।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় পার্থ রায়

গোধূলির রঙ ফিকে হয় না

অন্য দিনের মতো আজও সূর্যটা বিদায় নেবার আগে রোজকার অভ্যেসে সুজাতার ৮ ফিট বাই ৬ ফিটের ব্যাল্কনিতে উঁকি দিল। প্রথমবার সুজাতা যখন ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য স্বামী অনিন্দ্যর সাথে দীর্ঘ দিন মুম্বাইতে ছিল, তখনও প্রতিদিন গোধূলির সূর্য তার কর্তব্য করে গেছে আর হতাশ হয়ে ফিরে গেছে। বিচ্ছেদের কষ্ট কি সুজাতাও পায় নি? এই অসুখটা হবার আগে একমাত্র মেয়ে ঝুমকে ছেড়ে একরাত্রিও কোন দিন থাকার কথা ভাবেনি সুজাতা।
আহ! সুজাতা শ্বাস টানল স্বস্তিতে। অবশেষে নিজের বাড়ী। একটা ব্রেস্ট অ্যামপুটেট করার বেশ কয় মাস পরে চেক আপ করার ডেট দিয়েছিল ওখানকার হাসপাতাল। কোন অসুবিধা না হলে আপাতত আর যেতে হবে না। আজই ফিরল ওরা। তার নিজের হাতে গড়া মিষ্টি বাড়ী। তার ভালবাসার বাড়ী। তার সুখ আনন্দ জমা আছে এই ঘরের প্রতিটি আনাচে কানাচে, আলো আঁধারিতে।
জোর করে স্বামী অনিন্দ্যকে পাঠিয়েছে দমদমে বাপের বাড়ীতে। মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য। দুর্বল সুজাতাকে একা ছেড়ে যেতে চাইছিল না অনিন্দ্য। বলেছিল, “আজকের দিনটা থাক না। সবে তো আজ ফিরলে। রেস্ট নাও। জার্নির তো একটা ধকল আছে। কাল সকালে গিয়ে নিয়ে আসব”।
“প্লীজ না। ঝুম এলে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। আমি ঠিক আছি। আই উইল টেক কেয়ার অব মাইসেলফ প্লিইইইইজ”, ছলছলে চোখে বলেছিল সুজাতা। অনিন্দ্য আর না করতে পারেনি।
সত্যি কি ঠিক আছে ও? ওর প্রতি অনিন্দ্যর ভালোবাসায় কোন খাদ নেই। আসলে নিজের মধ্যেই সারাক্ষণ একটা সংশয়। মুম্বাইতে হোটেলে থাকাকালীন অনিন্দ্য ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলেছে, “আমার ভালোবাসা কি শুধু তোমার শরীরের প্রতি? তুমি তো আমার বৌ। আমার ঝুমের মা। আচ্ছা বলো তো মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে তখন তো শরীরের সৌন্দর্য থাকে না, তখন? তখন কি একজন আর একজনকে ছেড়ে দেয়?”। এমন ধারা নানা কথায় অনিন্দ্য ওকে পরম মমতায় সান্ত্বনা দিয়েছে। সাহস জোগানর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তবুও মন মানে না। রোগমুক্তির আনন্দের গায়েও আচম্বিতে পড়ে মন খারাপির প্রলম্বিত ছায়া।
পায়ে পায়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো সুজাতা। মাথায় সেই একঢাল চুল আর নেই। কেমোথেরাপির ফল। ডাক্তার অবশ্য বলেছেন চুল আবার আগের মতো গজিয়ে যাবে। আগেও অনেকবার দেখেছে। তবুও ফাঁকা ফ্ল্যাটে আবার নাইটির হুক খুলল। খুলতেই চোখে মুখে আষাঢ়ের কালো মেঘ ঘনীভূত হল। বাঁদিকের সেই সুডৌল সৌন্দর্য অদৃশ্য। যদিও দামী ওষুধ আর মলমের দৌলতে আগের মতো ক্ষতটা আর নেই বললেই চলে। চ্যাপ্টা চ্যাটালো অংশটা যেন একটা শ্রীহীন বাগান। বুকের আর একদিকে অনমনীয় অপরূপ স্তন তার সাথীকে হারিয়ে যেন বিষণ্ণ, ম্লান। কী বিসদৃশ! তাড়াতাড়ি ক্ষিপ্র হাতে হুক আটকে নিল।
