আদি থেকে অন্ত,যুগ যুগান্তর ধরে ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো উপচে পড়ে।বর্ষা এলে অবশ্য বৃষ্টির জলও নির্লজ্জ ভাবে চাল ভেদ করে ঘরে এসে,ঘরের বিছানাপত্র থেকে শুরু করে যাবতীয় আসবাবপত্র সমস্ত কিছুকে ভিজিয়ে একশা করে দেয়।ঘরের চালে লাউ,কুমড়ো থেকে শুরু করে পুঁইশাক-এসব খাদ্যসামগ্ৰীর,গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের দেখা মেলে বাংলার আনাচে কানাচে এই ধরনের পল্লী পরিবেশেই।শাক-পাতা খেয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকে।প্রকৃতির সাথে নিবিড় সাহচর্য এই মানুষগুলোর।নিজেদের খাওয়া হোক আর না হোক বাড়িতে পোষ্য কিংবা আপন খেয়ালে ঘুরে বেড়ানো পাখিদের জন্য এরা ভাত না হয় শষ্য দানা ছিটিয়ে দেয়।পাখির দল শষ্যদানাগুলো মনের সুখে আহার করে আবার উড়ে যায় যে যার মত।ওরাও বোঝে এই মানুষগুলো তাদের কোনো ক্ষতি করবে না।বরং খাদ্যের বন্দোবস্ত করবে।শহরের ইমারত আর উচুঁ উচুঁ প্রাসাদ এই পল্লীর মানুষগুলোর কাছে এক আশ্চর্য জগৎ বলে মনে হয়।এহেন দরিদ্র গ্ৰাম বাংলার অধিকাংশ স্থানে এখনো না আছে বাক্ স্বাধীনতা,না আছে নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার অগ্ৰাধিকার।জগৎ আধুনিক হয়েছে,আধুনিক হয়েছে সভ্যতা,গ্ৰাম্য পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়নি অধিকারবোধ।এখন দুই হাজার কুড়ি সাল।বিংশ শতক সেই কবেই পেরিয়ে এসেছি আমরা,পিছনে ফেলে এসেছি জরাজীর্ণ সভ্যতার কালিমা,তবুও কোথাও যেন অসভ্যতার ছাপ স্পষ্ট।এখনো গোটা ভারতবর্ষের পল্লী প্রকৃতির বুকে এক শ্রেণির মানুষ খাদ্যাভাবে প্রতিদিন তিলে তিলে হারিয়ে যায়।কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে রোগে ভুগতে ভুগতে ইহলোক ত্যাগ করে।এজন্য দোষটা অবশ্য প্রশাসনের নয়,উচ্চপদস্থ আধিকারিকদেরও নয়,তারা ভারতবর্ষকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দিন রাত পরিশ্রম করছে,বরাদ্দ করছে কোটি কোটি টাকা।সে টাকা যখন জায়গায় পৌঁছাচ্ছে,বিশেষত গ্ৰাম পঞ্চায়েত এলাকায়,সেখানকার চুনো পুঁটিগুলো হস্তগত করছে সেই সম্পদ।এলাকায় উন্নয়নের নামে করছে শোষণ।এদিকে খাতায় কলমে হিসাব দেখিয়ে দিচ্ছে ঠিকঠাক।
গ্ৰাম-বাংলায় এখনো চলছে পরিবার ভিত্তিক শাসন,মুষ্টিমেয় কয়েকজন অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তি চাবিকাঠি ঘুরিয়ে লুট করছে সরকার নামক সিন্দুকের খাজানা।এমনই এক পরিবার এই ঘোষ পরিবার।বাংলার অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এমন মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারের অপকর্মের ফলে তাদের গোটা স্বজাতি বদনামের ভাগিদার হয়।গ্ৰাম-বাংলায় এমন পরিবার প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।তবে এই সব পরিবারের সকল সদস্যই যে এমন কুকর্ম করতে ব্যস্ত কিংবা তা সমর্থন করে এমনটাও কিন্তু নয়।পরিবারের কিছু কিছু সদস্য নিজের কাছের মানুষগুলোর এমন কুকর্মের প্রতিবাদ করে।ফলে বিষ স্বরূপ হয়ে ওঠে সে,পরিবারের অসৎ মানুষগুলোর কাছে।