কর্ণফুলির গল্প বলায় রবীন জাকারিয়া

২০৫০ সালের বইমেলা

২০৫০ সালের জানুয়ারী মাস৷ সামনে একুশে বই মেলা৷ সকল প্রকাশক, লেখক ও বইপ্রেমীরা ব্যস্ত৷ নতুন লেখা৷ নতুন বই প্রকাশ করতে হবে৷ হাতে বেশি সময়ও নেই৷ কম্পিউটারে নতুন লেখা টাইপ হচ্ছে৷ কোথাও প্রুফ রিডার ব্যস্ত৷ ছাপাখানা সারাদিন শুধু গ-ড়-ড় শব্দে চলমান৷ প্রকাশক টেনশনে৷ মেশিনটা না বিগড়ে যায়৷ প্রচুর ইনভেস্টমেন্ট৷ এবার কি লাভের মুখ দেখবো? না-কি প্রতিবারের মত সব শেষ হয়ে যাবে!
পুরাতন ও জনপ্রিয় লেখকরা যারা এক সময় দম্ড দেখাতো৷ অসংখ্য প্রকাশকের কাছ থেকে পরবর্তি লেখার সম্মানী আগাম নিয়েও কথা রাখতো না৷ তারা এখন নিজের বইয়ের জন্য নিজেই বিজ্ঞাপনে নেমেছে৷ ফেসবুক, ট্যুইটার, ইন্সট্রাগ্রামসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখার চুম্বক অংশ প্রকাশের মাধ্যমে৷ কিংবা অটোগ্রাফ, যুগল ছবি তোলার অফার দিচ্ছে৷ কেউবা আবার ঘোষণা করছে বই বিক্রির সমস্ত অর্থ ব্যয় করবে মহামারির ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য৷
নতুন লেখকদের মধ্যে কোন টেনশন লক্ষ করা যাচ্ছে না৷ তারা বেশ উপভোগ করছে৷ কেননা তারা লাভ লোকসানের মধ্যে নেই৷ নিজের লেখা বই আকারে প্রকাশের জন্য কষ্টার্জিত অর্থ জলে ডুবানোর প্রতিজ্ঞাই করেছে৷ যদিও বলা হয় প্রকাশকরা নতুন নতুন লেখক তৈরি করেন৷ আসলে ভূয়া কথা৷ ৪ ফর্মার একটি বই প্রকাশ করতে প্রকাশকরা ক্ষেত্রবিশেষে ২৫০০০/- থেকে ৩০০০০/- টাকা নিংয়ে থাকেন৷ তারপর নিজের কাছে কিছু রেখে বাকি সব বই লেখককে দিয়ে দেয়া হয়৷ কোন রয়্যালটি নেই৷ প্রকাশকের কোন বিনিয়োগ নেই৷ আছে শুধু মুনাফা৷ তাই অনেক নতুন লেখক মনে করেন নিজের টাকায় যদি বই প্রকাশ করে বাড়ির স্টোর রুমেই রাখতে হয়৷ তাহলে মুনাফাখোর প্রকাশকের ব্র্যান্ড বা লোগো দেয়ার দরকারটা কী?
সত্যি বলতে কী! এখন বই তেমন একটা কেউ পড়েনা৷ নতুন জেনারেশনের ছেলে-মেয়েরা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়া, কম্পিউটার আর মোবাইল গেমস নিয়ে ব্যস্ত৷ Blue whale, Free fire গেমস খেলতে খেলতে আত্মহত্যা করে৷ একদা গৃহিনীরা অন্তত শরৎবাবু কিংবা হুমায়ুন আহমেদ’র বই পড়তো৷ তারা এখন পার্লার, জি বাংলা কিংবা স্টার জলসা নিয়ে মজে আছে৷ অবশ্য একথাও অনস্বীকার্য যে সন্তানের লেখাপড়ার প্রতি তাদের অবদান সবচেয়ে বেশী৷
যাহোক বইমেলাটা এখন আর নিয়মিত হয় না৷ দিনের পর দিন বাংলা একাডেমীর প্রধানের দায়িত্বটা কেন যেন সাহিত্য-সংস্কৃতি জ্ঞানহীন, অথর্ব ব্যক্তিরাই দখল করে আছে৷ গত বছর ২০৪৯ সালের জুলাই মাসে যিনি এ পদে অলঙ্কৃত করেছেন৷ তিনি একজন Transgender. সুবিধা বঞ্চিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের জন্য সরকার এখন বেশ সজাগ৷ এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে সকল New experiment গুলো সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে৷ ভোটার তালিকা হবে? বন্যা হয়েছে? সমস্যা নেই স্কুল বন্ধ রাখ৷ শিক্ষকদের কাজে লাগাও৷ আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে করোনা’র প্রাদূর্ভাব দেখা দিলে হাট-বাজার, শপিং মল, অফিস-আদালত সবই চলেছে৷ শুধু বন্ধ ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ সব আমলের সব সরকারেরই সম্ভবত চক্ষুশূল ছিল শিক্ষা৷ অবশ্য কারণও ছিল৷ জাতি শিক্ষিত হলে তাদের ভাওতাবাজি ধরতে পারবে! এই ভয় সব সময় কাজ করে৷
এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লাইব্রেরী গুড়িয়ে দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয়৷ ইসলামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কি মসজিদের গুরুত্ব বেশী? কোরআনের প্রথম আয়াত “ইকরা বা পড়”৷ আবার হাদিসে বর্ণনা আছে “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন ফরজ”৷ অথচ অতি রক্ষণশীল গ্রুপের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের সরকার একযোগে শত শত মসজিদ তৈরি করে জনগণের কাছে প্রমাণ করতে চান তারা কত ধর্মীয়মনা সরকার৷ এমনো ঘটেছে যে চারিদিকে কয়েকটা মসজিদ থাকার পরেও লাগোয়া মসজিদ তৈরি হয়েছে৷ আর কিছুদিনের মধ্যে হয়তো আমরা মিশরের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলবো আশা করি৷ মসজিদের শহর কায়রো এর স্থলে হবে মসজিদের দেশ বাংলাদেশ৷ আহ্! কী সুন্দর৷ যেমন বেশ কয়েক বছর আগে আমরা অনেক টাকা খরচ করে একটা রেকর্ড গড়েছি৷ সবচেয়ে বড় মানব পতাকা৷
এরপরেও কিছু সমাজ সংস্কারক, প্রকৃত ধর্মীয়মনা সৃজনশীল ব্যক্তি জনগণকে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার মহান ব্রত নিয়ে কাজ করে যায়৷ উপমাস্বরুপ মৌলভী খেরাজ আলি
১৯৩৩ সালের ২৫ অক্টোবর মুনসীপাড়া কেরামতিয়া স্কুলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী”। ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিতেন বই৷ অথচ স্কুল কর্তৃপক্ষ লাইব্রেরীটাকে গুড়িয়ে দেয়৷ অথচ পরবর্তিতে মসজিদ তৈরি করা হয় সম্মিলিতভাবে৷

