সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩২)

পদচিহ্ন

ঠিক যেভাবে একটার পর একটা ইট গেঁথে একটা ইমারত গড়ে ওঠে, ঠিক তেমন একজন একজন মানুষ এসে হাত ধরাধরি করে একটা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে ওঠে। আমরা এরমধ্যে মাত্র কয়েকজনের কথা তুলে ধরেছি। আমরা যদি ভেবে নিই যে এই কজন মাত্র মিলে গড়ে তুলেছিলো পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম, তাহলে আমরা সম্ভবত বিরাট ভুল করছি। কতো অসংখ্য জানা অজানা ব্যক্তিত্বের সমাহারে, তাদের দানে, ভালোবাসায়, শুভেচ্ছায় যে আজকের এই ইমারত রূপ পেয়েছে সেটা কল্পনাও করা যাবে না। কলকাতায় এরমধ্যে কতো মানুষই না আমায় উৎসাহিত করেছেন যখন তারা শুনেছেন যে আমি মোটামুটি নিয়মিতভাবে আশ্রমে যাতায়াত করি, বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্ব করি, আর বিভিন্নভাবে আশ্রমের কোন কাজে লাগতে পারি তার ফিকির খুঁজি। আবার অনেককেই মুখব্যাদান করতেও দেখেছি। আর সেটা দেখেই বুঝেছি, যে বলরাম করণ একজন দেবতা নন, প্রকৃত অর্থেই একজন রক্তমাংসের মানুষ। আর আমি তো সত্যিই দেবতার খোঁজ করতে সেই কোন সকাল থেকে হেঁটে চলেনি, আমি আমার সারাগায়ে পথের ধুলো মেখেছি, কপালে বলি রেখায় রেখায় আর মুখমণ্ডলের রোদেপোড়া রঙ মেখে খুঁজে ফিরেছি একজন মানুষের মতো মানুষকে। যেখানে যেখানে মানুষের দেখা পেয়েছি, তখনই আমার কাঁধের ঝোলায় ভরে নিয়েছি সেই সব মানুষের ঠিকুজিকোষ্ঠী। পথ চলতে চলতে ইয়াস ঝড়ের বিধ্বংসী ধ্বংসলীলায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে দেখা পেয়েছি এই মানুষটির। শয়ে শয়ে আর্ত মানুষ ঝড়ে, জলে সব হারিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে মন্দারমণির পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের অতিথি আবাসে। আর এই বলরাম করণ, দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা ভুলে গিয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন শুভানুধ্যায়ীদের কাছে হাত পাততে। জামা কাপড়, ওষুধপত্তর, চাল, ডাল, তেল, আনাজপাতি সংগ্রহ করে বিলিয়ে দিয়েছেন আর্ত, অসহায় মানুষগুলোর মাঝে। কয়েকশ অস্থায়ী বাড়ি দিয়েছেন ঝড়ের দাপটে গৃহহীন মানুষদের জমিতে। এই মানুষটি ঠিক এই কারণেই কারো কারো প্রশংসা কুড়োন তো কেউ আবার মুখ কুঁচকে বদনাম করেন।
আমরা যুগ সাগ্নিক পত্রিকার পক্ষ থেকে ইয়াস বিধ্বস্ত নামখানা আর মন্দারমণির দুর্গত কয়েকশ মানুষদের ওষুধপত্তর, ব্লিচিং পাউডার, কিছু শুকনো খাবার আর জামাকাপড় দিয়েই নিজেদের ত্রাতা ভাবতে শুরু করেছিলাম সেখানে এই মানুষটি একক উদ্যোগে আশ্রমের এক দেড়শো আশ্রমিকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পরেও ছুটে গেছেন আশেপাশের গ্রামে আর্ত মানুষজনের পাশে দাঁড়াতে, মন্দারমণির সমুদ্রতীরবর্তী গৃহহারা, সহায়সম্বলহীন মানুষের পাশে শুধুমাত্র মানবিক কারণে। সম্ভবত মানুষটির নিজস্ব ব্যাংক একাউন্টও নেই। মাসের পর মাস ধরে একজন ডিরেক্টর হিসেবে আশ্রম থেকে যে সামান্য সাম্মানিকটুকু পান, সেটুকুও জমিয়ে রাখেন একসাথে তুলে আশ্রমের উন্নতিকল্পে সেই টাকা খরচ করবেন বলে, সেই মানুষটির যে লম্বা ছায়ার নীচে অসংখ্য তাপিত মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখেন সেই মানুষকে কোনোরকম কালিই স্পর্শ করতে পারেনা।
বুদ্ধদেব জানার কথা আমরা শুনলাম, এবারে আসুন আমরা জেনে নিই এই আশ্রমের আরেকজন স্তম্ভ মনোজ দে আর চায়না করণের কথা। এই আশ্রমের সাথে তাদের সম্পৃক্ততাই আমাদের খোঁজ দেবে আরও কিছু স্বর্ণালি গল্পগাঁথা।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।