এলাকার সাধারণ মানুষ কিন্তু সবটাই বোঝে,তাদেরকে কিভাবে শোষণ করা হয়,নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়,তবু মুখে কুলুপ এঁটে থাকে তারা।এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন জনমানসের পরিচয় মেলে।গ্ৰাম্য পরিবেশে বর্তমান কালে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যাবে শিক্ষিত,সরকারি বেতনভোগী কিংবা কোনো বেসরকারি সংস্থানে কর্মরত মানুষেরা দুটি ভাবে নিজেদের চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলেন।এক শ্রেণী সর্বদা এই চোরদের পাশে পাশেই থাকে যে কোনো সুযোগ সুবিধা পাবার আশায়,টুকটাক গাল মন্দও অনায়াসে হজম করে নেয়,নেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা তাদের শাস্ত্র বিরুদ্ধ,এরা মেরুদন্ডহীন জাতি।স্ত্রী-পুত্র আর সংসার নিয়ে সুখে দিনযাপন করে।এরা বোঝে আত্মসুখ।নিরন্ন মানুষগুলোর কান্নার শব্দ এদের কানে বাজে না।
আর এক শ্রেণির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এনারা বলিষ্ঠ, সবল মেরুদন্ড নিয়ে বাঁচে।প্রতিবাদ বোঝে,প্রতিবাদ করে যতটা সম্ভব।গ্ৰামের যারা অশিক্ষিত দরিদ্র মানুষ,তারা কোনো উপকার চাইতে এলে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে,সম্মানের সাথে তাদের অসুবিধাগুলো শুনে তা প্রতিকারের উপায় বাৎলে দেয়।রাজনীতির সুযোগ নিয়ে অবাধে লুঠ করা চোরেদের পাশে এরা ঘেঁষে না।আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচে।তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাদের চোখে এরা চক্ষুশূল।নেতারাও বাগে বাগে থাকে,কখন কিভাবে এদের হেনস্থা করে,দমিয়ে রেখে জনসাধারণের মনে ত্রাসের সঞ্চার ঘটিয়ে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করা যায় সেই লক্ষ্যে।কখনো সফল হয় আবার কখনোবা বিফল হয়ে পেশি আস্ফালন দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।এদের তো সম্মান নেই, এরা চেনে টাকা আর ক্ষমতা,এর বাইরে এদের স্থান শূন্য।এই অসাধু ব্যক্তিদের আরো একটি চরিত্র বৈশিষ্ট প্রবল।এনারা এতই জনদরদী ও পরোপকারী যে,নিজের আখের গোছানোর জন্য ও নাতি-নাতনি থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সরকারি সম্পত্তি লুট করে নিজস্ব সম্পদ গচ্ছিত করতে যখন তখন রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে নেন।রাজ্য কিংবা দেশে রাজনীতির পরিবর্তন ঘটে কিন্তু গ্ৰাম্য এলাকায় এ ধরনের নেতাদের কোনো পরিবর্তন নেই।আসনটা যেন শুধুমাত্র তাদেরই জন্য বরাদ্দ।
সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে বিন্দুমাত্র অবদান এই প্রকৃতির গ্ৰাম্য নেতাদের আগেও ছিলো না,আজও নেই।তবে কিছু কিছু জায়গায় অবশ্য এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে,যোগ্য মানুষের হাতে অর্পিত হয়েছে ক্ষমতা ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষ ফিরে পেয়েছে তার অধিকার,যোগ্য নেতা,শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে ও হচ্ছে অনবরত সেই সমস্ত গ্ৰামাঞ্চল।তবে অধিকাংশ স্থানই এখনও বঞ্চনার শিকার।