“সুরের মায়াবিনী ও একটি প্রেম কাহিনী” গল্পে পল্লবী পাল

সে অনেক অনেকদিন আগের কথা। ইতালির পশ্চিমী উপকূলের নীল সমুদ্রের ঢেউয়ের লীলায়িত ছন্দে দুলে চলেছে নৌকা। নাবিক ও তাঁর সঙ্গীরা সদ্য আহার সমাপ্ত করে সুরাপাত্রে মগ্ন। কেউ তৃপ্তির আমেজে নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে , কেউ আবার সঙ্গীদের সঙ্গে মত্ত খোশ গল্পে। হঠাৎ এক সময় বাতাসে ভেসে আসে নারী কণ্ঠের মৃদু সুরের ধ্বনি। সকলে বার্তালাপ বন্ধ করে কর্ণেন্দ্রিয়কে সজাগ করে তোলে। কী অপূর্ব সেই সুরেলা কণ্ঠ ! কী মধুর সেই সুর ! কোন সে রমণীরা এমন সুরের মাধুরী মিশিয়ে গেয়ে চলেছে এমন নেশা ধরানো সঙ্গীত। সকলে দ্রুত বাইরে চলে আসে প্রতক্ষ্য করার জন্য। ওই দূরে দেখা যায় এক ছোট্ট সবুজ দ্বীপ, মায়াবী কুহেলিকা সে দ্বীপকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। নাবিক বললেন
—এরূপ সুরেলা মধুর কন্ঠ যাঁদের সে রমণীরা না জানি কত অপরূপা!
ভীষণ কৌতূহল জাগছে মনে।
সঙ্গীরা সহমত পোষণ করলেন, নাবিক পরিবর্তন করলেন নৌকার গতিপথ। ধবল পালে মৃদুমন্দ বাতাসের প্রশ্রয় পেয়ে নৌকা এগিয়ে চললো অচেনা দ্বীপের উদ্দেশ্য, কোনো সুরেলা কন্ঠী রমনীদের সন্ধানে। কিছুটা অগ্রসর হতেই আরো স্পষ্ট হল সে সুর, তিনজন রমণীর অস্তিত্ব অনুমান করলেন নাবিকরা। ততক্ষনে নৌকার চারিদিকে ঘিরে ফেলেছে মায়াময় কুয়াশা। এক অদৃশ্য টানে যেন আপনা থেকেই এগিয়ে চলেছে নৌকাটি। মধুর সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে নাবিকরা এবার যেন শুনতে পেলেন ডানা ঝাপটানোর শব্দ। কুয়াশার আড়ালে কোনো বৃহৎ পক্ষি যেন বিচরণ করছে। আচমকাই সমুদ্রের তরঙ্গের পরিবর্তন হল, এ হেন শান্ত সমুদ্র মুহূর্তে এতো উত্তাল হবার কী কারণ? নাবিকরা প্রমাদ গুনলেন, তারা নিশ্চয়ই কোনো সুরের মায়াবিনীর ফাঁদে পা দিয়েছেন। কিন্তু হায়, ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রবল জলোচ্ছাসে নৌকা নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে এগিয়ে চলেছে। কুয়াশার মধ্যে থেকে নাবিকরা এবার দেখতে পেলেন এই সুরের উৎস, এ সুর আসছে এক অদ্ভুত পক্ষীর থেকে। তাকে সম্পূর্ণ পক্ষী বলাও ভুল – এই অদ্ভুদ জীবের দেহের কিয়দংশ পক্ষীর ন্যায় হলেও এদের মুখমন্ডল ও দেহ সুন্দরী রমণীর। তারাই বুনে চলেছে মায়াবী সুরের জাল। সুরের মায়ায় বিমোহিত হয়ে নাবিকরা এক এক করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সমুদ্রের জলে। কিছুক্ষনের মধ্যেই নৌকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রচন্ড গতিতে গিয়ে ধাক্কা খেল দ্বীপের পর্বত গাত্রে। ছারখার হয়ে গেল মাস্তুল, পাটাতন সব। নৌকার সঙ্গে ধীরে ধীরে নাবিক ও তার সঙ্গীরা তলিয়ে গেলেন সমুদ্রের অতল তলে। সাইরেন অর্ধমানবীদের রহস্যময় অট্টহাসিতে মুখরিত হয়ে গেল নির্জন দ্বীপ।
