রবীন্দ্রনাথের মতো প্রেমিক পুরুষ বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই— দেড় শতাব্দী পর এসে নতুন করে এ কথাটি বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তার মতো কামগন্ধহীন সূক্ষ্ম প্রেমের প্রকাশ আর কোনো কবির মধ্যে দেখা যায় না। তার প্রেমানুভূতির প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, এর সঙ্গে কবি গভীরভাবে লিপ্ত থাকেন। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের মানবপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, নারীপ্রেম সমান আবেগ আর আন্তরিকতায় রূপায়িত। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি প্রেমের যে কোনো কবিতাকে বা ঈশ্বরপ্রেমের যে কোনো কবিতাকে শিক্ষিত বাঙালি প্রেমিক তার প্রেমিকার উদ্দেশে নিবেদন করতে পারে। যুগে যুগে করেছেও তাই। রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে এ ঘটনা বোধ করি সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি/ তোমায় দেখতে আমি পাই নি/ বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি।। তখন মনে হয় এ বুঝি প্রেমিকার উদ্দেশে প্রেমিকের কথা। কিন্তু এটা আদৌ নারীপ্রেমের কবিতা নয়। এভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা যুগ যুগ ধরে শিক্ষিত বাঙালি প্রেমিক হৃদয়ের অব্যক্ত কথাকে ব্যক্ত করে চলেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেমের প্রশ্নে ছিলেন আদ্যোপান্ত ‘বিশুদ্ধবাদী’। প্রেমের ক্ষেত্রে শরীরকে তিনি বরাবরই গৌণ মনে করতেন। তিনি বড়ো হয়েছিলেন ভিক্টোরিয়ান রুচির মধ্যে, তার সঙ্গে আবার মিশেছিলো ব্রাহ্মরুচি ও আধুনিকতা। একেবারে প্রথম যৌবনে লেখা ‘শেষ চুম্বন’, ‘চুম্বন’ এবং ‘স্তনে’র মতো কবিতায় নারীদেহের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বলিষ্ঠ এবং স্পষ্টভাবেই প্রকাশ পায়। কিন্তু আরেকটু বেশি বয়সে লেখা ‘বিজয়িনী’র মতো কবিতায় দৈহিক সৌন্দর্য কাটিয়ে তাকেও তিনি নৈর্ব্যক্তিক করে দেখেছেন। সৌন্দর্যের কাছে দেহের পরাজয় ঘটান তিনি৷ বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায় তার ‘সুরদাসের প্রার্থনা’ কবিতায়। ওই কবিতায় কবি তার প্রেয়সীকে দেবী সম্বোধন করে বলেছেন, ‘এ আঁখি আমার শরীরে তো নাই, ফুটেছে মর্মতলে—/ নির্বাণহীন অঙ্গারসম নিশিদিন শুধু জ্বলে।/ সেথা হতে তারে উপাড়িয়া লও জ্বালাময় দুটো চোখ— / তোমার লাগিয়া তিয়াস যাহারা সে আঁখি তোমারি হোক।।’ অন্ধ হয়ে গেলে অর্ন্তচক্ষু দিয়ে কবি প্রেয়সীকে দেখবেন— এটাই কবির আরাধ্য। মধ্যযুগের বাংলা কবিতার শারীরিক প্রেমের পরিবর্তে এই প্রেম নতুন দ্যোতনা তৈরি করে। প্রেমের এই ধারণা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ সানন্দে গ্রহণ করেছিল।
১৪ বছর বয়সে কিশোর রবীন্দ্রনাথ প্রথম নারীর সান্নিধ্যে আসেন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর সাহচর্যে। রবীন্দ্রনাথের স্থপতি বলে অভিহিত করা হয় জ্যোতি দাদার সহধর্মিণী কাদম্বরী দেবীকে। কাদম্বরী এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনে প্রায় সমবয়সী ছিলেন। বয়ঃসন্ধির সংবেদনশীল পর্যায়ে কিশোর মনে ছাপ ফেলতে কাদম্বরীর ভূমিকা ছিল অনন্য। নতুন বৌঠান সম্পর্কে দেবর রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। কবি তাঁর সাহিত্য চর্চার অনুরাগী ছিলেন। কবির অনেক সাহিত্য সৃষ্টি, কবিতা এই নিঃসঙ্গ, রিক্ত নারীটিকে ঘিরেই। কবি তাকে নিয়ে ভারতী পত্রিকায় লিখলেন, ‘সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই অশ্রু জলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে। আর একজন, সে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে। সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল। সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সে-ই তো যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সেই অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটা কতক অর্থহীন হিজি-বিজি ছাপা হইয়া গেল।’ অসংখ্য রবীন্দ্র রচনার মধ্যে অন্তত সাতটি গ্রন্থ একই ব্যক্তি কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এক লেখক তাঁর সাত-সাতটি গ্রন্থ একই ব্যক্তির উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন এ ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বোধ করি বিরল। রবীন্দ্র মানসে কাদম্বরী দেবী সেই বিরলতম ব্যক্তিত্ব।
