আলো আর আঁধার, এই দুই পরস্পর বিরোধী রূপের ভেতর পার্থক্য বোঝার আবার কী আছে? আলো হলো গে দৃশ্যমানতার প্রতীক আর আঁধার হলো গে দৃশ্যহীনতার। আলোয় চরাচর প্রতিভাত হয় আর অন্ধকারে সে অদৃশ্যমান। মনে মনে এইসব সাতপাঁচ ভাবছি।
নাটমন্দির ক্রমশ ক্রমশ রৌদ্রতাপে তেতে উঠছে। জঙ্গলে একটা বেশ সুন্দর ছায়াসুনিবিড়তা আছে। সেই ছায়ায় আলো থাকে, কিন্তু রোদ্দুর থাকে না। এই নাটমন্দিরেও সোজাসুজি রোদ্দুর নেই, আটচালায় এসে আটকে গেছে। অথচ তার উত্তাপ এসে পড়ছে আমাদের শরীরে। ( আজকের নাটমন্দির আর সেদিনের নাটমন্দিরের ভেতর ব্যাপক পার্থক্য। তখন ছিলো টিনের চালার নীচে সিমেন্ট বাঁধানো মেঝে।)
— ” দেকেচো, কতো সহজ করে বুজলে, একজন পন্ডিত আমায় বুইজেচিলেন, ছায়া – উপচ্ছায়া – পচ্ছায়া –। আলোর যেমনটি ছায়া আচে গো, আঁদারেরও তেমনি ছায়া আচে। তুমি হয়তো অমাবস্যার রাতে পত চলতিচো, আকাশের তারাদের আলোয় পত আলোয় আলো। কিন্তু হটাৎ কইরে তুমি যেই না বাঁশবাগানে ডুইকলে, ওমনি দেইকবে সেকেনে আঁদার কেমন জমাট বেইদে আচে। তারাদের আলোও নেই, হয়তো জোনাকপোকার আলোয় সে আঁদারের আরও জমাটি রূপ গো পদীপদাদা। ”
আমি চুপ করে আছি। এসময় কথা বলতে নেই, শুধুই শুনে যেতে হয়। পার্টিক্লাশে একদিন একথা বলেছিলেন আমার একজন সিনিয়র কমরেড। শোনার সময় প্রশ্ন করতে নেই , তাহলে জানায় ছেদ পড়ে।
–” দ্যাকো, এই যে আমরা একন নাটমন্দিরে বসে আচি, সে একরকমের ছায়া। গভ্যগিহে যাও, দেইখপে ছায়া ঘন হয়ে গেচে। শ্মশানে চলো, সেকেনে আবার ছায়ার ভেন্ন রূপ। তুমি মায়ের সামনে আচো কি নেই সেটা বড়ো কতা নয় গো, মা তোমার সামনে এসে দাঁইড়েচেন কিনা সেটাই আসল। তুমি যকন মায়ের সামনে দাঁইড়ে আচো তকন এক রকমের আলো, আর মা যকন তোমার সামনে এসে দাঁড়াবেন তখন সে আলোর ছটায় সারা ভুবন আলোয় আলো গো। সে তুমি কি চোকে দেইকতে পাও কি পাও না তাতে কিচু যায় আসে না গো পদীপদাদা। ”
মা শব্দটা হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানের প্রতীক। আর জ্ঞানই হচ্ছে আলোর বাহক। তোমার অজ্ঞানতা মানে তোমার মনস্থিত অন্ধকার। তুমি যতো সেই অন্ধকাররূপী অজ্ঞানতাকে দূর করবে, ততোই আলোর পৃথিবীতে প্রবেশ করবে। আমাদের বাংলার অধ্যাপক কান্তিবাবুকে মনে পড়ে গেলো।
— ” বুজলে, দেবতা বলি যারে সে তো এক অবয়বহীন ধারণা গো। তো তুমি বলতিই পারো অবয়বহীনের আবার আলো কীভাবে হবে? আলো সে তো কোনো অবয়ব তেকেই উৎসারিত হপে। একেনেই সাদনার গূঢ় সত্যটা লুইকে আচে। যারাই একেনে আসেন তারা ভেবে বসেন, তারা বুজি মা তারার অবয়ব পত্যক্ক করতেচেন। এটা কজন ভাবেন বলো দেকি, যে এই মূত্তিও শুদুমাত্তর ধারণায় গড়া। বামদেব তো নিজের হাতে মা তারার মূত্তি গইড়ে সেই মূত্তিকে পেম নিবেদন করতেন। নাকি বলো দেকি? তা, আমরা যে মূত্তি দেকি, সে কি বামদেবের কল্পনার, না কি অন্য কারও? অতচ.. “
কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা। রোদ্দুরের তাপ ক্রমশ ক্রমশ তার শক্তি বাড়াচ্ছে। টিনের আটচালার নীচে কানাইদার মুখমন্ডলেও বিন্দু বিন্দু ঘামের কুঁচি, কোনোটা আবার একটু নীচের দিকে নেমে অন্য বিন্দুর সাথে মিশে শক্তি বাড়াচ্ছে। গেরুয়া উত্তরীয়র খুঁট দিয়ে কানাইদা মুখ মুছে নিলেন।
–” আমার এই এক অসুবিদা গো পদীপদাদা। একবার কতা বইলতে শুরু করলি পর সে যে কোতায় উজান বেয়ে ছুইটবে, তাকে আর বেঁদে রাকা যায় না গো।
দেকো, কেউ কেউ চক্কু তেকেও অন্দ, আবার কেউ অন্দ হয়েও চক্কুস্মান। যাদের চক্ষু আচে কিন্তু অন্তরে আলো নেই, তারা মা তারার এই রূপ দেকে আলো খোঁজেন। আর যাদের অন্তর আলোয় চক্কুস্মান, তারা মূর্তির সামনে এসে দুচোক বন্দ করে আলোর উৎসের খোঁজ করেন গো ঠাকুর।
আমাদের খুব সুবিদে গো পদীপদাদা, চোকের আলো অন্তরে গে সেইদেচে। আমাদের আর আলোকে বুজতে চোক বন্দ করতি হয় না, মনে মনে চিন্তা করলেই আলোয় আলোয় ভইরে ওটে চরাচর। ”
মন্দিরের টেরাকোটার টালি লাগানো খিলানের মাথায় দুটো কবুতর ঘুরে ঘুরে একজন অন্যজনকে প্রেম নিবেদন করছে। তাদের বকম বকমের একটানা সুরেলা আওয়াজে নাটমন্দিরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে জমাট বাঁধছে। কানাইদার মুখ আকাশের দিকে। মাথার পাগড়িটাকে খুলে ঘামে ভেজা চুলগুলোকে পিঠে কাঁধে ছড়িয়ে দিলেন।
–” বুজলে গো পদীপদাদা, যার যতো পেম, তার ততো আলো। ভাবটাই আসল গো, বাকি সবকিচু মূল্যহীন। তুমি যকন মায়ের সামনে গে দাঁড়াচ্ছো, তকন যদি তোমার মন খেরোর খাতা খুইলে বসে তবে আর আলো আসবে কোত্তেকে গো? তকন মা কে পণাম করাও যা, আর মন্ডাদোকানে দাঁইড়ে মাছভাত খাওয়াও একই রকম গো। মাছি তাড়াতে তাড়াতেই দিন কেটে যাবে।