সম্পাদকীয়

দুর্গা পূজা এমন একটা পূজা যেখানে মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এক মঞ্চে এসে দাঁড়ায় ৷ হৃদয়ের যন্ত্রীতে অনাবিল উন্মাদনার একই সুর বেজে চলে ৷ শিউলির ভোর, ঢাকের বোলের নেশা, নতুন জামার উড়ুউড়ু গন্ধ সব মিলিয়ে মনের কোন আলো হয়ে যায় ৷ মন্ত্রধ্বনির পবিত্র উচ্চারণের অনুরণন আচ্ছন্ন করে পৃথিবীর জল স্থল অন্তরীক্ষ ৷ বাহারি প্রজাপতির রংমিতালির খেলা রামধনু আঁকতে থাকে, মাঠে প্রান্তরে বিন্দুবাসিনী মেঘের কোলে ৷ এত সাজসজ্জা, এত আহামরি রূপের ছটায়, মা বাপের বাড়ি আসে চার দিনের আনন্দবিহারে ৷ তবুও কোথায় যেন কত জীবনের কত জীবিকারও ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প রয়েছে এই পূজাকে ঘিরে ৷
অরুণ, মিতালী, খোকা, বিল্টু, বিষ্টু পাল, ষষ্ঠী পাল, মনোহারীলাল, করিম শেখ, গুরপ্রীত কত নাম বলব ! আমি জানি এদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি ৷ প্রতি বছর পূজায় যা আয় হয় তাই দিয়ে ছাউনি মেরামত করে, ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানটাকে আরও একটু সাজিয়ে নেয়, পোস্ট অফিসে দুটো পয়সা রাখে, রুগ্ন মাটাকে এবার সে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে ভাবে, মেয়েটার বিয়ের জন্য সামান্য কিছু সরিয়ে রাখে ৷ আমি দেখেছি মা বাপের বাড়ি আসলে এদের চোখগুলো আনন্দে চকচক করে ওঠে ৷ আমরাও তো দুর্গা পূজার জন্য অপেক্ষা করে থাকি ৷ আনন্দে আমদেরও চোখ রঙীন হয়ে ওঠে ৷ তবে এইসব মানুষগুলোর আনন্দ এক অপরিসীম বেগবতী নদীর মত ৷ যেন পুজোটা তাদের কাছে ধূ ধূ মরুপ্রান্তরের মাঝে একটা ওয়েসিস, একটা মরুদ্যান ৷ কত স্বপ্ন কত আশা পূরণের চাবিকাঠি ৷
মৃতশিল্পীর আঙ্গিনায় মূর্তিরা সেজে ওঠে, ফুলের ব্যাপারী ফুলের সজ্জা দিয়ে পৃথিবীর সাজায়, খাবারের দোকান জুড়ে স্বাদ আর গন্ধের বারাবারি, আরও কত আরও কত জীবিকা আর জীবন বেঁধে যায় এ পূজোর আচারের সাথেসাথে, আনন্দের সাথে, উদযাপনের সাথে ৷ পুজো শুধু আনন্দ নয়, শুধু জাঁকজমক নয়, শুধু উপহার নয় তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু ৷ এইসব পরিবারগুলোর রুজি, বেঁচে থাকার রসদ, বাঁচিয়ে রাখার শর্ত ৷ এ সহজ সত্য আমাদের ভুললে চলবে না !
তাই ভুললে চলবে কেন, এ শুধু পূজা নয়৷ এই মহামিলনের উৎসব, বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, জীবন জীবিকার অমোঘ নির্ধায়ক ৷
একবারও ভেবে দেখেছেন ছোট ছোট বিক্রেতারা যারা অপেক্ষা করে থাকেন এই চারটে দিনের জন্য, তাদের কথা !!

✍️ রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
( কাঞ্চনকন্যা )

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!