ভারতবর্ষের সমাজ থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি যাবতীয় কিছুর পরিবর্তন সম্ভব এই গ্ৰামীন সভ্যতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই।গ্ৰামীন এলাকার যে কোনো অনুষ্ঠানের মঞ্চে শিক্ষিত সম্প্রদায় আজও অবহেলিত,যাদের মূল্যবান বক্তব্য গ্ৰাম্য জনসাধারণের মনে কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করবে,শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে গ্ৰাম্য ভূমিকে করে তুলবে উর্বর,যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করবে-আজ তারাই মঞ্চের নীচে পরে থাকে,আর উপরে থাকে কতগুলো গাধাদের সারি।ভ্যাঁ ভ্যাঁ কয়েকটি উচৈস্বরে আওয়াজ তুলে এলাকা কাঁপিয়ে বুক ফুলিয়ে মঞ্চ থেকে নামে আর আশেপাশে তাকিয়ে একটু গম্ভীরতা ভাব নেয়।ওভাবে না চললে তো এদের কেউ ভয় পাবে না,পাত্তাও দেবে না।মানুষকে ভালোবেসে মানুষের মনে এরা থাকতে চায় না।এরা হুম্বিতুম্বি করে পেছনে গালিগালাজ শুনে সামনে দাপট টিকিয়ে রাখে।এটাই এদের বেঁচে থাকার বড়ো সম্বল।
পল্লী এবং তার পাশ্ববর্তী এ এলাকায় এমনই এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্যক্তি রামেশ্বর ঘোষ।করোনা সংকট পরিস্থিতিতে দিন গড়াতে থাকে।ভাড়ারে টান পরে দিন আনা দিন খাওয়া এই মানুষগুলোর।এমতাবস্থায় পল্লীর মানুষ গুলো দিনে একবেলা খেয়ে,কখনোবা কেউ সারা দিনই অভুক্ত থেকে কাটিয়ে দেয়।কাজ যে তেমন নেই।সম্বল বলতে একমাত্র ইছামতী।নদীতে মাছ ধরে এবং তা বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছে এই মানুষগুলো।এদের দেখার মতো কেউ নেই।শুধু ভোটের আগে ভোটগুলো পাওয়ার জন্য এরা ভগবান হয়ে ওঠে ওই অসৎ নেতাদের কাছে।ফুলো মাতব্বরি দেখানো রামেশ্বর আজ যেন ডুমুরের ফুল।সেই যে একদিন এসে দু-একটা কথা বলে চলে গেলো তার না আছে মাথা,না আছে মুণ্ড।সরকার থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্ৰহণ করলেও রেশন থেকে এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ আসেনি,যাতে করে এই মানুষগুলোর তিন বেলা আহার জোটে।এই রূপ পরিস্থিতে জগার নাতি গনেশ ও তার বন্ধু সুবলের কাছ থেকে এই নিরন্ন মানুষগুলোর কথা শোনে অর্ণবেশ্বর মজুমদার নামে একটি ছেলে।একই গ্ৰামের বাসিন্দা তবে একটু দূরবর্তী স্থানে বাস।পৈতৃক সম্পত্তি অগাধ কিন্তু বিন্দুমাত্র অহংকার তার মধ্যে নেই।মানুষের যে কোনো বিপদে আপদে তার পিতা সমীরেশ্বর মজুমদার সবসময় পাশে দাঁড়ান।বলাবাহুল্য এই মানুষটিও রাজনীতি করেন,মঞ্চেও দেখা যায় তাকে কিন্তু রামেশ্বরের মতো আত্মসুখ সর্বস্ব নন।মিথ্যা আশা দিয়ে মানুষকে প্রলোভন দেখান না।বরং কাজ করে দেখান,মানুষের পাশে দাঁড়ান।আর পিতৃ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে ছেলেও।মানুষ হয়ে তার জন্মটা সার্থকই বলা চলে।সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে পল্লীর নিরন্ন মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে যায় অরু।গনেশ আর সুবলকেও সাথে নেয়।গনেশ ঘরের সামনে গিয়ে —
অঅঅ ঠাম্মা বাড়ি আচো নাই?এই সুবল যা দিকি,রমলা কাকিগে খবর দে আয়।আইতে কঅঅ এইহানে।আর হঅঅ,ওই যে বীরেশ দার মা,ওই জেটিরেও আইতে কইস।
