সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১৭)

সুন্দরী মাকড়সা
বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাটানোর পর ধীরেধীরে চোখ খুললো ঋষি। স্নেহার দুচোখের ওপর চোখ রেখে মৃদুস্বরে বললো – তোমাকে এক কথায় বলে বুঝিয়ে উঠতে পারবো না স্নেহা। ওটা ঠিক মাকড়সা নয় তবে মাকড়সার মতো। একজন সুন্দরী রমণীর বুকের মাঝখানকার পচাগলা চামড়া, ঠিক যেন একটা অতিকায় মাকড়সার মতো।
স্নেহার কেমন যেন মনে হলো যে এখনও ঠিকমতো প্রকৃতিস্থ হতে পারেনি ঋষি। ও যে কথাগুলো বলছে সে কথাগুলোর মধ্যে বাস্তবতার বড্ড অভাব, কেমন যেন অগোছালো অবাস্তব কিছু শব্দ উচ্চারণ করেছে ও।
আমি কি দু মিনিটের জন্য একটু কাউন্টারে যেতে পারি? আমার মনে হয় এসময়ে তোমার একগ্লাশ গরম দুধ অথবা এককাপ কফির খুব প্রয়োজন। অন্ততপক্ষে মিনিটখানিকের জন্য? যাস্ট অর্ডারটা দিয়েই চলে আসবো। তুমি একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থেকো প্লিজ। আমরা তো এখন ক্যান্টিনেই আছি।
ঋষি স্নেহার কথার উত্তরে শুধুমাত্র ঘাড়টাকে কাৎ করলো। স্নেহাকে ওর সবকথা বলতেই হবে। কিন্তু কোত্থেকে শুরু করবে সেটা ভাবতে শুরু করলো ঋষি। একইসাথে ও এটাকেও বুঝতে পারছে যে ও যেভাবেই শুরু করুক না কেন স্নেহাকে বুঝিয়ে ওঠা মুশকিল আছে।
স্নেহার এগিয়ে দেওয়া গরম দুধের গ্লাসটাকে হাতে নিতে নিতে ঋষি বলে উঠলো —
— একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি তোমাকে?
— অবভিয়াসলি ইয়েস। কি বলবে বলো? স্যরি তার আগে দুধটা শেষ করে নাও তুমি।
দুধটা মারাত্মকরকমের গরম। অল্প অল্প চুমুক দিয়ে খেতে সময় লাগবে। কিন্তু শেষ না করা অবদি ঋষি কিছু বলতেও পারবে না।
— দুধটা খুব গরম।
— তোমার তো এখন গরম দুধই খাওয়া দরকার। একটা প্লেট এনে দেবো? প্লেটে ঢেলে খাবে?
— না, মানে আমি বলছিলাম কি আমি যদি আমার রিকোয়েস্টের কথাটা তোমায় দুধ খেতে খেতে বলতাম তাহলে —
স্নেহা বুঝলো যে ঋষি ঠিকমতো ধৈর্য ধরতে পারছেনা। এরফলে ওর নার্ভের ওপর চাপ না পড়ে যায়।
— ঠিক আছে, বলো।
— বিষয়টাকে আমি ঠিক এখানে তোমায় বুঝিয়ে উঠতে পারবো না। if you please don’t mind, তুমি কি আমার সাথে আজ একটু আমার বাড়ি যেতে পারো?
— মানে? এটা কী করে সম্ভব ঋষি? আমি বাড়িতে কি বলবো? কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, সাথে আর কে কে যাচ্ছে, বোঝোই তো, একটা অর্থোডক্স মিডিলক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে আমি, দুপায়ে বেড়ি পড়ে রাস্তায় বেড়োই।
ঋষি চুপ করে স্নেহার কথাগুলো শুনলো। স্নেহার কথাগুলোর বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু ওর বাড়ি গেলে স্নেহাকে হয়তো বিষয়টা বোঝানো সহজ হতো। ঋষি স্নেহার মুখের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো।
— বিলিভ মি স্নেহা, আমার দ্বারা তোমার এতোটুকুও…
— ইয়েস, আই নো দ্যাট ভেরী ওয়েল, মেয়েদের একটা এক্সট্রা ইন্সটিংক্ট আছে। যাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে। আমরা পুরুষ মানুষ দেখলেই বুঝতে পারি কার ওপর ডিপেন্ড করা যায়। তোমার ওপরে আমি নিশ্চিন্তে নির্ভর করতে পারি। কিন্তু সমাজ বলে তো একটা পদার্থ আছে, যার শুধুমাত্র রক্তচক্ষু শাষণ করার বাইরে কিছুই করার নেই। ঠিক আছে, দাঁড়াও, আমি দেখছি।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ওর মা’কে ফোন করলো স্নেহা।
— হ্যালো মা, আজ অফিসে অনেক রাত পর্যন্ত ওভারটাইম করতে হবে বুঝলে, আমেরিকান কাস্টমারদের ট্যাকল করতে হবে। আমার জন্য জেগে থেকো না কেমন? আমি হয়তো কাল একেবারে অফিস সেরে বাড়ি ফিরবো। চিন্তা কোরোনা কেমন?
কোনোরকম উত্তরের অপেক্ষা না করে স্নেহা ফোনটা কেটে দিলো।
— আমার জন্য তোমাকে বাড়িতে মিথ্যে কথা বলতে হলো। আমার নিজেকে…
— আফটার অল, তুমি আমার সবচাইতে বিশ্বস্ত বন্ধু ঋষি। আর তোমার জন্য এটুকু করাই যায়। যাক তুমি দুধটা খেয়ে ডেক্সে গিয়ে বোসো। আমি ঠিকসময়ে রেডি হয়ে নেবো। আর একটা কথা, যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে যে তোমার কী হয়েছিলো? তুমি যাস্ট বোলো যে এটা তোমার একটা পুরোনো অসুখ। কেমন?
স্নেহা চলে গেলে ঋষি ভাবতে বসলো যে সে ঠিক কোত্থেকে শুরু করবে। প্রথম ঘটনাটা তো ছিলো সেই পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো আবিষ্কার করা। ঋষি মনে মনে ঠিক করে নিলো যে সেই ঘটনা দিয়েই শুরু করবে ও।
চলবে