“উমমমম, কোনটা আগে করি? চুলের নদীতে অবগাহন করব নাকি এই সুডৌল ধবলে ডুব দেব”- আদর করতে করতে অনিন্দ্য বলত। আবেশে লাল হয়ে যেতে যেতে সুজাতা বলত, “তোমার যা ইচ্ছে। সবই তো তোমার”। মনে পড়ছে, সব মনে পড়ছে সুজাতার।
এমনই ঘন আবিল মুহূর্তে অনিন্দ্যের স্পর্শে ধরা পড়েছিল বাদিকের বুকে একটা স্ফীত জমাট অংশ। তারপরে যা হয়। নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে অঙ্কোলোজিস্ট যমদূতের মতো নিদান শুনিয়েছিল। অনিন্দ্য ওকে মুম্বাইয়ের সেরা ক্যানসার হাসপাতালে নিয়ে গেল। সুজাতার কাছে সেসব দিন যেন এক বিভীষিকা। ওর জীবনে হঠাৎ নেমে আসা এক কালো অধ্যায়। রাত্রে ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুতে হত। তাতেও ঘুম আসত না। অনিন্দ্য কোন ত্রুটি রাখেনি। কাউন্সেলিং করিয়েছিল। ওই সৌন্দর্য উৎপাটিত করার আগে।
(১)
শুধু কী অনিন্দ্য? ঝুম? ক্লাস ফোরে উঠে গেল মেয়ে অথচ এখনও মায়ের মিম মিম না ধরলে ওর ঘুম আসে না। মায়ের স্তনকে ও মিম মিম বলে।
৩৪ বসন্তের দোর গোড়ায় এসে ওর নারীত্বের অহংকারে আঘাত লাগল। একদিন আসবে ঝুম ওর মায়ের ‘মিম মিম’ না ধরেও ঘুমিয়ে পড়বে। কারণ কালের নিয়মে ও বড় হবে। কিন্তু ওর ‘অনি’? ওকে কেন বঞ্চিত করলে ভগবান? আমাকে ভালবাসতে গিয়ে ও কি আর আগের মতো আবেশে, আবেগে পাগল হবে? ভাবনাগুলো মাথায় আসতেই চোখ ফেটে জল আসে। কিছুক্ষণ একা একা কাঁদার পরে নিজেকে সামলে নিল। আর কান্না নয়। আজ শুধু আনন্দ। জীবনের পথে ফিরে আসার আনন্দ।
ডুবুডুবু সূর্যটা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে। তার শিফট ডিউটি যে শেষ হতে যায়।
হঠাৎ সুজাতার চমক ভাঙ্গল। আরে ওর “বাচ্চা”দের কী খবর? ওর শখের ফুলগাছগুলো ওর আদরের ‘বাচ্চারা’। আহারে! জল না পেয়ে বোধহয় মরেই গেছে সব। ত্রস্ত পায়ে দরজা খুলে ব্যাল্কনিতে আসতেই সুজাতার মুখ খুশীতে ভরে গেলো। সবাই আছে। ইস! কী চেহারা হয়েছে সব কটার। বেটা ছেলেরা অনেক দিন চুল দাঁড়ি না কামালে যেমন হয় ঠিক তেমনি। হাত বুলিয়ে একের পর এক টবে রাখা বাহারি ফুলগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। মগে করে জল এনে ওদের স্নান করাল। সমস্ত স্নেহ মায়া মমতা ঢেলে বলতে চাইল, “আমি এসে গেছি রে। আর তোদের কষ্ট হবেনা”। ওদেরও যেন আজ খুশীর বাঁধ ভেঙ্গেছে।
সুজাতা খেয়াল করল না পশ্চিম আকাশে গোধূলির সূর্যটা ডুবে যাবার আগে একরাশ খুশীর লাল আবীর ছড়িয়ে দিয়ে বলে গেল, “আজ আমি আসি। আবার কাল আসব। রাত আসে দিনের আসার পথ করে দিতে। দুঃখ আসে সুখের গুরুত্ব অনুভব করাতে। সুজাতা, তুই মন খারাপ করিস না। জীবন অনেক বড়। ঈশ্বর তোকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন।”।
কলিং বেলের আওয়াজ শুনতে পেল কি? হ্যা, আবার। কেউ অস্থির হাতে কলিং বেল বাজাচ্ছে। নিশ্চয় রুমঝুম। তার আদরের ‘ঝুম’, ছোট্ট সোনা! তার প্রাণ ভোমরা! সুজাতা পড়ি কি মরি করে দরজা খুলে দিতে ছুটে গেল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।