সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১৩)

পদাতিক
ছেলেবেলায় শম্ভুকাকু নামে একজন মানুষ ছিলেন। মিশমিশে কালো, রোগা আর হিড়হিড়ে লম্বা। এতোটাই লম্বা যে, পাড়ার লোকেরা বলতেন আকাশ থেকে হেলিকপ্টার গেলে শম্ভুকাকু নাকি সে কপ্টারকে হিড়হিড় করে টেনে নামাতে পারতেন।
ভদ্রলোক আমাদের প্রাইমারি স্কুলে দারোয়ানি করতেন। কাজ ছিলো পিরিয়ড শেষে ঘন্টা পেটানো, আর স্যার ও দিদিমনিদের টিফিন কিনে আনা। স্কুলের পাশেই বাড়ি ছিলো তার। কে চিড়েভাজা খাবেন, কে ডিমটোষ্ট, কেউ বা মশলামুড়ি। টিফিনের ঘন্টা বাজিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রলোক যে কোথায় উধাও হয়ে যেতেন কে জানে, তেমনি হঠাৎ ফের ভুতের মতোই এসে হাজির হতেন। যারা ডিমটোষ্ট খাবেন ভেবেছিলেন তাদের কপালে কোনোদিনও সেটা জুটতো না। জনশ্রুতি ছিলো, ওগুলো আসলে বাড়িতেই বানিয়ে নিয়ে আসতেন শম্ভুকাকু।
বর্ষাকাল এলেই তাকে আমরা অন্যভাবে পেতাম। সন্ধ্যের পর পাড়ায় পাড়ায় হাতে একটা টর্চবাতি আর রেশনের ব্যাগ নিয়ে বেরোতেন তিনি। মুখ দিয়ে অদ্ভুত রকমভাবে একেবারে সত্যিকারের ব্যাঙেদের মতো ডাকতে পারতেন। ওর ডাক শুনে ব্যাঙেরাও ডাকতে শুরু করে দিতো। সেই ডাক শুনে শুনে একেবারে অব্যর্থ নিশানায় তিনি টর্চের আলোটাকে ব্যাঙটার চোখের ওপর ফেলতেন। চোখে আলো ফেললে ব্যাঙেরা নাকি নড়তে চড়তে পারে না। শম্ভুকাকু পা টিপে টিপে ওটার কাছে গিয়ে খপাৎ করে ধরে হাতে ঝোলানো ব্যাগে চালান করে দিতেন।
ব্যাঙগুলোকে নিয়ে তিনি কি করতেন কে জানে? কেউ বলতেন ধরে নিয়ে চিনেপাড়ায় সাপ্লাই করতেন, কেউবা বলতেন কলেজে কলেজে ঘুরে সেগুলোকে ল্যাবরেটরির কাজে লাগবে বলে বিক্রি করতেন।
হঠাৎ করে একদিন খবর এলো সাপের কামড়ে তিনি মারা গেছেন।
পুকুরগুলোর পাড় জুড়ে ব্যাঙেরা ঐকতান শুরু করেছে। এই আলো আঁধারে কোথা থেকে যে তিনি এসে সামনে দাঁড়ালেন কে জানে?
হয়তো বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা আর ভেক সংগীতের হাত ধরেই তিনি নেমে এলেন। সময়ের কোন প্রকোষ্ঠকে যে কে দখল করে রেখেছেন কে জানে! কালসমুদ্রের বুকে কে যে কখন ঢেউয়ের ওপর ফসফরাসের মতো জ্বলে ওঠেন আর কেইবা তলিয়ে যান বিস্মরণের অতলে এটাই একটা বড়ো বিস্ময়।
–” যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইবো কতো আর !”
