সাপ্তাহিক T3 অরিজিনাল মিনি সিরিজে পিয়া সরকার (পর্ব – ২)

নৈর্ঋতা ও অন্যান্য ব্রাত্যজনেরা

(প্রথম পর্বের পর)
দেবী শীতলা আদতে অবৈদিক দেবী। ভারতে আর্যাগমনের বহু পূর্বেই আদিম শবর জাতির আরাধ্যা দেবী ছিলেন শীতলা। পরবর্তীকালে বৈদিক আচারঘটিত একাধিক প্রতীক, মিথ, পূজাচার জুড়ে গেছে এই প্রাচীনা দেবী-মিথের সঙ্গে। তার বেশ কিছু উদাহরণ আমরা পাই শীতলামঙ্গল কাব্যে।
দেবী শীতলার নামের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিয়েও তাই দুরকম মত শোনা যায়। একটি মতে  বিস্ফোটক/ পক্সজনিত বেদনা থেকে আরামদায়ক নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য শীতলাদেবীর পূজা করা হত, দ্বিতীয়মতে  নির্বাপিত বা শীতল যজ্ঞাগ্নি থেকে তাঁর উৎপত্তি হয়েছে বলে দেবীর নাম শীতলা। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যাই থাকুক না কেন, উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জায়গায় এবং দক্ষিণবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড সীমানায় বসবাসকারী শবরজাতির মধ্যেই সর্বপ্রথম তাঁর পূজার প্রচলন ছিল বলেই জানা যায়। আবার আসামের বিভিন্ন জায়গায় ও ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ অঞ্চলেও দেবীর প্রাচীন মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রাচীন সাহিত্যে সতেরোশো-আঠেরোশো শতাব্দীতে লেখা মঙ্গলকাব্য ছাড়াও দেবী শীতলার উল্লেখ পাওয়া যায় ভাবপ্রকাশ নামের একটি সংস্কৃত গ্রন্থে। সম্ভবতঃ ভাবপ্রকাশই প্রথম গ্রন্থ যেটিতে দেবী শীতলার উল্লেখ রয়েছে। ভাবপ্রকাশ আসলে একটি আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ, যেটিতে চেঁচক রোগ বা বিস্ফোটকের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য দেবী শীতলার পূজা করার কথা বলা হয়েছে। ভাব মিশ্র নামের এক ব্যক্তি ষোলোশ শতাব্দীতে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত আয়ুর্বেদিক পুঁথি সংকলন করে ভাবপ্রকাশ নামের এই গ্রন্থটির রূপ দেন। ভাব মিশ্র স্কন্দপুরাণে উল্লিখিত শীতলাষ্টকম স্তোত্র নির্দেশ করে বসন্তরায়া রূপে দেবীকে পূজা করতে নির্দেশ দেন। আবার বিরুদ্ধ মতে পিচ্ছিলাতন্ত্রে শীতলাদেবীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।
অবশ্য, যে রোগটির নিরাময়ের জন্য দেবী পূজিত সর্বত্র, সেটির উল্লেখ বহুপূর্বেই চরক এবং শুশ্রুতের লিখিত আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রগুলিতে করা হয়েছে। মাসুরিকা/ জল বসন্ত  নামের এই অসুখ এবং তা উপশমের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে চরক সংহিতায়। একটি কথা তাই সহজেই এখানে অনুমেয়, যে ৩০০ থেকে ৮০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মাসুরিকা বা বসন্তরোগ বা স্মল পক্সের উল্লেখ থাকলেও তার থেকে রক্ষা পেতে কোনো দেবীর অর্চনা করার কথা বলা হয়নি। কাজেই এই বিরাট