T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় পাপিয়া মণ্ডল

আমাদের উমা

নীলাভ্রর বাড়ী থেকে ফেরার পরই চিন্তাটা বেশী করে চেপে ধরল অর্জুনকে।
নীলাভ্র আর অর্জুন একই কোম্পানিতে চাকরী করে।অর্জুন মাত্র কয়েকমাস আগেই জয়েন করেছে। নীলাভ্র প্রায় চার বছর আগে শুরু করেছিল।
বেশ হাসিখুশি প্রাণবন্ত ছেলে নীলাভ্র।
অফিসের প্রথমদিন থেকেই অর্জুনের সঙ্গে ওর বেশ ভাব জমে ওঠে। আর অর্জুনও ওর কাছ থেকে কাজ বুঝে নেয়, ফাঁকা সময়ে আড্ডা দেয়। ওকে নীলাভ্রদা বলে ডাকে ও।
নীলাভ্রর বাড়ী কলকাতাতেই।
অর্জুন কলকাতা থেকে দূরে কোনো এক মফস্বলের ছেলে। এখানে একা একটা ফ্ল্যাটে থাকে। আজ নীলাভ্রর জন্মদিন। তাই অফিস ছুটির পর জোর করে অর্জুনকে নিয়ে গেছিল ওদের বাড়ী।
বাড়ীতে ওর বাবা, মা আর ও থাকে। বিয়ে হয় নি এখনো।
ওদের বাড়ীতে এসেই ড্রয়িংরুমে বড় করে টাঙিয়ে রাখা পাশাপাশি দুজোড়া ছবির একটাকে দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয় অর্জুন।
কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না।
ওর মা অনেক ভালো ভালো খাবার রান্না করেছেন আজ। খেয়েদেয়ে গল্পগুজব করে ফ্ল্যাটে ফিরতে অনেকটাই রাত হয়েছে।
কিন্তু শুয়েও কিছুতেই ওর ঘুম এল না। খালি ভাবতে লাগলো, ওর দাদু – ঠাকুমার ছবি, নীলাভ্রর বাড়ীতে কি করে এল।

অর্জুনের বাবারা তিন ভাই। ওর কাকারা কর্মসূত্রে বাইরে থাকে। বাড়ীতে দাদু- ঠাকুমা- বাবা- মা আর ওরা দুই ভাইবোন থাকত। বছর দুই হল বোনের বিয়ে হয়ে গেছে আর ও এখন কলকাতায়।
ওদের বাড়ীতে প্রতিবছরই বেশ ঘটা করে দুর্গাপুজো হয়। কাকারাও ওদের পরিবারের সঙ্গে বাড়ীতে আসে ওই কটা দিন। অন্যান্য আত্মীয়রাও আসে। বাড়ীটা বেশ গমগম করে। হৈ চৈ করে কেটে যায় দিনগুলো।
ওর দাদু খুব রাশভারী মানুষ। বাড়ীর সবাই ওনাকে খুবই ভয় পায়। অর্জুন ছোটোবেলা থেকেই শান্তশিষ্ট, বাধ্য স্বভাবের আর পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল, তাই ওর দাদু ওকে খুবই স্নেহ করতেন। বাড়ীর অনেকেই তাই ওকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে, দাদুর কাছে অনেক দাবি দাওয়ার অনুমতি পাশ করিয়ে নিত।
ওর ঠাকুমা বরাবরই খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ।
কোনোদিন কারো সাথে জোরে কথাটুকুও উনি বলেন না। সারাদিন এটা সেটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
ছোটোবেলা থেকেই অর্জুন লক্ষ্য করেছে, পুজো যত এগিয়ে আসে, ঠাকুমা কেমন যেন বেশিমাত্রায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন। পুজোর দিনগুলোতে নানাকাজে ব্যস্ত থাকেন ঠিকই কিন্তু অজানা এক শূণ্যতা বিরাজ করে ওনার চোখে মুখে।
অর্জুন অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু উনি মৃদু হেসে কথা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। বাড়ীর কথা ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে, ব্রেড টোস্ট বানিয়ে খেয়ে, অফিসের জন্য তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়ল।

অফিসে এসেই একাজে সেকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ব্রেক আওয়ারে নীলাভ্রকে জিজ্ঞেস করলো—–” আচ্ছা নীলাভ্রদা, তোমার বাড়ীতে ছবিগুলো দেখলাম, ওই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলারা কে?”
নীলাভ্র বলল—“আমার মাতামহ আর মাতামহী, ওনাদের পাশেই পিতামহ আর পিতামহীর ছবি।
কিন্তু কেনো বল তো, কি হয়েছে?”
অর্জুন বলল—–” তোমার মামার বাড়ী কোথায়? ”
নীলাভ্র বলল——-” দক্ষিণবঙ্গের কোন এক মফস্বলে আমার মামার বাড়ী। আমি কোনোদিনও যাই নি। আসলে আমার বাবা- মা বাড়ী থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল, তাই আর ফিরে যায় নি। ”
ওর কথা শুনে অতিমাত্রায় বিস্মিত হল অর্জুন।
তারপর ওকে বলল——-” তোমার মাতামহ -মাতামহী আমার দাদু-ঠাকুমা। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে আমি কোনোদিনও শুনি নি আমার পিসিমণি আছে। আজ বুঝলাম, ঠাকুমার মনে কেনো এত কষ্ট।”
ওর কথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠে নীলাভ্র বলল——” তুই আমার মামার ছেলে? আজ আমি খুব খুব খুশি রে। চল্ আজই মায়ের কাছে গিয়ে সব বলবি।”
অর্জুন বলল——” না, এখন তুমি পিসিমণিকে কিছু বলবে না। সামনেই পুজো। তখন তুমি, পিসিমণি আর পিসেমশায় আসবে আমাদের বাড়ী। ওদেরকে আগে থেকে কিছু জানাবে না। আমরা দাদু- ঠাকুমার সাথে ওদের মেয়েকে মিলিয়ে দেবো। এটাই হবে সবচেয়ে বড় পুজোপহার।”
ওর কথায় নীলাভ্র রাজি হল।