সবাই এক এক করে এলো,আরো অনেকেই এলো।অর্ণবেশ্বর—
এসো,সবাই এদিকে এসো।দেখো আমি তোমাদের ছেলের মতো,লজ্জা পাবার কিছু নেই।তোমাদের অসুবিধা গুলো আমাকে খুলে বলো।একটুও লজ্জা করবে না।আমার বাবাও তো একদিন খুবই গরিব ছিলো, এখন না হয় একটু টাকা পয়সা হয়েছে।এই বিপদের দিনে যদি একটু তোমাদের পাশে না দাঁড়াতে পারলাম, তবে মানুষ জনমটাই তো বেকার।
জগার বউকে লক্ষ্য করে —
ও জেঠিমা, এদিকে সরে এসো,তোমরা তো না খেয়ে মরে যাবে তবুও কিছু বলবে না।তোমার নাতির মুখে সব শুনলাম এলাকার পরিস্থিতি, কি করে বসে থাকি বলো।এই গনেশ যা,গাড়ি থেকে এক এক করে প্যাকেট গুলো বের করে নিয়ে আয়।
অর্ণবেশ্বরের ডাকনাম অরু।সে জগার বউ এর হাতে একটা প্যাকেট দিলো।এভাবে বেশ কয়েকজনকে দেওয়ার পর এল বীরেশের মা।সে এতক্ষণ এক পাশেই দাঁড়িয়ে।অনেককেই দেওয়ার পর গনেশ —
অঅঅ অরু দা,তোমারে কইচেলাম না,বীরেশ দার মা’র কতা।ওই দ্যাহো দূরের দিকে দাঁড়ায় আচে।
দূরে তাকে দেখতে পয়ে অরু —–
ও মাসিমা এদিকে এসো,লজ্জা পাচ্ছো কেনো।বেঁচে তো থাকতে হবে বলো।
বীরেশের মা এগিয়ে এসে কিছু না বলেই অঝোর ধারে কাঁদতে থাকে।অরু সামনে এগিয়ে যায় —
কাঁদছো কেন,আমরা তো আছি।আমি গনেশের কাছ থেকে দু-একটা কথা শুনেছি।অতটাও জানিনা অবশ্য।কি হয়েছে আমার সাথে মন খুলে বলো দেখি।
কান্নাটা একটু থামিয়ে চোখের জল মুছে —
কি আর কবো বাপ,তুমার জ্যাঠা বাঁইচে নাই।বড়ো ছলডারেও হারাইচি।ভাবচেলাম ছোটো ছলডা বয়েসকালে দ্যাকবেনে,আর দ্যাহা।বিয়া কইর্যা আর মা’রে মনে পড়ে না।আইজ তিন বচ্চর হইয়ে গ্যালো শ্বশুরগে ওইহানে জমি কেনচে,ওইহানেই থাহে,এই মা’ডারে আর মইনা পরে না।
—– তা ছেলেকে বিয়ে দিয়েছো কোথায়?
—– এই তো সরুইপুরে বিয়া দিচি বাবা।
—– ও,তা এখান থেকে এইটুকু পথ,মা’কে দেখতে আসার সময় হয় না?আর আসা না আসা সেটা পরের কথা,সবার জায়গা হয়,আর মা’এর একটু জায়গা হয় না বাড়িতে!ভাবতেও অবাক লাগে,কষ্ট হয়।
বীরেশের মা’এর হাতে কিছু চাল,আলু,পেঁয়াজ, লঙ্কা আর কয়েকটি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে বলে —-
এই নাও,একদম কষ্ট পাবে না।আমরা তো সবাই আছি তোমার পাশে।যখনই তোমার যা কিছু দরকার লাগবে সাথে সাথে গনেশ না হলে সুবলের কাছে বলবে।একটুও লজ্জা করবে না।আমিও তোমার একটা ছেলে,কেমন!
বীরেশের মা চোখের জল আর আটকাতে পারে না —-
ভগবান তোগে মঙ্গল করুক,শত বচ্চর বাঁইচে থাক বাপ।এই বুড়িডার তোরা ছাড়া আর কেউ নাই।
শত বৎসর যায় আসে,সভ্যতার পরিবর্তন ঘটে,গ্ৰামীন পরিবেশে রাত্রিকালীন সময়ে হ্যারিকেনের ব্যবহার নিমিত্ত মাত্র।আর লম্ফ বা টেমি,এছাড়া টিমটিমির ব্যবহার তো মুছেই গেছে সেই কবে।ওসব আজ অতীত।কিছু দিন পরে বাংলা সভ্যতা সংস্কৃতির জাদুঘরে হয়তো এগুলোর ঠাঁই হবে।বিজলী আলোর রোশনায় ঝা চকচকে দেখায় এখন রাত্রিকালীন পরিবেশ কিন্তু জগৎ কি আদেও প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেছে?মানুষ কি সভ্য হতে পেরেছে আদেও?মানুষের মন কি আদেও মানবিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছে?