সাইরেন দ্বীপে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় মাঝে মধ্যেই। এই দ্বীপ পার হতে হবে ভেবে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন গ্রীক নাবিক জেসন। জেসন জানেন সাইরেনদের কথা। নদীর দেবতা আকলুয়েশ এর তিন কন্যা – পার্থেনোপি, পেইসিনোই আর লিউকোসিয়া বা লিজিয়া, এরাই সাইরেন অর্ধমানবী। এদের নেশাই হল আপন সুরের জাদুতে সাইরেন দ্বীপের নিকটে আসা সমুদ্রের নাবিকদের সম্মোহনের মাধ্যমে দিকভ্রান্ত করে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
জেসন বুঝলেন নিরাপদে সাইরেন দ্বীপ পার হবার জন্য তার সাহায্যের প্রয়োজন। তখন তার স্মরণে এলো সর্বশ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টা অর্ফিয়াসের কথা। সাইরেনদের সুরেলা মোহজাল যদি কেউ কাটাতে সক্ষম হন সে হলেন সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর পুত্র অর্ফিয়াস।
একদা পিম্পিলিয়াবাসী এক সুন্দরী মানবী ক্যালিওপের প্রেমে পড়েন সূর্যদেব অ্যাপোলো। দেবতা অ্যাপোলো ও ক্যালিওপের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে জন্ম নিলেন অর্ফিয়াস। অর্ফিয়াসকে দেখলেই বাৎসল্যরসে পরিপূর্ণ হতেন সূর্যদেব অ্যাপোলো। দেবতা অ্যাপোলোর পিতৃস্নেহে সিক্ত হয়েছিলেন অর্ফিয়াস, পিতা নিজের হাতে শিখিয়েছিলেন সুরবাহারে অপূর্ব সুরের সৃষ্টি করা। যৌবনে পা দিতেই এক সুরের জাদুকর হয়ে উঠলেন অর্ফিয়াস। মানবশ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টা নামে খ্যাত হলেন তিনলোকে।
দেবতা হারমিস তৈরি করেছিলেন এক আশ্চর্য বাদ্যযন্ত্র লাইর বা সুরবাহার, অ্যাপোলো তা উপহার দিলেন অর্ফিয়াসকে। সুরবাহার পূর্ণতা পেল অর্ফিয়াসের হাতে। সুরবাহারে এতো অপূর্ব সুর তুলতেন অর্ফিয়াস যে তা শুনে দেবতারা যুদ্ধ থামিয়ে দিতেন। হিংস্র জীবজন্তুরা থমকে যেত মোহিত হয়ে, ঝরে যাওয়া ফুল পুনরায় সতেজ হয়ে যেত। সে সুরের জাদুতে নদী বদলে দিত তার গতিপথ, প্রস্তর খন্ডরা শ্রোতার ন্যায় জমা হতো তার চারিপাশে। বৃক্ষরাজি তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করে এগিয়ে যেত সে সুরের উৎসে।
গ্রীক নাবিক জেসন অর্ফিয়াসের দ্বারস্থ হলেন । অর্ফিয়াস রাজি হলেন তাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য। জেসন ও তার সঙ্গীরা নৌকায় স্বাগত জানালেন অর্ফিয়াসকে। সবুজাভ নীল সমুদ্রে পাল তুলে পাড়ি দিল জেসনের নৌকা। জেসন সাবধানী হয়ে প্রতীক্ষা করছেন সাইরেন দ্বীপের। দ্বীপের কাছাকাছি আসতেই জেসন অর্ফিয়াসকে অনুরোধ করলেন। অর্ফিয়াস তাঁর লাইরে তুললেন এক অপূর্ব সুরের মূর্ছনা। সাইরেনদের সম্মোহিনী সুরকেও অতিক্রম করে গেল অর্ফিয়াসের সুরবাহারের সুর। নাবিকরা মোহিত হয়ে রইলেন সেই সুরে, তাদের কানে প্রবেশ করলনা সাইরেনদের সুরের হাতছানি। সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপদে দ্বীপ পার হয়ে গেলেন জেসন। কৃতজ্ঞতায় মাথা নোয়ালেন অর্ফিয়াসের কাছে। অর্ফিয়াস তার প্রিয় সুরবাহারকে সঙ্গী করে আবার ফিরে এলেন গ্রিসে।