সময়কালে কিভাবে দেবী শীতলার উৎপত্তি হল, কিভাবে তিনি বসন্ত রোগের দেবী বলে পূজিতা হতে শুরু করলেন তা সঠিক ভাবে না জানা গেলেও, এটুকু অনুমান করা যায় অনার্য আদিম শবর জাতির আরাধ্যা দেবী থেকে তিনি ধীরে ধীরে সাধারণ লোকমানসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। অখ্যাত, অনামী দেবী থেকে সমাজের সর্বস্তরে পূজিতা হতে দেবীকে যে ব্রাক্ষণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিষম যুদ্ধ করতে হয়েছিল, তার একাধিক উদাহরণ আমরা শীতলামঙ্গলে পেয়ে থাকি। গ্রামাঞ্চলে বা শহরাঞ্চলে শীতলা-পণ্ডিত নামে একদল মানুষ বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাবে খোল-করতাল সহযোগে শীতলার গান বা শীতলাকাব্যের গান গাইতেন। শীতলাপালা নামে এক বিশেষ যাত্রাপালার স্মৃতিচারণ করেছেন প্রখ্যাত নট্ট চপল ভাদুড়ী। তিনি দেবী শীতলার রূপে একাধিক পালায় অভিনয় করেছেন। অভিনয়শেষে জাতিবর্ণ নির্বিশেষে মহিলারা তাঁকে সিঁদুর পরিয়ে মা শীতলারূপে বরণ করেছে। শীতলাকথার বর্ণনা আছে একাধিক কবি বিরচিত শীতলামঙ্গল কাব্যে।
তেমনই এক জনপ্রিয় শীতলাকথায় বর্ণিত গল্পটি এখানে লিখব।
এক রাজা এবং এক কৃষকের পুত্রের একইসঙ্গে জলবসন্ত রোগ হয়। কৃষকের পরিবার তাদের সন্তানকে ফলমূল, দুধ জাতীয় ঠাণ্ডা খাবার খাওয়ায়, ঘরদোর ঝাঁট দিয়ে, গোবরলেপে, যথাযথভাবে পরিষ্কার রাখে। অপরদিকে রাজা দেবী চন্ডীর সাধনা করেন, প্রত্যহ বলি দেন, এবং বলিপ্রদত্ত ছাগমাংস আপন সন্তানকে খাওয়ান। কিছু দিন পর, রাজপুত্রের শরীরে বসন্তরোগের জন্য মারাত্মক বেদনা হয়, তার সারাশরীর জলভরা ফোঁড়াতে ভরে যায়।
অপরদিকে কৃষকপুত্রের রোগ নিরাময় হয়। রাজা রেগে গিয়ে শীতলার বেদী পদাঘাতে ভেঙে দেন। রাত্রিবেলা তাঁর স্বপ্নে দেবী শীতলা আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে শীতলাপূজা করার নির্দেশ দেন, রাজপুত্রের সুস্থ হওয়ার আশ্বাস দেন। রাজা দৈবস্বপ্ন দেখেন চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তম দিনে। আটদিনের মাথায় অর্থাৎ সংক্রান্তিতে রাজপুত্রের রোগ নিরাময় হলে তিনি রাজ্যের প্রত্যেককে শীতলাপূজার নির্দেশ দেন।
শীতলাকথার এই আখ্যানটি থেকে একথা অনুমান করা যায়, দেবী শীতলা অপেক্ষাকৃত নিম্নকোটির দেবতা ছিলেন, এবং সমাজের উচ্চস্তরে পূজা পেতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। শীতলামঙ্গলের একাধিক কাব্যে প্রথমে অনার্য আদিবাসী দেবী কিভাবে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়া পূজিতা হয়ে উঠলেন তা জানা যায়।
