অণুগল্পে পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জি

বাবলুদার কীর্তি
বাবলুদা পাঁচ বার ফেল করে এইবার হায়ার সেকেন্ডারি উতরেছে। আমরা জোট বেঁধে বাবলুদাকে বললাম মিষ্টি খাওয়াতে। হিসেব মতো বাবলুদা গল্প ফেঁদে আমাদের ফাঁদ থেকে বেরোবার চেষ্টা করলো। বাবলুদা বললো, “শোন তোদের একটা গল্প বলি। আমি ছোটবেলায় অনাথ আশ্রমে মানুষ।” আমরা অবাক হয়ে বললাম, “তুমি কেন অনাথাশ্রমে থাকতে যাবে?” বাবলুদা সঙ্গে সঙ্গে বলে, “সেটা আর এক গল্প।” বাবলুদা গভীর জলের মাছ। আমরা বললাম, “না, থাক, তুমি আসল গল্পটা বলো।”
এবার বাবলুদা এক নাগাড়ে বলে চললো, “আট বছর বয়সে আমি অনাথাশ্রমে ভর্তি হই। জানিস তো আমি সব বিষয়েই লেট লতিফ। যেমন, এই যে পাশ করলাম ছয় বারের বার। তেমনি আট বছর বয়সেও আমি রাতে বিছানা ভেজাতাম। সাধারণত চার বছরের মধ্যেই এই সমস্যা কেটে যায়। অনাথাশ্রমের দেখভাল করতেন আশ্রমের স্কুলের হেড মাস্টার মশাই। কিন্তু, তাঁর খান্ডারনি স্ত্রীই বকলমে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। একদিন তাঁর এক মহিলা বন্ধুর সামনে আমাকে অপমান করে সতর্ক করে দিলেন, “এর পরের দিন কিন্তু রেহাই পাবে না।”
যথারীতি আবার সেই ঘটনা। সেই দিন আমাকে সকাল ন’টার সময় হেড মাস্টারের ঘরে যেতে বলা হলো। আমি যেতেই হেড মাস্টার আমাকে সমানে তিরস্কার করে চললেন আর সাথে সাথে চললো হাতের বেত। কিন্তু, আমার বিশেষ ব্যথা লাগছিল না। বুঝলাম উনি স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে প্রহার করছেন। খান্ডারনি তখন ঘরের বাইরে দরজার সামনে বসে। প্রহার আর তিরস্কার শেষ হওয়ার পর আমি যখন বাইরে বেরিয়ে করিডর দিয়ে যাচ্ছি তখন আমার সহপাঠিরা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “কি হলো?” আমি সরল ভাবে বললাম, “বিশেষ ব্যথা লাগেনি।”
কথাটা খান্ডারনির কানে গেছে। তিনি পিছন থেকে আমাকে ডাকলেন। আমি কাছে গেলে জিজ্ঞাসা করলেন আমি সহপাঠিদের কি বলেছি। আমি আবার সরলভাবে একই কথা বললাম। শুনে তিনি আমাকে আবার হেড মাস্টারের কাছে পাঠালেন। এই বার কিন্তু হেড মাস্টারমশাই সত্যিকরেই জোর জোরে আমাকে বেত দিয়ে প্রহার করতে থাকলেন, যতক্ষণ না বেত ভেঙে যায়। ভাঙা বেতের টুকরো আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি ব্যথায় আর নড়তে পারছি না। একটি চেয়ারে বেতের দুই টুকরো হাতে নিয়ে বসে কাঁদতে থাকলাম। কিন্তু, মনে মনে আমি একটি স্বস্তি অনুভব করলাম- একটি শাস্তি পেয়ে আমি যেন কৃত অপরাধ থেকে মুক্ত।
তারপর থেকে আমি সৌভাগ্যের কথা কাউকে জানাই না বা তা নিয়ে আনন্দ করি না। আমার বিশ্বাস জন্মে গেছে যে ভগবান আমাদের সৌভাগ্যে খুশি হন না।”
আমাদের কারো মুখে রা পর্যন্ত নেই।