সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে পথিক সেনগুপ্ত (পর্ব – ১)

অচেনা বসন্ত – ১

এই সাত বছরে কলকাতা টা বেশ পাল্টে গেছে। বেশ নতুন সাজে সেজেছে শহর টা। বেশ একটা আধুনিক আবরণ জড়ানো চলাফেরা মানুষজনের মধ্যে। তাও কয়েক টা জিনিস এখনও অপরিবর্তিত। টালিগঞ্জ ট্রামডিপোতে মহানায়ক হাতে ধুতির কাছা টা ধরে এখনও যেনো আবেগ ধরে রেখেছে। চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বেশ চোখে পড়ার মতো।বাসের খালাশিদের যাত্রী ডাকার গলার তেজ টা মোটেও খাটো হয়নি। সাতবছর এ সব একই রয়ে গেছে। সাতবছর আগে যখন কলকাতা ছেড়ে দিল্লী চলে যাই তখন আমার বয়স সতেরো।উচ্চ মাধ্যমিকের পরের ছুটিটাও এখানে কাটেনি। বাবা এসে রেজাল্ট নিয়ে গেছিল। তারপর দিল্লী তে ইঞ্জিনিয়ারিং আর এখন বোম্বে র একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বেশ মোটা মাইনের চাকরি করি আর তারই একটা কাজে আজ সাত বছর পর আবার কলকাতা ফেরা। দিল্লী আর বোম্বের ব্যাস্ত জীবনের মধ্যে প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম আমার ছোটবেলার শহরটাকে। হয়তো ভুলতে বসেছিলাম বলাটাও ভুল। প্রায় ভুলেই গেছি। এমনকি বেশ কিছু বন্ধুদের মুখও আজ আর মনে পড়েনা। আবার বেশ কিছু মুখ ভুল করেও ভোলা যায়না। অনেক আবেগ অভিমান রাগ কষ্টের সাক্ষী এই রাস্তাগুলো। আমার মত না জানি কত মানুষের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে অতি যত্নে রাংতায় মুড়িয়ে রেখেছে।

অফিসের কাজ সোমবার থেকে। আজ সবে শনি। জুনের বিকেলটা বেশ ফুরফুরে হাওয়ায় একটা আলস্য তৈরি করেছে। তাও অলসতা কাটিয়ে বেরিয়ে পড়েছি রাস্তায়। স্মৃতির পথের পথিক হয়ে। তবে উদ্দেশ্যহীন ভাবে নয়। যাবো গড়িয়াহাট।মায়ের কড়া আদেশ যেনো তার প্রিয় দোকান থেকে একটা শাড়ি নিয়ে যাই। প্রথমে ভেবেছিলাম একটা ট্যাক্সি করে নেবো। কিন্তু টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো র সামনে এসেই হঠাৎ করে ইচ্ছে টা কেমন পাল্টে গেলো। ট্রামে গেলে কেমন হয়। হাতে ত অফুরন্ত সময়। তাড়া দেরও তাড়া নেই।তাহলে ট্রাম কেনো নয়।

টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়াহাট যাওয়ার ট্রমটায় ফার্স্ট ক্লাসে আমি ছাড়াও আরও দুজন যাত্রী। পিছনদিকে একটা সিটে বসে ঝিমোচ্ছে কন্ডাক্টর বাবু। তারও মনে হয় বয়স হোয়েছে এই ট্রামের মতই। কিন্তু বয়স হলেই কি আভিজাত্যে শিথিলতা দেখা দেয়!উত্তরটা আমার জানা নেই। কিন্তু একটা রাজকীয় অনুভূতি হচ্ছে এই ট্রামে চড়ে। হাজার হোক এই বুড়িয়ে যাওয়া ট্রাম ই তো কলকাতার অহংকার। জানলা তে একবার বাইরেটা দেখলাম।সবে বাঙ্গুর পেরোলো। আশপাশ দিয়ে গতিশীল গাড়ি বাইক বাস যেনো অবহেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে ট্রমটাকে আর কালের বুড়ির মতো থুড়থুড়ে ট্রাম এগিয়ে চলেছে তার রুগ্ন লাইন ধরে। ঘন্টা বাজিয়ে প্রিন্স অনোয়ার শা এ এসে দাড়ালো ট্রমটা। পশ্চিমদিকে বসায় আকাশ টাকে বেশ ভালই দেখা যাচ্ছিল। আর সেখানেই ডুবন্ত সূর্য লাল আভায় রাঙিয়ে দিচ্ছিল গোটা পশ্চিমটাকে। নতুন বউ এর লজ্জা ভরা মুখের মত একটা লাবণ্য নামিয়ে আনছিল পরিবেশটা তে। হঠাৎ ই ঢং ঢং আওয়াজ এ ওরা পেছনে সরে যেতে লাগলো আর আমি এগোলাম আমার গন্তব্যের দিকে। এরই মধ্যে আরো কয়েকজন উঠে পড়েছিল ফাঁকা ট্রমটায়। ফাঁকা সিট গুলোয় তাদের বসার তাগিদেও যেনো অলসতার ছাপ স্পষ্ট। বলা যেতে পারে অলস যানের অলস যাত্রী। আমিও তাদের মধ্যে একজন। জুনের এই পরন্ত বিকেলটা তে আর্দ্রতা বেশি থাকায় এরই মধ্যে আমার মুখে গুটিকয়েক ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছিল। আমিও চিরাচরিত বাঙালিয়ানায় জামার হাতা দিয়ে ঘাম মুছতেই চোখে পড়লো উল্টো দিকের একটা জানলার ধারের সিটের দিকে। নীল শাড়ি পরা গ্রীষ্মের বিকেলে ঘামতে থাকা এক যুবতী। চোখের কাজল টা ঘেঁটে গেছে চোখের নিচে। শান্ত চাহনি জানলার বাইরে। যেনো ব্যাস্ত শহরে শান্তি খুঁজছে ক্লান্ত এক ঘর ফিরতি পাখি। তার মুখের অভিব্যক্তিতে যেনো এক অদ্ভুত মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। যেনো কোনো এক জলোচ্ছাসের পর শান্ত সমুদ্র। আর আমি যেনো এক একলা নাবিক ভেসে বেড়াচ্ছি তার বুকে। ভাসছি না তলিয়ে যাচ্ছি! জানা নেই। শুধু অনুভব করছি শান্ত সমুদ্রে শীতল স্পর্শ, আমি একলা এক নাবিক। কিন্তু পর মুহূর্তেই একটা প্রশ্ন এসে দাড়ালো আমার সামনে। এই সমুদ্র কে এত অচেনা লাগছে কেন?! এতো এমন নয়। এতো ছিলো চির চঞ্চল। অবকাশে উষ্ণতা আছড়ে পড়ত এর পাড়ে। লাবণ্যের ঝড়ে ঝড়িয়ে দিত সব শুকনো পাতা। কিন্তু এ যে অচেনা। পরন্ত গোধূলিতে আমার সামনে আমার বহুদিনের চেনা বান্ধবী পূর্বাশা। অচেনা মানুষের সাজে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।