সম্পাদকীয় নাকি!!!

ভুলিনি ভগিনী ভুলিনি তোমায়

“The boat is sinking but I shall see the sunrise…”এই একটা লাইনেই মানুষটার সমস্ত স্ট্রাগলকে ব্যাখ্যা করা যায়…
এনার সাথে পরিচয় যখন তখন আমার বয়স সাত হবে!!!একটা বড় ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবি,যার গলায় একটা বড় মালা,সামনে একদম নিঁখুত একটা সাদা আল্পনা,এইভাবেই প্রথম দেখা তাঁকে!!
তারপর ধীরে ধীরে জানতে থাকা,আক্ষরিক অর্থেই বড় হয়ে ওঠা ঐ সাদা-কালো ছবিটার আশেপাশে।
কবে যে তিনি আমাদের সবার সিস্টার হয়ে উঠেছিলেন,আমাদের স্কুলের যে কোনো ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পেয়ে যাবেন!!!
আরোও বড় হতে হতে বুঝেছিলাম নিশ্চুপে কাজ করে যাওয়া এই কর্মযোগী মানুষটি ভারতের ইতিহাসে উপেক্ষিত রয়ে গেছেন শুধু তাঁর আবেগের জন্য!!!
হিমালয়ের নির্জন প্রান্তরে যেখানে ভগিনী নিবেদিতার শেষকৃত্য করা হয়েছিল সেই পবিত্র স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ আছে ; সেটিতে লেখা রয়েছে : এখানে ভগিনী নিবেদিতা শান্তিতে নিদ্রিত – যিনি ভারতবর্ষকে তাঁর সর্বস্ব অর্পণ করেছিলেন। মূল ইংরেজি : HERE REPOSE THE ASHES OF SISTER NIVEDITA WHO GAVE HER ALL TO INDIA.
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,
‘ ভগিনী নিবেদিতা যে সকল কাজে নিযুক্ত ছিলেন তাহার কোনটারই আয়তন বড়ো ছিল না, তাহার সকলগুলিরই আরম্ভ ক্ষুদ্র। নিজের মধ্যে যেখানে বিশ্বাস কম, সেখানেই দেখিয়াছি বাহিরের বড়ো আয়তনের সান্ত্বনালাভ করিবার একটি ক্ষুধা থাকে। ভগিনী নিবেদিতার পক্ষে তাহা একেবারেই সম্ভবপর ছিল না। তাহার কারণ এই যে, তিনি অত্যন্ত খাঁটি ছিলেন। যেটুকু সত্য তাহাই তাঁহার পক্ষে একেবারে যথেষ্ট ছিল ; তাঁহাকে আকারে বড়ো করিয়া দেখাইতে হইলে যে-সকল মিথ্যা মিশাল দিতে হয়, তাহা তিনি অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতেন। ‘
‘ এইজন্যই একটি আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল, যাঁহার অসামান্য শিক্ষা ও প্রতিভা, তিনি এক গলির কোণে এমন কর্মক্ষেত্র বাছিয়া লইলেন যাহা পৃথিবীর লোকের চোখে পড়িবার মত একেবারেই নহে। বিশাল বিশ্বপ্রকৃতি যেমন তাহার সমস্ত বিপুল শক্তি লইয়া মাটির নীচেকার অতি ক্ষুদ্র একটি বীজকে পালন করিতে অবজ্ঞা করে না, এও সেইরূপ।’
‘… ভগিনী নিবেদিতা একান্ত ভালোবাসিয়া সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে ভারতবর্ষে দান করিয়াছিলেন, তিনি নিজেকে বিন্দুমাত্র হাতে রাখেন নাই। … জনসাধারণকে হৃদয় দান করা যে কতবড় সত্য জিনিস তাহা তাঁহাকে দেখিয়াই আমরা শিখিয়াছি। … মা যেমন ছেলেকে সুস্পষ্ট করিয়া জানেন, ভগিনী নিবেদিতা জনসাধারণকে তেমনই প্রত্যক্ষ সত্ত্বা রূপে উপলব্ধি করিতেন। তিনি এই বৃহৎ ভাবকে একটি বিশেষ ব্যক্তির মতই ভালোবাসিতেন। তাঁহার হৃদয়ের সমস্ত বেদনার দ্বারা তিনি এই ‘পীপল’কে ( People ), এই জনসাধারণকে আবৃত করিয়া ধরিয়াছিলেন। এ যদি একটি মাত্র শিশু হইত তবে ইহাকে তিনি আপনার কোলের উপর রাখিয়া আপনার জীবন দিয়া মানুষ করিতে পারিতেন।’
‘বস্তুত তিনি ছিলেন লোকমাতা। যে মাতৃভাব পরিবারের বাহিরে একটি সমগ্র দেশের উপর আপনাকে ব্যাপ্ত করিতে পারে তাহার মূর্তি তো ইতিপূর্বে আমরা দেখি নাই। … তিনি যখন বলিতেন Our People তখন তাঁহার মধ্যে যে একান্ত আত্মীয়তার সুরটি লাগিত আমাদের কাহারও কণ্ঠে তেমনটি তো লাগে না।’
….যদিও বহুসময়েই রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেছেন সিস্টারের,তবুও আজ তাঁরই আশ্রয় নিতে হল!!!মাঝে মাঝে সিস্টারকে বারবার বলতে ইচ্ছে করে আর একটু যদি রাজনীতি বুঝতেন আপনি…
অবশ্য তাহলে ভারত ইতিহাসের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হতেন ঠিকই,কিন্তু এই ২০২০ তেও ঐ সাদা-কালো ছবিটার সামনের চৌকাঠ পেরোনো বছর সাতের মেয়েটি তার তিরিশের কোঠায় বসে ঠিক আমার মতই, তার সিস্টারের গল্প এমনভাবে বলত কী না জানি না!!!
গতকাল ১৩ই অক্টোবর ছিল সিস্টারের মৃত্যুদিন, তাই আজ আমার সম্পাদকীয়তে ‘সিস্টার স্মরণ’…

প্রাপ্তি সেনগুপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।