! কিন্তু সেই অবসরই যদি অখন্ড অপরিসীম হয়, তাহলে সেই স্বাদ বিস্বাদ হতে কতই বা সময় লাগবে ? পরিস্থিতি যখন ঘূর্ণাবর্তের মধ্য ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করছে, নিষ্কৃতির ঘরে রাহু, আমরা তখন দমবন্ধ জীবনে হাতরে বেড়াই অতীত স্মৃতির শরীর৷ একঘেয়ে ৷ জানলা দরজায় আঁটা আতঙ্কের শীলমোহর৷
তবু তো নদী বয়ে যাবে৷ ছোট নৌকা, ডিঙি নৌকা, পালতোলা বজরা, জাহাজ সব ভাসতে থাকবে বিপুল তরঙ্গে৷ দিশা চিনে অথবা দিশেহারা৷ জীবনে বহু আছাড় খেতে খেতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছি আমরা, কালশিটের দাগগুলো হয়ত এখনও আছে৷ সময় সবচেয়ে বড় নির্ধারক৷ আর একটা আছাড়, আর একটা নিক্ষেপন চায় এই মুহূর্তে জীবন৷ তা হল, স্মৃতির অঘোর নাব্যতা থেকে কবে যে আছড়ে ফেলবে জীবনকে কর্মযজ্ঞের ব্যস্ত প্যাভিলিয়ানে, কেউ জানিনা! তবু সেই ঐশ্বরিক ক্ষণের অপেক্ষায় এখন আমরা সকলে দিন গুনছি৷ এও এক পরিহাস নয় কি ?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।