T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় রণিত ভৌমিক

নীল আকাশের ঘুড়ি
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তখন প্রায় মধ্যরাত। নতুন ফ্ল্যাটে এমনিই আমার ঘুম আসে না। জানলার কাছে এসে তাই দাঁড়ালাম। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পাশের ফ্ল্যাটের জানলা। দেখলাম বাচ্চাটা এখনও ঘুমায়নি। দু-দিন হলো এই ফ্ল্যাটে এসেছি। রোজই দেখি বিকেল হলেই বাচ্চাটা ওর ঘরের জানলার উপর বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকায়, কিন্তু কথা বলে না। ওই ফ্ল্যাটটা নাকি এক ডাক্তারের।
যাইহোক, রাত বাড়ছে তবুও দেখি যে বাচ্চাটা তখনও জানলায় বসে। আমারও ঘুম আসছে না। বাচ্চাটাকে ডাকলাম। তাকালো কিন্তু কথা বলল না। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
প্রায়ই এরকম হয়। আমি একদিন আমার মাকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার সঙ্গে সামনের ফ্যাটের বাচ্চাটা কথা বলে?”
উত্তরে মা বলল,”খুব একটা না, টুকটাক। একদিন দুপুরে ওর আঁকা ছবিগুলো জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখাচ্ছিল। দারুণ আঁকার হাত রে! ব্যস, ওইটুকুই”।
“কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলে না। কোন ক্লাসে পড়ে ছেলেটা?”
মা বলল,”ক্লাস ফোরে। ওর নাম নীলাঞ্জন। ডাক নাম নীল।
এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা রাত। আমি একদিন বিকেলবেলা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। নীল জানলায় বসে। ঘুড়ি উড়ছে আর ও ফেল ফেল করে সেটার দিকে তাকিয়ে। আমি ডাকলাম,”এই নীল। নীল…”।
কিন্তু কে শোনে আমার ডাক! আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু। হঠাৎ আমার পিছনে এসে মা দাঁড়ালো। বলল,”কার সঙ্গে কথা বলছিস?”
আমি সামনের ফ্ল্যাটের জানলার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম,”কেন নীল। ওই দেখো, জানলায় দাঁড়িয়ে সে”।
মা বলল,”চোখের মাথা খেয়েছিস! এই তো আমার সঙ্গে নীল। ওর আঁকার খাতাটা আমাকে দেখাতে ও নিয়ে এসেছে। ওই তো….”।
আমার বিছানার উপর তখন বসে নীল। আমি আবার জানলার দিকে তাকালাম, আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে নীল ওর ঘরের জানলায় বসে। আমি আবার বিছানার দিকে তাকালাম। এই তো বসে! তবে?
আমার মাথা ঘুরছে। এক মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। তবুও মনে জোর নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার কি কোনও ভাই আছে নীল?”
নীল বলল,”ছিল। একদিন আমার ঘুড়িটা পাড়তে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে। আকাশ আর আমি যমজ ছিলাম”।
আমি আবার জানলার দিকে তাকালাম। চমকে উঠলাম। আকাশ আমার ঘরের জানলার রড ধরে দাঁড়িয়ে এবং আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর বলছে,”ঘুড়ি… ঘুড়ি… ঘুড়ি….”।
সমাপ্তি