যত দিন যায় বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়তে থাকে,অবহেলিত হয় মা নামক সংসার সমুদ্রের দেবতারা।তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় বৃদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মা-বাবার প্রতি অবহেলা অশিক্ষিত মানুষগুলোর তুলনায় শিক্ষিত মানুষেরাই বেশি করে।প্রত্যেকটি বৃদ্ধাশ্রমের দিকে দৃকপাত করলে আমরা দেখতে পাবো,এখানকার মা-বাবাদের সন্তানেরা প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত, ধনী।কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার,কেউ ইঞ্জিনিয়ার কেউবা নামকরা সমাজসেবী অথবা অন্য অন্য কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।অনেকেরই সন্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিদেশে গিয়ে সেখানেই বিয়ে করে সে দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছে।দেশে ফিরবার ফুরসৎ নেই তাদের কাজের চাপে।স্ত্রী কিংবা অন্য মানুষগুলোর বার্থডে সেলিব্রেশন থেকে শুরু করে যে কোনো ব্যাপারে পার্টির আসর বসে,তুমুল নাচা-গানা চলে,অনেক অনেক খাদ্যের আয়োজন হয়,তবুও বৃদ্ধ মা-বাবার কথা একটুও মনে আসে না সন্তানের।এই সমস্ত মানুষেরাই আবার নিজের সন্তানদের খুব মন দিয়ে শিক্ষা দেয়,মা-বাবাকে অবহেলা করবে না,দেবতার আসনে বসাবে।সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে,নাকি পুঁথি সর্বস্ব তোতাপাখির বুলি আওড়ানো শিক্ষায় যথেষ্ট।আমরা কি সভ্য হচ্ছি নাকি সভ্যের নামে একটা অসভ্য সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে?
এখন গ্ৰামীন সভ্যতাও আধুনিক হচ্ছে দিনদিন।হয়তো আধুনিকতা আনতে বীরেশের মতো ছেলেরা মা’কে রেখে অন্যত্র চলে যায়।স্ত্রী-পুত্র সন্তানাদি নিয়ে সুখে দিনাতিপাত করে,আর জন্মদাত্রী মা অবহেলায়, অভুক্ত দিন কাটায়।সপ্তাহ কাটে,বছর গড়ায়,রোজ চোখের জল ফেলে আর সন্তানের মঙ্গল কামনা করে মা।মা’এর মন তো!হাজার কষ্টেও ছেলের পুণ্য কামনা করতে থাকে।একসময় মনে কষ্ট নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।তখন ছেলের উদয় ঘটে,ঘনান্ধকারের শেষে যেমন ঊষার আলো প্রস্ফুটিত হয় ঠিক তেমনি ভাবে।বৌমাও এসে হাজির হয়।ছেলে-বৌমা,নাতি-নাতনিদের তখন ঠেকায় কে।কান্নার চোটে গগন ফাটে।যে মানুষটা বেঁচে থাকতে ছেলে-বৌমার হাতের ভাত পায়নি,দিনের পর দিন ছেলের ফিরে আসার জন্য পথের দিকে তাকিয়ে থাকে,নাতি-নাতনিদের দেখার জন্যও প্রাণটা বেরিয়ে যায়–সেই মানুষটা ইহলোক ত্যাগ করবার পর তার ছেলে তখন ঘটা করে হাজার হাজার লোক খাইয়ে, দান-ধ্যান করে পুণ্য অর্জন করবার চেষ্টা করে।ভাবতেও অবাক লাগে আমাদের সভ্যতার অগ্ৰগতি দেখে।একি অগ্ৰগামীতা নাকি পশ্চাদমুখীনতা?