এভাবেই চলছে সমাজ৷ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক একেক সময় একেক কথা বলছেন৷ একবার বলছেন এবারে বই মেলা সীমিত আকারে করবেন৷ আবার বলছেন ২০৫০ সালের বই মেলা হবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ৷ লেখক, পাঠক, প্রকাশকরা চিন্তিত তবুও প্রকাশনার কাজ চলছে অবিরাম৷

এরপর হঠাৎই সরকার থেকে ঘোষণা করা হলো নাশকতামূলক কর্মকান্ডের আশংকায় ২০৫০ সালে বই মেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়৷ জাতি হতবাক৷ প্রকাশক, লেখক, পাঠক বিশ্মিত!
কিন্ত শত প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু সৃজনশীল আর শিক্ষানুরাগী মানুষ সমাজের কল্যাণে কাজ করে যায় অবিরত৷ তাই প্রকাশিত বইগুলো দিয়ে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল৷ কিন্ত এ সমাজে এখন লাইব্রেরি স্থাপনের জায়গা নেই৷ অবিচল এই মানুষগুলো তাই শত বছরের পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করলো৷ কাঁধে বই নিয়ে ভ্রাম্যমান পদ্ধতিতে ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিতে থাকলো জ্ঞানের আলো৷ সেই বই৷

হঠাৎ কোন একটা মধুর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল৷ শুনলাম ফজরের নামাজের পবিত্র আজান৷ ভয় পেলাম৷ সবাই বলে ভোরের স্বপ্ন নাকি ফলে যায়৷ অযু করলাম৷ প্রতি ওয়াক্তের ন্যায় ফজরের নামাজ আদায় করলাম৷ আল্লাহ্’র কাছে প্রার্থণা করলাম এমন স্বপ্ন যেন ফলে না যায়৷
কেননা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো মানুষ একদিন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়৷ পরিশেষে জয় হয় জনতার৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।