।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় রণিত ভৌমিক

 মানুষরূপী ঈশ্বর

করোনার কারণে গোটা বিশ্ব জুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের শিকার হচ্ছে। যেসব জায়গা মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে, সেগুলো দেখলে এখন ভূতুড়ে মনে হয়। প্রতিদিনের চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা, স্কুল-কলেজ বন্ধ, ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা, গণ-জমায়েতের উপর বিধিনিষেধ। কিন্তু এর শেষ কোথায়? মানুষ কবে নাগাদ আবার তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে? সেটা বোধহয় কারোরই জানা নেই। করোনা ভাইরাসের এখনো যে কোনও চিকিৎসা নেই! বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা নানান ভাবে করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের জন্য দ্রুততার সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ তবে, এটি সফল হবে কিনা কিংবা বিশ্বজুড়ে এই টিকা দেওয়া যাবে কিনা, সে নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং যতদিন না সম্পূর্ণ পরীক্ষিত প্রতিষেধক বাজারে মিলছে, ততদিন এই অজানা শত্রুর সঙ্গে বাকি আর পাঁচটা ডাক্তারের মতো অভিমন্যুকেও রোজকার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, শুধুমাত্র মানব জাতির স্বার্থে।
একদিকে, যেমন সেনসেক্স সূচক তলানিতে ঠেকেছে, এ খবর আমরা রোজ দেখছি। শেয়ার বাজারের ওঠানামার সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ও তার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার তুল্যমূল্য বিচার যেমন বিশেষজ্ঞরা করছেন প্রতিনিয়ত। ঠিক তেমনই ফুটে উঠছে সেই দৃশ্য, বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আর বৃদ্ধা মাকে রেখে, অভিমন্যুর মতো ডাক্তারদের প্রতিদিন হাসপাতাল ছুটতে হচ্ছে। এক এক দিন এমনও ঘটে, যখন বাড়ি ফেরার ইচ্ছা থাকলেও, পরিস্থিতির চাপে হাসপাতালেই থেকে যেতে হয়। কখনো করোনার জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডের একদম শেষ প্রান্তের বারান্দায় শুয়ে, তো কখনো আবার বাথরুমের পাশের ওই ছোট্ট ঘরটায় বাকি কর্মীদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে ফের ভোর ভোর রোগীদের সেবায় লেগে পড়তে হয়। আসলে মানুষকে সেবা করার শপথ নিয়েই যে ডাক্তারদের এই পেশায় প্রবেশ করতে হয়। ফলে, এই পেশাটি রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক বেশি সম্মানের। ডাক্তাররা মানুষের জীবন রক্ষার কাজ করেন বলেই হয়ত এই পেশাটি মানবসেবার অন্যতম একটি অংশ। স্বাস্থ্যসেবার স্বার্থে ডাক্তারদের যে কোনও পরিস্থিতিতে যে কোনও জায়গায় কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে, এটাই যে এই পেশার মূল মন্ত্র। তাই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা যখন সোশ্যাল ডিসট্যান্স বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে, তখন অভিমন্যুর মতো সকল স্বাস্থ্য কর্মীদের করোনার একেবারে নিকট পৌঁছে, তাকে মাত দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সেদিন নাইট ডিউটি সেরে সবে বাড়ি ফিরেছে অভিমন্যু। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর থমথমে মুখটা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করল সে,
– রিমা, তোমার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে শরীরটা খারাপ? যন্ত্রণাটা বেড়েছে তাই না?
– (রিমার ছোট্ট একটা জবাব) জানি না।
– (ঠোঁটের কোণে একটু হাসি রেখে অভিমন্যু বলল) তা ম্যাডামের রাগ হয়েছে, না অভিমান শুনি?
– না! শুধু চিন্তা হচ্ছে তোমায় নিয়ে। রোগীদের চিকিৎসা করতে করতে তোমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমরা কি করব, অভি?
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর, দেওয়ালে টাঙ্গানো লামিনেশন করা ডিগ্রিটার দিকে তাকিয়ে অভিমন্যু বলল,
– জানো তো, রিমা। যেদিন এই ডাক্তারি ডিগ্রিটা প্রথম হাতে পেয়েছিলাম, সেদিন নিজের মনে আনন্দের পাশাপাশি একটা দায়িত্ববোধও অনুভব করেছিলাম। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে সংকটের মুখে দেখেও, শুধুমাত্র নিজের কথা ভেবে যদি পিছিয়ে আসি, তাহলে এই ডিগ্রিটা কীসের বলতে পারো! জওয়ানরা যেমন সীমান্তে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত শত্রুদের মোকাবিলা করছে, একইভাবে আমাদেরও করোনার মোকাবিলা করতে হবে, মানবতার স্বার্থে। এখন ‘নিজের’ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে, সবার কথা ভাবার সময়।
হ্যাঁ! অভিমন্যুর মতো একই রকম চিন্তাধারার ব্যক্তিরা সামনে দাঁড়িয়ে করোনার বিরুদ্ধে মোকাবিলা করছে বলেই হয়ত ধীরে ধীরে রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারছে। আমাদের দেশে এমনিতেই জনসংখ্যার তুলনায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চূড়ান্ত অভাব, ডাক্তারের সংখ্যাও কম। তা সত্ত্বেও, করোনা যুদ্ধে সেই সকল ডাক্তার সহ বাকি স্বাস্থ্যকর্মীদের এই জীবন বাজি রেখে অক্লান্ত লড়াই করে যাওয়ার মানসিকতা, সাধারণ মানুষকে ফের সুস্থ পৃথিবী ফিরে পেতে সাহায্য করছে।
আজ প্রায় পাঁচটা বছর কেটে গেছে, পৃথিবী এখন অনেকটাই করোনা মুক্ত হতে পেরেছে। কিন্তু অভিমন্যুর ছবির সামনে বড় বড় করে লেখা- ‘করোনা যুদ্ধের বীর যোদ্ধা, অমর রহে’, কথাটা দেখে রিমা এখনো ওর স্বামীর সেই উক্তিটা স্মরণ করে আর নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলে। তবে, সেই চোখের জলে, বিষণ্ণতার পাশাপাশি মিশে থাকে স্বামীর প্রতি হওয়া ওর গর্ববোধ। সত্যি, অভিমন্যুর মতো অনেকের এই বৃহৎ স্বার্থত্যাগ এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা হয়ত রিমার মতো অনেক স্ত্রীরই দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে দিয়েছে। কিন্তু অভিমন্যুর এই বলিদান আবারও প্রমাণ করে দেয় যে কিছু পেশায়, ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে মানব জাতির স্বার্থ অনেক বড় এবং আমাদের সবার উচিত সেটাকেই প্রাধান্য দেওয়া। আর তাই তো, ঈশ্বরের আসনে মানুষ অভিমন্যুর মতো ডাক্তারদের সর্বদা স্থান দিয়ে এসেছে এবং আগামীদিনেও দিয়ে আসবে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।