এক শণিবার সন্ধ্যাবেলায় বাড়ী ফিরল অর্জুন। তারপর সবার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে উঠল——- “আচ্ছা দাদু তোমার যে একটা মেয়ে আছে, তোমার তাকে দেখতে ইচ্ছে করে না?”
ওর কথা শুনে সবাই আকাশ থেকে পড়ল। ঠাকুমা ডুকরে কেঁদে উঠল। দাদু থতমত খেয়ে বললেন ——” তুমি কি করে জানলে আমার মেয়ে আছে?”
ও বলল—–” সে যেমন করেই হোক জেনেছি। কিন্তু তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
আজ প্রায় ত্রিশ বছর পর একমাত্র মেয়ের কথা মনে করে, চোখ ঝাপসা হয়ে এল ওনার। চশমাটা খুলে চোখ মুছে বললেন ——-” দেখ ভাই, জাতপাত আমি তেমন মানি না সে তুই জানিস। আমাদের পুজোতে তো সব জাতির, সব বর্ণের মানুষ আসে, পুজো দেয় সেটাও তুই দেখেছিস।তাই বলে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেব অন্য জাতে, অতটাও উদারমনস্ক ছিলাম না আমি।
তোর পিসেমশায় অনিল আমার ছাত্র ছিল। জাতিতে ওরা সদগোপ । তোর পিসির চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। আমার কাছে পড়তে আসত, তখনই ওদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা কেউ জানতাম না সেটা । তোর পিসি কলেজে ভর্তি হল। ওর সঙ্গে আমার বন্ধুর ছেলের বিয়ের ঠিকঠাক করছি। অনিল তখন সবেমাত্র ব্যাঙ্কের চাকরীতে জয়েন করেছে। আমার কাছে ওর বাবা-মা এসে তোর পিসিকে ওদের বাড়ীর বৌ করে নিয়ে যেতে চাইল।
প্রথমত আমরা কুলীন বামুন আর দ্বিতীয়ত আমার বন্ধুর ছেলের সাথে কথাবার্তা চলছিল, তাই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তাই ওরা কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। তারপর থেকে এই বাড়ীতে ওর নাম পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ করে নি। কিন্তু তুই কি করে জানলি, সেটা তো বল?”
অর্জুন সব বলল।
এতবছর পর একমাত্র মেয়ের খবর পেয়ে ওর সাথে দেখা করার জন্য ওনারা ব্যগ্র হয়ে উঠলেন।
সামনের পুজোয় ওদের বাড়ীতে ওদের মেয়ে ফিরে আসবে জেনে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বুক আনন্দে ভরে গেলো।

পুজোর কয়েকদিন আগে অর্জুন এসে নীলাভ্রর বাবা- মাকে ওদের বাড়ীর পুজোতে যাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করলো। ওরা যেতে রাজি হলো।
পঞ্চমীর দিন অর্জুন বাড়ী এল। কাকারা, অন্যান্য আত্মীয়রা আসতে শুরু করেছে একে একে। ওর বোনও এসেছে।
মহাষষ্টীর দুপুরে নীলাভ্ররা কলকাতা থেকে রওনা দিল। গাড়ী যত এগিয়ে চলেছে ওর বাবা – মা ততই অবাক হচ্ছে। এই পথঘাট ওদের খুব চেনা। আজ ত্রিশ বছর পর ওরা এই রাস্তা দিয়ে আসছে।
নীলাভ্রকে জিজ্ঞেস করলেন ও ঠিক রাস্তায় যাচ্ছে কিনা। ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো।
সন্ধ্যাবেলা চারিদিকের মণ্ডপে আর মন্দিরে দেবী বোধনের জন্য ঢাক বেজে উঠেছে। অর্জুনদের বাড়ীতেও বোধনের বাজনা বাজছে। ঠিক এমন সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল নীলাভ্রর গাড়ী।
অর্জুন আর বাড়ীর সবাই আগে থেকেই বাইরে অপেক্ষা করছিল। গাড়ী থেকে নেমেই আজ এতো বছর পর নিজের বাড়ী আর বাড়ীর লোকজনদের দেখে কেঁদে ফেলল ওর পিসিমণি।
ওর দাদু এসে ওদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।তারপর বললেন —–” বুড়ো বাপটার কথা কি একবারও মনে পড়ে নি রে?”
ওর পিসিমণি অশ্রুসিক্ত গলায় বলল——-” এক মূহুর্তের জন্যও ভুলি নি তোমাদেরকে।বাড়ী থেকে যাওয়ার সময়, তোমার আর মায়ের ছবিটাই তো সম্পদ হিসাবে নিয়ে গিয়েছিলাম বাবা!”
ঠাকুমা চোখভর্তি জল নিয়ে বরণডালা নিয়ে এসে, বরণ করে ঘরে তুলল ওদের ঘরের উমাকে।
এমন মহামিলন আর এমন বোধনদৃশ্য দেখে সবার চোখ আনন্দের জলে ভরে উঠল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।