হঠাৎ এই গানের কলিটি আমার ঘোর ভাঙালো। ভাবনার অতলে আমি এতোটাই তলিয়ে গেছিলাম যে আমার সামনে বসে থাকা কিশোরী দুজনের কথা আমি ভুলেই গেছিলাম। আমি চমকে উঠলাম। দেখি এক বোন পুকুরের দিকে মুখ করে বসে আছে, আর এক বোন সেই বোনের কাঁধে মাথা রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে গান গাইছে।
— ” জ্যেঠু আমার মা চলে যাওয়ার পর বাবা বেশ কদিন না খেয়ে শুধু কেঁদে গেছেন। বাবা, মাকে সত্যিই খুব ভালোবাসতেন। এ জন্যই বোধহয়…”
ফের বেশ কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা। কেন জানি মনে হচ্ছে পুকুরের ওই পারের জোনাকিদের নেচে যাওয়া আর ব্যাঙেদের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ শব্দের সিঁড়ি বেয়ে একে একে সবাই এসে হাজির হয়েছেন। শম্ভুকাকু, ওদের বাবা, মা আরও বেশ কিছু ছায়াশরীর এসে ঠাঁই নিয়েছেন এই ঘনঘোর অন্ধকারের আবহে।
— ” মা দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলেন। স্নান করে, কপালে সিঁদুরের টিপ পড়ে মা যখন ঠাকুরঘরে যেতেন তখন মাকে একদম লক্ষ্মীঠাকুরের মতো মনে হতো। জানো জ্যেঠু মায়ের না কোনো অসুখ ছিলো না গো। হঠাৎ করেই একদিন… ”
ফের নিস্তব্ধতা। এতোক্ষণ ঝিঁঝিঁর ডাক শুনি নি। এখন সময় বুঝে ঝিঁঝিঁ পোকারাও তাদের ডানা ঘসটাতে শুরু করেছে।
–” একচুয়ালি আমি মায়ের কাছেই প্রথম তালিম নেওয়া শুরু করেছিলাম। খুব ভালো ক্লাসিকাল বেস ছিলো মায়ের। আর কী সুন্দর করেই না ভজন গাইতেন! গাইতেন আর দুচোখ দিয়ে…
মা চলে যাওয়ার পর বাবা আর ভোপালে থাকতে চাইলেন না। বাবা খুব ভালো কার্টুনিস্ট ছিলেন। প্রচুর রোজগার ছিলো বাবার। এক একটা কার্টুন চড়া দামে বিক্রি হতো। ভোপালে যে মানুষটা ছবি এঁকে হাজার হাজার টাকা রোজগার করতেন, কলকাতা এসে তিনি আর সেরকম জমাতে পারলেন না। বছরখানিক কাটতে না কাটতেই শুরু হলো কোভিড। আর কোভিডের ফার্স্ট ওয়েভ বাবাকে আমাদের থেকে… ”
পিতৃমাতৃহীন দুই কিশোরী যে কী কষ্ট করে নিজেদের দমকে ওঠা কান্নাকে আটকে রাখছে! শুনেছি যাদের ভরসায় কলকাতা আসা, ওদের সেই কাকারাই নাকি হাতে ধরে ওদের এখানে দিয়ে গেছেন।
মানুষ যে কতো বিচিত্র ধরণের হয়, তার পরিচয়কে সঙ্গী করেই জীবনের এতোটা পথ পেরিয়ে জীবনের উপান্তে এসে পৌঁছেছি।
কী হলো জ্যেঠু, খাবেন না আজ? রাত কতো হলো খেয়াল আছে? কীরে, তোরা খেয়েছিস? চল চল খেতে বসবি চল।
মাষ্টার মশাই, বুদ্ধদেব জানা এসে এতোক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা বুদবুদগুলোকে ফাটিয়ে দিলেন। আশ্রমের মধ্যে এই মানুষটাই আছেন একমাত্র যার সাথে বসে আমি ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে ডিনার পর্যন্ত খাই। আমি না খেলে পরে ইনি সারাটা আশ্রম জুড়ে খোঁজ চালান কোথায় আছি আমি, তারপর একসাথে খেতে বসি আমরা , সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে রাখে, আমার সুবিধা অসুবিধাগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখেন। আমাকে এতোটুকু অসুবিধায় পড়তে দেন না।
— আরে চলুন জ্যেঠু । রাত এগারোটা বেজে গেলো। খাওয়ার ঘরে সবাই খুব অসুস্থ আজ। আমাদের খেতে দিয়ে তারপর এরা থালাবাসন নিয়ে ধুতে বসবেন।
সিমেন্ট বাঁধানো চেয়ার থেকে গাত্রোত্থান করলাম। দুই কিশোরীও উঠে দাঁড়ালো।
ক্রমশ