গ্রিসের পথে একদিন ভ্রমণে বের হলেন অর্ফিয়াস, সঙ্গী তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র । আপনমনে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছালেন বনানী ঘেরা এক শান্ত জনপদে। অর্ফিয়াসের ভীষণ ইচ্ছে হল তার লাইরে সুর তুলতে, একটা গাছে নীচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বাজাতে শুরু করলেন। চমৎকার সে সুর শুনে অর্ফিয়াসের পাশে এসে ভিড় করলেন নর নারী, কিশোর কিশোরী ও শিশুরা। সবুজ পল্লবগুলি সুরের ছন্দে দুলে দুলে নৃত্য করতে থাকলো, নুয়ে যাওয়া ফুলগুলিও মাথা তুলে হাসতে শুরু করল। সুর সমাপ্ত করে চোখ মেললেন অর্ফিয়াস। চোখ মেলতেই নজরে পড়ল এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। মুগ্ধ চোখে স্মিত হাসি নিয়ে সে তাকিয়ে আছে অর্ফিয়াসের দিকে। প্রথম দেখাতেই তার রূপে সুর সঞ্চারিত হল অর্ফিয়াসের হৃদয়ে। নাম জিজ্ঞেস করাতে সে মেয়েটি উত্তর দিল ইউরিডিস।
সুন্দরী ইউরিডিসের স্মিত হাসিতেই বাঁধা পড়ে গেলেন অর্ফিয়াস, সর্বদা ইউরিডিসের চিন্তাতেই মগ্ন। অর্ফিয়াস একদিন তার ভালোবাসার কথা জানালেন ইউরিডিসকে। ইউরিডিসও অর্ফিয়াসের সুরের মায়ায় মুগ্ধ হয়েছিল, সে সানন্দে গ্রহণ করলো তার প্রস্তাব। এই ভালোবাসা পরিণতি পেল বিবাহে। কিন্তু হায়, বিধি যে কার কপালে কী লিখে রাখে তা অজানাই থেকে যায়। ইউরিডিস ও অর্ফিয়াসের পবিত্র ভালোবাসায় নজর লাগলো অ্যারিস্টাসের। ইউরিডিস তার বিবাহের দিনই নিজমনে ভ্রমণ করছিলেন বাগানে, অ্যারিস্টাসের লোলুপ দৃষ্টি পড়লো সুন্দরী ইউরিডিস এর উপর। অ্যারিস্টাস তার কামনা চরিতার্থ করার জন্য ধাওয়া করলেন ইউরিডিসকে। সম্ভ্রম বাঁচাতে দিকভ্রান্তের মতো দৌড়াতে শুরু করলেন ইউরিডিস, দৌড়াতে গিয়েই হঠাৎ এক বিষাক্ত সর্পের উপরে পা দিয়ে ফেললেন। বিষাক্ত সর্পটি মারণ ছোবল মারল তাকে। তীব্র বিষের যাতনায় নীল হয়ে ইউরিডিস ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।
ইউরিডিসের মৃত্যু অর্ফিয়াসকে মর্মাহত করে তুলল। শোকে প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়লেন। অর্ফিয়াসের সুরবাহারের আনন্দের সুর হারিয়ে নেমে এল বিষাদের ছায়ায়। করুন বিষণ্ণ সুরে দেবতারাও তাদের অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। অর্ফিয়াস পাতালপুরীর সর্বময় দেবতা হেডিসের সঙ্গে দেখা করার সংকল্প নিলেন, দেবতাকে তুষ্ট করে ফিরিয়ে আনবেন ইউরিডিসকে এই আশায় রওনা দিলেন মৃত্যুপুরীতে। সমস্ত বিপদ উপেক্ষা করে দুঃসাহসী অর্ফিয়াস পৌঁছালেন পাতালপুরীর প্রবেশ দ্বারে। সেখানে