সম্পাদকীয়

হয়ত……..

সম্পর্কে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় মানুষ ৷ গতদিনের সমস্ত ক্ষত ভুলে আবার শুরু করতে চায় ৷ দ্বন্দ বাঁধে সেখানেই, কোন কিছুকে জোর করে ভুলে থাকা যায় না, যত জোর খাটানো হয় তত আরও বেশী করে চেপে বসে ৷ সময় এক সাংঘাতিক অনুঘটকের কাজ করে ৷ আমরা চেষ্টা করেও যে স্মৃতি ভুলে থাকতে পারিনা সময়ের প্রভাবে সে প্রক্রিয়া তরান্বিত হয়, তাই সময়ের অপেক্ষা করা বড়ো প্রয়োজন ৷
দুটো মানুষ সব অর্থেই ভিন্ন প্রকৃতির ৷ রুচি, পছন্দ, আবেগ, ব্যক্তিত্ব, কারোর সঙ্গে কারোর মিল নেই ৷ অথচ তাদের বন্ধুত্ব হয় ৷ ওনেক অপছন্দকে নাকচ করে দিয়ে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো ডানা মেলে, মেঘলা দুপুরগুলোতে অপেক্ষা করে, এই বুঝি পেছন থেকে এসে জরিয়ে ধরবে ৷ একে অন্যের ইচ্ছেগুলোকে প্রজাপতির মত ডানা মেলতে দেখতে চায় ৷ দুটো অজানা অচেনা মানুষ একে অন্যের ওপর ভরসা করতে শেখে ৷ বিশ্বাস করতে চায় ৷ যুক্তি তর্ক নিয়মকানুন সব কেমন দুর্বল, জোলো, পানসে লাগে ৷ একমাত্র সত্যি সামনের মানুষটা ৷ তার বলা কথাগুলো ৷ তার দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে ৷ তোমরা মন্ত্র তন্ত্রের কথা বল, আচ্ছা বল তো ভালোবাসার চেয়ে আরও বড়, আরও জোড়ালো মন্ত্র কি আছে ? কি অমোঘ আকর্ষণে দুটো অজানা অচেনা মানুষ একে অন্যকে এত প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে !
ভালোবাসা, অঙ্কে বড় কাঁচা ৷ স্বার্থের নিত্তি মেপে সম্পর্ক নিঃশ্বাস নিতে পারে না ৷ ভালোবাসতে গিয়ে বাটিটা উপুড় করে দিতে হয় ৷ আগলে রাখতে হয় সম্পর্ককে, আশ্রয় দিতে হয় ছায়ায় ৷ বারবার পরীক্ষা দিতে হতে পারে সততার ৷ ভুল বুঝে দূরত্ব বাড়ালে, টানতো শিথিল হবেই! তখন ফিরে আসা বড় কঠিন ৷ স্রোতের প্রতিকূলে এগোনো যেমন দুরূহ ! ভালোবাসাকে- পায়ে শিকল পরিয়ে রাখলে, তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে৷ তাকে মুক্ত থাকতে দাও ৷ ভালোবাসা মানে উৎসব, উদযাপন, আলো, মুক্তি, আনন্দ এবং সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তের যাপন ৷ স্বচ্ছ নদী , হলুদ পাখি , এক মুঠো বাতাস , আঁচল ভরা শিউলি , স্ফটিকের গা থেকে বিচ্ছুরিত আলো ৷
কিন্তু ভালোবাসা কখনও কখনও চরম ছদ্মবেশী হয় ৷ স্বার্থের গন্ধ জোড়ালো ভাবে জড়িয়ে থাকে সম্পর্কে , কিন্তু তা বুঝে ওঠার আগেই সামনের মানুষটা বোকার মত জড়িয়ে পরে আষ্টেপৃষ্ঠে তার বোনা জালে ৷ অথবা বুঝেও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না , শুধু মানুষটাকে হারাবার ভয়ে , মস্তিষ্কের কথা উড়িয়ে দিয়ে বারবার নিজেকে বোঝান , না সব ঠিক আছে , আমার ভালোবাসা অস্বচ্ছ নয় ৷ কিন্তু মিথ্যে সাজের জারিজুরি তো ক্ষণস্থায়ী ৷ গিলটি গয়নার পলেস্তারা উঠে গেলে , সেটা যে সোনা নয় তা তো প্রমাণ হয়েই যায় ৷ যখন সূর্যের মত প্রকট হয় এই সত্য , যখন চরিত্রের দুর্গন্ধ চারিপাশের পরিবরশকে অসহ্য করে তোলে , তখন গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার মনে হয় ৷ জীবিত থাকার শেষ ইচ্ছেটুকুও তলানিতে এসে ঠেকে ৷
কিন্তু বলতো সত্যিই কি সেই মানুষটি এতটা পাওয়ার যোগ্য ! তোমার প্রাণ এত তুচ্ছ , একটা প্রতারকের নামে সমর্পণ করবে ? তোমার বাবা মা যারা তোমাকে এতটা বড় করেছে , তাদের কোন দাবি নেই তোমার জীবনের উপর ? তোমার বন্ধু , কাছের মানুষ যারা তোমাকে ভালোবাসে , তোমাকে ঘিরে থাকে , অসুস্থ হলে উৎকন্ঠায় কাটায় ,তাদের কথা ভাব , তাদের জন্য বাঁচ !
চিহ্নিত কর , মুখোশটা ওর মুখ হয়ে ওঠার আগে চিহ্নিত কর ৷ ভালোবাসায় বয়স, বিত্ত, বংশ, পরিবার কখনও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না ৷ বৈধ অবৈধ কিছু নেই ৷ আছে বিশ্বাস, একে অন্যের উপর ভরসা ৷ সেই ভরসা , বিশ্বাস যখন মুখ থুবরে পড়ে তখনই তো মানুষত্ব কাঠগড়ায় দাঁড়ায় ৷
তবু কোথাও বোধহয় একটা নরম কুয়াশা ঐ মানুষটাকে আড়াল করে রাখতে চায় ৷ ঐ যে আবার বোধহয় সেই সময়ের অপেক্ষা ৷ আবার মস্তিষ্ক নয় হৃদয়ের কথা শোনা ৷ হয়ত সব বদলাবে ৷ হয়ত নিজের ভুল বুঝে পরিযায়ী বাসায় ফিরবে ৷ যেখানে সমস্ত আশ্রয়, জীবনের ঘ্রাণ আর অস্তিত্ব নিয়ে অপেক্ষা করছে একজন ৷ হয়ত ……… হয়ত……….. হয়ত……
তবু প্রতিটি সম্পর্ক থেকে যায় উচ্চারিত বা অনুচ্চারিত কাব্য হয়ে ৷ কারণ সত্যিকারের ভালোবাসার যে মৃত্যু নেই ৷

রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।