সালটা ১৮৭৮। রবীন্দ্রনাথ তখন সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছেন। ১৭ বছরের তরুণ কবি৷ কলকাতার ৬নং দ্বারকানাথ লেনের মূল বাসভবনে তুমুল ব্যস্ততা। কিশোর রবিকে বিলেতে পাঠানোর জন্য সব প্রস্তুতিই প্রায় সারা, উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি যাবেন বিদেশে। এমন সময় দাদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এলেন বোম্বাই। উদ্দেশ্য, কিশোর রবির বিলেত যাবার জন্য একটি উপযুক্ত সঙ্গীর অন্বেষণ। মেয়েটির নাম আন্না তড়খড়। বাবা আত্মারাম ছিলেন একজন ডাক্তার। আন্না তড়খড় তখন সদ্য বিলেত থেকে পড়াশোনা করে ফিরেছেন। ঘটনাচক্রে আন্না তড়খড় এবং তাঁর বাবা আত্মারাম ছিলেন প্রার্থনা সমাজের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথের দাদা সত্যেন্দ্রনাথও ছিলেন ‘প্রার্থনা সমাজ’-এর সদস্য। সেই সূত্রেই নিবিড় সম্পর্ক এই পরিবারের সঙ্গে৷ এই আন্না তড়খড়ই রবীন্দ্রনাথের ” নলিনী “৷ পরেই তাঁর বহু সাহিত্য সৃষ্টিতেই এই নামের উল্ল্যেখ পেয়েছি৷ রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রেমিকা “নলিনী”৷ আন্নার জন্য কবি কাব্যের ‘গাথুনি’তে রচনা করেছিলেন- ‘শোন গো নলিনী খোল গো আঁখি’। এরপরই কবি কবি বিলেতের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন শুক্রবার ১৮৭৮ সালে ‘পুনা’ স্টিমারযোগে।
বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে এসে রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের লেনদেন হয় স্কট কন্যা লুসির সঙ্গে। প্রেমের ভাঙা গড়া খেলায় প্রবাসী প্রেমিকাকে রচনা করতে হয় বিচ্ছেদের পঙ্ক্তিমালা-
‘কিন্তু আহা, দু’দিনের তরে হেথা এনু,
একটি কোমল প্রাণ ভেঙ্গে রেখে গেনু।’
ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গুঞ্জন ছিল। আর্জেন্টিনা ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ ৬৩ বছরের প্রবীণ। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর জন্ম ১৮৯০ সালে আর রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। বয়সের দিক দিয়ে ওকম্পো থেকে রবীন্দ্রনাথ ২৯ বছরের বড় ছিলেন। আর্জেন্টিনার প্লাতা নদীর ধারে বিদেশী কন্যা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে কবি বেশ আপন করে নিয়েছিলেন৷ একটি কবিতার তিনি লেখেন:-
‘হে বিদেশী ফুল, যবে তোমাকে শুধাই বলো দেখি
বলো দেখি মোরে ভুলিবে কি, হাসিয়া দুলাও মাথা,
জানি জানি, মোরে ক্ষণে ক্ষণে
পড়িবে যে মনে
দুই দিন পরে
চলে যাবো দেশান্তরে, যেন দূরের টানে স্বপ্নে আমি হব তব চেনা,
মোরে ভুলিবে না।’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হেমন্ত বালা রায় চৌধুরীর সম্পর্কের কথাও তুলে এনেছেন রবীন্দ্র জীবনী গবেষকরা।
স্ত্রী মৃণালিনীর সমবয়সী ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরার (রবীন্দ্রনাথের মেজ দাদা সতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে) জন্য রবীন্দ্রনাথের মন পুড়ত। মনের দিক থেকে এই মেয়েটির সঙ্গে, কবির আত্মিক সম্পর্ক ছিল। ইন্দিরাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি চিঠি পড়েই তা জানতে পারা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থানাধিকারিণী ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদক পাওয়া ইন্দিরা বহুদিন অনুঢ়া ছিলেন। ইন্দিরা যেমন সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন তেমনি ছিলেন সঙ্গীত চর্চায় আগ্রহী। সেই জন্যই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
জীবনের শেষ ভাগে রানু অধিকারীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনের মিলন ঘটে। রানু রবীন্দ্রনাথের গল্পের বড় অনুরাগী ছিলেন৷ অনেক রবীন্দ্র গবেষকই মনে করেন তাদের মধ্যে একটি ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমের আবেশই যোগ হয়েছে তাঁর অনবদ্য সৃষ্টিকর্মে। রবীন্দ্র সাহিত্যে আমরা যে প্রেমের ধারায় ভাসি তার স্রোতে মিশে আছে অনেক বৈচিত্র্যময় প্রেমের অনুভূতি। এই অনন্ত প্রেমিক মানুষটির কাছ থেকেই ভালোবাসতে শেখা৷ ভালোবেসে উজার করে দিতে শেখা৷ তর্ক থাক তর্কের জায়গায় আমরা বরং তাঁর সৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরি৷
( গতকালই ২২শে শ্রাবণ গেছে, তাই এই চির প্রেমিক কবিকে নিয়ে কিছু কথা )