জীবন্ত মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অর্ফিয়াস এক করুন মায়াময় সুর তুললেন,সমস্ত পাতালপুরী নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল। হেডিসের অন্তরকে নাড়িয়ে দিল সে সুর, মৃত্যুপুরীর দ্বারের অতন্ত্র প্রহরী সারবেরাস নামের সারমেয়টি শুয়ে পড়লো দ্বারে, ফিউরি দেবীদের ভয়াল চোখ প্রথমবার সিক্ত হল অশ্রুতে। থেমে গেল ইকসায়নের অগ্নিচক্র, সদাতৃষিত ট্যান্টালাস বিস্মৃত হলেন তার তৃষ্ণা।
হেডিস তুষ্ট হয়ে অর্ফিয়াসকে প্রবেশ করতে দিলেন পাতালপুরীতে। অর্ফিয়ার হেডিসের কাছে তার প্রেমিকা ও স্ত্রী ইউরিডিসকে ফিরিয়ে দেবার জন্য প্রার্থনা করলেন। হেডিস রাজি হলেন কিন্তু শর্ত দিলেন যে মৃত্যুপুরী থেকে বেরিয়ে যাবার আগে অবধি ইউরিডিসকে অর্ফিয়াস দেখবে না, যদি সে দেখে ইউরিডিস আবার ফিরে যাবে মৃত্যুপুরীতে চিরদিনের জন্য। অর্ফিয়াস এ প্রস্তাবে রাজি হন, সানন্দে ফিরতে থাকলেন পাতালপুরীর পথ ধরে। কিন্তু অন্তরে অন্তরে ইউরিডিসকে একমুহূর্ত দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন, বার বার ইচ্ছে করছিল পিছন ফিরে দেখতে। অর্ফিয়াস তার কৌতূহলকে দমন করতে পারলেন না, পাতালপুরীর পথ প্রায় শেষ হবার মুখেই সব শর্ত ভুলে অর্ফিয়াস পিছনে তাকালেন। মুহূর্তের মধ্যেই এক অদৃশ্য শক্তি পিছনে টানতে থাকলো ইউরিডিসকে, তাকে আঁকড়ে ধরার জন্য অসহায়ের মতো দুহাত বাড়ালেন অর্ফিয়াস। মৃদু স্বরে ‘বিদায়’ জানিয়ে চোখের নিমেষেই ইউরিডিস হারিয়ে গেল মৃত্যুপুরীর অন্ধকারে।
অর্ফিয়াস আর প্রবেশ করতে পারলেন না পাতাললোকে, ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। স্ত্রীকে দ্বিতীয়বার হারানোর শোকে বিহ্বল হয়ে অর্ফিয়াস মনের দুঃখে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন নির্জন প্রকৃতির কোলে, সুরবাহারই হল তার একমাত্র সঙ্গী। জীবনে আর কোনো নারীকে তিমি গ্রহণ করেননি। একদিন দেবতাদের পরম শত্রু থ্রেসিয়ান মেইনাডদের হাতে মারা পড়লেন সূর্যদেব অ্যাপোলোর পুত্র অর্ফিয়াস। শিরোশ্ছেদ করে হত্যা করা হয় তাঁকে, তার লাইর এবং মাথাটি ফেলে দেয়া হয় হেব্রুস নদীতে। পরবর্তীতে মুসেরা তার লাইরকে নিয়ে এলেন স্বর্গলোকে, দেবতারা তাকে স্থান দিলেন নক্ষত্রদের দেশে। এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনের পর অর্ফিয়াস মৃত্যুপুরীতে পুনরায় মিলিত হলেন তার প্রেমিকা ইউরিডিসের সঙ্গে। কথিত আছে মাউন্ট অলিম্পাসের উপত্যকায় অবশিষ্ট দেশখন্ড সমাধিস্থ করা হয়, সেখানে নাকি আজও সুরেলা কণ্ঠে পাপিয়া পাখিরা গান গেয়ে বেড়ায়, শীতল ছায়া দেয় তরুবর ।
গ্রীক পুরানের পাতায় দুঃসাহসী গ্রীকযোদ্ধাদের বীরগাথার মাঝে এক ব্যতিক্রম স্বরূপ সুরের জাদুকর অর্ফিয়াস ও তার স্ত্রী ইউরিডিসের এই মর্মস্পর্শী প্রেমকাহিনী অমর হয়ে আছে ।