শতবর্ষে বীরেন্দ্রনাথ
এলিয়টকে গুরুর আসনে বসিয়েছিলেন যে কবি, ১৯৮৫ তেই এই পৃথিবীর যন্ত্রণা গুলোকে পিছনে ফেলে এক না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন তিনি, তবুও হারিয়ে যায়নি তার দৃপ্ত উচ্চারণ, হারায়নি সেই আগুন রাঙা কলমের অক্ষরগুলো, যা আজও সমাজের বুকে স্পষ্ট বিদ্যমান —
“অনাহারে মৃত্যু নয়। অনাহারে মৃত্যু নয়।
কাল সারা রাত তুমি
পৃথিবীকে ইচ্ছেমতো কামড়ে ছিঁড়ে খেয়েছ।”
ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত্যুর এরূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বারবার, তাইতো তাঁর “পৃথিবী ঘুরছে” কাব্যগ্ৰন্থে পৃথিবীকে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে “রুটি” হিসাবে তুলে ধরেছেন। মানব মনের ব্যথা-বেদনাকে তাঁর লেখায় ঠাঁই দিয়েছেন। আজ বহু বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, আধুনিক হয়েছে এ সমাজ, তবুও সমাজের এই চিত্র এক তিল বদলায়নি। আজও অনাহারে মৃত্যু পথের প্রান্তে প্রান্তে। কবির এ ব্যথাতুর সুর আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সমাজের বুকে।
একদিকে মৃত্যুর রূপ যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন কবি, তেমনই তুলে ধরেছেন এক আশাবাদী জীবন প্রত্যয়।পুঁজিপতি সমাজকে কটাক্ষ করেছেন, গেয়েছেন মেহনতি মানুষের জয়গান। আর এই আশাবাদের কথা আমরা দেখতে পাই তাঁর “লখিন্দর” কাব্যের “বেহুলা” কবিতায়। পুঁজিপতি সমাজের অত্যাচারে লখিন্দরের জীবন বিপন্ন হলে বেহুলার মধ্যে এক সংগ্ৰামী মানসিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন কবি —
“সে জাগবে। জাগবেই। আমি তাকে কোলে নিয়ে
বসে আছি রক্ত-পুঁজে মাখামাখি রাত্রি
ভেলায় ভাসিয়ে।
এ আশা তো বাঙালি বধূর মনের আশা। বাঙালি সমাজ-সংসারের চেনা ছবি। অনেক আশা বুকে নিয়ে তিনি ফুলের মত শিশুদের জন্য এক নব প্রভাতের অপেক্ষায় চেয়ে থাকেন – যা বাস্তবে ধরা দেয় না। কবির স্বপ্নের জগতে বিরাজ করে। তাইতো “বুকের ভিতরে” কবিতায় লিখেছেন —
“বাইরে যদিও গভীর অন্ধকার
বুকের ভিতর বৃষ্টির ঝরঝরানি;
যেন পিপাসায় শিশুরা হাত বাড়ায়
কান্নায় ধোয়া পৃথিবীর রাত ভোর হয়ে গেল ভেবে।”
সমাজ সচেতন এই কবি সমাজের নগ্ন চেহারাকে কটাক্ষ করেছেন।শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন বারংবার। শিক্ষাঙ্গনে ঘটা রক্তপাত তাকে ব্যাথিত করেছে। তিনি লিখেছেন —
” রক্ত রক্ত শুধু রক্ত, দেখতে দেখতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়
শিক্ষক ছাত্রের রক্তে প্রতিটি সিঁড়িতে, ঘরে, চেয়ারে, চৌকাঠে বারান্দায়ে।
দরজা ভাঙা, জানালা ভাঙা, ছাতের কার্নিশ ভাঙা; আহত ছাত্রের
মাথা ঠুকে তারা খসিয়েছে ইট সুর্কি! রক্তাক্ত মাথায়
কেউ লাফ দিয়েছে বিশ ফুট নীচে; কাউকে ছুড়ে দিয়েছে পুলিশ
রক্ত বমি করে আজ হাসপাতালে এই বাংলার কিশোর গোঙায়!
এই তোমার রাজত্ব খুনী! তার ওপর কি বাহবা চাও?
আমরাও দেখব, তুমি কতদিন এইভাবে রাক্ষস নাচাও!”
কবি দেখেছেন আহত ছাত্রের রক্তাক্ত মাথা, বাংলার কিশোরের গোঙানি। তাইতো প্রতিবাদে মুখরিত হয়েছেন তিনি, শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পুলিশি অত্যাচারের কথা অকপটে তুলে ধরেছেন। মন্ত্রীমশাইকে তাই ভাবতে বলেছেন –
” মন্ত্রী মশাই, একটু ভাবুন —–
কাদের নিয়ে আপনি
আকাশে দেন লাফ?”
মিথ্যাকেও প্রশ্রয় দেননি কবি। মনুষ্যত্ব বোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন বারবার। তাই মিথ্যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা মানুষদের উদ্দেশ্যে “অন্নদেবতা” কবিতায় বলেছেন —
“অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার
অন্ন আদি অন্ন অন্নই ওঁকার।।
সে তার যে বিষ দেয় কিংবা তাকে কাড়ে
ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে।।