সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২১)

স্ট্যাটাস হইতে সাবধান

একটা কবরস্থানের মতো নিঃশব্দ আর স্তব্ধ হয়ে আছে মিষ্টার তলাপাত্রদের ফ্লাট। ফুলটুসি সেই থেকে যে বিছানায় উপুড় হয়েছে এখনও ঠিক সে অবস্থাতেই শুয়ে আছে ও। আর মিষ্টার তলাপাত্র ড্রয়িংরুমের ডাবল সোফায় আধশোয়া হয়ে রয়েছেন। আর দেওয়ালটার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ওইখানে ফুলটুসির ছবিটা টাঙানো ছিলো। শিশির স্টুডিও থেকে তোলা ছবিটা তলাপাত্র নিজের হাতে বাঁধিয়ে এনে ওখনটায় টাঙিয়ে দিয়েছিলেন।
এখন কিন্তু সামান্য অনুশোচনা হচ্ছে মিষ্টার তলাপাত্রের।
শত হলেও ফুলটুসিকে যে একদমই প্রশ্রয় দেন না তিনি সেটা ঠিক না। ওর প্রশ্রয় না পেলে ফুলটুসির পক্ষে এই কবিতার আসরে আসাযাওয়া করা যে কোনোমতেই সম্ভব হতো না সেকথা ফুলটুসি নিজেও জানে। সত্যি বলতে কী, মিষ্টার তলাপাত্র যে নিজের তার একমাত্র স্ত্রীর কবিত্বশক্তি নিয়ে মনেমনে গর্বিতও ছিলেন সেকথাও একবর্ণ মিথ্যে নয়। কিন্তু তাই বলে! না না, জীবনানন্দের নামটুকুও না জানা অথবা না শোনা তার কবিত্রী বউয়ের এটাকে কোনোমতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। বলে কি মেয়েটা! আমি তো একদিনও তাকে নন্দন চত্বরে দেখিনি!
হঠাৎই সমস্ত নীরবতা ভেঙে চৌচির করে দিয়ে মিষ্টার তলাপাত্র হো হো করে হেসে উঠলেন। সে হাসির তীব্রতা এতোটাই যে বেশী যে বেডরুমে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা ফুলটুসিও ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসলো, পাশের বাড়ির দরজা খুলে সে বাড়ির মানুষজন ছুটে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে মিষ্টার তলাপাত্রের নাম ধরে ডাকতে লাগলো। রাস্তায় রিক্সা করে যেতে থাকা প্যাসেঞ্জারেরা রিক্সা থামিয়ে ওপর পানে তাকিয়ে রইলেন।
মিষ্টার তলাপাত্র উচ্চগ্রামে কবিতা পড়া শুরু করলেন — চুল তোমার কবেকার বাবুই পাখির বাসা, সে চুলে দুঃখ ভুলে পাখি ডিম পেড়েছে খাসা, পথ ভুলেছো কি মরেছো নন্দন চত্বরে, মৃত কবি এখনও নাকি হেঁটে হেঁটে মরে…
শোয়ার ঘর থেকে ফুলটুসি ফোঁপানো ভুলে এঘরে এসে বরের গলা ধরে ঝুলে পড়লো। গালে চুমু দিয়ে বলে উঠলো —- ওগো, তুমিও দেখছি কবি হয়ে গেলে, কী অপূর্বই না বললে কবিতাটা, এটা কি তোমার নিজের নাকি ওই সেই বিবেকা থুড়ি অভেদানন্দর গোওওও?
তলাপাত্রও এতোদিন বাদে বউয়ের সোহাগ পেয়ে আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠলেন — ইয়েস, দিস ইস আই, আই রোট না না ভুল হলো, আই মেড দিস কবিতা উইদিন মাই মাইন্ড মাই ডার্লিং —

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।