শীতলাকথার গল্পে বলি, এবং রক্তপাত দেবীপূজায় ব্রাত্য হলেও দেবীর আদিম পূজা পদ্ধতিতে, অর্থাৎ শবরদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটির ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। অন্তর্জালে রূপকথা.কম নামক ইউ.জি.সির ওয়েবসাইটিতে শবরজাতির শীতলাপূজা সম্পর্কিত যে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় তা অনেকটা এরকম।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণায় বসবাসকারী শবরজাতিরা পৌষ-সংক্রান্তির দিন শীতলার পূজা করেন। সংক্রান্তির দিন দিহরি( শবরদের পূজারি- পুরোহিত) তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ভোর চারটেয় নিকটবর্তী পুকুরে যান এবং মাটির ঘড়ায় জল ভরে আনেন। তাঁদের সঙ্গে গ্রামের মেয়ে-বৌরা উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, কাঁসরঘন্টা সহযোগে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। পুকুর থেকে ঘড়া করে জল সংগ্রহ করার আগে তাঁরা পুকুরে ফল, ফুল, আতপচাল ও বাতাসা মন্ত্রসহযোগে নিবেদন করেন। দিহরি এরপর কাঁধে করে জলভরা ঘড়া নিয়ে দেবীস্থানে রাখলে যথাযথ বিধিমতে পূজা শুরু হয়। শীতলাপূজায় গ্রামের মেয়ে-বৌদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দেবীপ্রতিমা স্থাপন করার আগে তারা নিজের হাতে গোবর লেপে স্থানকে শুদ্ধ করেন।
শীতলাপূজার অন্যতম উল্লখেযোগ্য বিধি হল এই পূজায় দেবীকে কাঁচা খাবার যেমন ফলমূল, আতপচাল, দুধ ও মিষ্টি  নিবেদন করা হয়। শবরদের মধ্যে শীতলাপূজা উপলক্ষ্যে বলিপ্রথাও রয়েছে। পাঠা এবং মুরগীকে বলি দেওয়ার আগে তাদেরকে দেবীর কাছ নিবেদিত নৈবেদ্য খেতে দেওয়া হয়। লোকবিশ্বাস বলে বলিপ্রদত্ত পশুরা নৈবেদ্য খেলে দেবী সন্তুষ্টা হন। বলির পর ছাগমুণ্ড বা মুরগীর মাথাটিকে সংগ্রহ করে দেবীর পায়ে নিবেদন করা হয়। বাকি মাংস ব্যবহার করে ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। শীতলাপূজা উপলক্ষ্যে শবর পুরুষ ও মহিলারা ধামসা-মাদল সহযোগে নাচগান পরিবেশন করে থাকেন।
অপেক্ষাকৃত শহরাঞ্চলে শীতলার যে দেবীমূর্তি পূজা হয় বা তাঁর পূজার্চনার যে বিধি পালন করা হয় তা শবরদের থেকে অনেকটাই আলাদা। দেবী এখানে লালপাড়সাদা শাড়ি পরিহিতা, গর্দভারুঢ়া, তাঁর কেশদাম হাঁটু স্পর্শ করছে। তাঁর কাখে ঘড়া, এবং হাতে ঝাড়ু। দেবীর এই রূপের সঙ্গে পিচ্ছিলাতন্ত্রে বর্ণিত তাঁর আদিরূপ অনেকাংশেই মেলে না। সেখানে দেবী শীতলা খেড়াঙ্গী, ত্রিনেত্র, কনকমণিভূষিত, দিগম্বরী, রাসভস্থ, সন্মার্জনী ও পূর্ণকুম্ভহস্ত মূৰ্ত্তিতে দেখা দিয়াছেন। আবার স্কন্দপুরাণেও তাঁর দিগম্বরী, গর্দভারূঢ়া রূপটি বর্ণিত আছে। শীতলার কোখে যে ঘড়াটি রয়েছে তা আসলে মনুষ্যশরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন অনেক সাধক। কুম্ভ বা ঘড়া আধ্যাত্মিক জগতের মানুষদের কাছে বায়ুভরা মনুষ্য শরীরের সমতুল। ফাঁকা কলসীতে জল ভরলে যেমন শব্দ কমে যায়, তেমনি মনুষ্যদেহ ভক্তিরস পূর্ণ
হলে তাঁর আত্মা শান্ত হয়।
কিন্তু এ নেহাতই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। লোকদেবী শীতলার পূজায়  ঘড়াভর্তি জল স্বচ্ছল, সুস্থ জীবনকে নির্দেশ করে বলেই প্রবন্ধকারের ধারণা।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।