সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খন্ড (অষ্টাত্রিংশ পর্ব)

–” পুরুষমানুষের কি কোনো মন নাই গো, বাউল ? ”
এক নারীকন্ঠে কথাগুলো ভেসে এলো। এতোদিনে এই কন্ঠ আমার পরিচিত হয়ে উঠেছে। এ নারীকন্ঠ নদীর। আমরা সবেমাত্র মহাশ্মশানের দিকে পা বাড়িয়েছি। এমন সময় এই ক’টি শব্দ যেন আমাদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিলো। আমি কানাই বাউলের মুখের দিকে চাইলাম। সে মুখে এখন অপূর্ব এক দুষ্টুমির হাসি।
–” মন আর দায়িত্ব তো দুই সতীন লো, লদী। মন যকন চিতার সুমুকে দাঁইড়ে ভেইঙে পড়তে চায়, দায়িত্ব তকন মনের দু’চোকের বন্যাকে মুইচে দে বলে, কত্তব্য কইরতে অপে, মুকাগ্নি কইরতে অপে না! ”
–” তোমার সাতে কতা বলতে গেলে সহজ কতার কোনও উপায় তাকে না গো, গোঁসাই। তা তোমার কাঁধে যে দায়িত্বের বোঝা চেইপেচে, তার ভার অনেক বেশী ভারী, এটা বুজতে পারচি। কিন্তু ওদিকে মেয়েটা যে… ”
–” মন যতো বেশী পোড়ে, পেরেম ততো খাঁটি হয় লো। পোড়ারমুখী কি একাই জ্বলচে রে? তার কেষ্ট কানাইও যে বুক চেইপে দরে রয়েচে, সেটা কি নজরে আসেনি? ”
–” এয়েচে বলেই না… ”
–” এ গল্পের শেষ লিকবে বলেই না মা তারা কেষ্ট কানাইকে ডেইকে নে এয়েচে রে। তুই অতো উতলা হোস নি বাপু, নিয়তির ওপরে বিশ্বাস রাক। ”
–” কিন্তু ছিমতী রাদিকের যন্তণ্ণা যে আমি আর সইতে পারচি না গো, গোঁসাই… ”
— ” ওর দহন জ্বালা শেষ হয় নি বলেই না নাগাবাবা ডাক পাটালেন। নইলে টিক এসময়েই বা কেন তিনি উতলা হপেন? চলো কেনে গো পদীপদাদা, এ সমস্ত ডাককে উপেক্কা কইরতে নেই। “
আমাদের পায়ের বেড়ি মুক্ত হলো। আমরা পা বাড়ালাম মহাশ্মশানের দিকে। মনে হলো, নদীর বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসের বুকে মিশে গেলো।
মায়ের চরণবেদী থেকে একটু এগিয়ে গেলে একটা মাটির কুটিরের দোরের সামনে বসে আছেন ভদ্রলোক। সত্যি বলতে কি, আমি পরিষ্কারভাবে তাঁর দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারছিলাম না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যে এভাবে নিজেকে নিরাভরণ করে রাখতে পারেন, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
— ” বয়ঠো বাবা, এখানে বোসো। ”
বলে তিনি মাটিতে পেতে রাখা দুটো পাটের বস্তাকে এগিয়ে দিলেন।
ইনি কি বাঙালি? এতো সুন্দর ঝরঝরে উচ্চারণ নইলে করলেন কীভাবে? তাহলে প্রথম দর্শনের সময় তিনি যে বলেছিলেন, — ‘যো হ্যায় উও দেখতা নেহি, যো দেখতা উও হ্যায় নেহি… ‘ সেটাও তো শুদ্ধ উচ্চারণ ছিলো।
—” টলটলে দীঘির মতো দুটো ভরাট চোখ দেখবো বলে খুব লোভ হচ্ছিলো রে বেটা। সরোবরে অবগাহনের আনন্দ, সে তো ঈশ্বরকে অনুভব করার আনন্দের মতোই সুন্দর। ”
বাঃ, এ যে সাহিত্যের ভাষা। এই মানুষটি, সর্বশরীর ঢেকে আছে ভস্মের বিভূতিতে, তিনি –!
সাথে সাথেই কানাইদা যেন কানে কানে বলে উঠলেন —‘ এই স্থূল শরীর, এ যে মায়ার আধার গো, ঠাকুর! এ যে আদৌ সত্যি নয়, দু’দিন বাদেই পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবে, থেকে যাবে মানুষটির হৃদয়, আর সেই হৃদয়ভরা ভালোবাসা। সেই ধনই যে পরম ধন, আসল সত্যির প্রকাশ ‘।
—” তোমার নাম কী, বাবা? এখানে কেন এসেছো? ভালোই যদি বাসবে, তাহলে একমাত্র ঈশ্বরকেই বেসো। তাঁর ভালোবাসায় কোনো কপটতা নেই, ছলচাতুরী নেই, কারণ সে ভালোবাসা একমুখী, কোনো কিছু পাবার আশা নেই, ফের কিছু দেবারও বিষয় নেই। বুঝলে কিছু? ”
আমি চুপ করে বসে রইলাম। সেই যে, আমায় আমার একজন সিনিয়ার কমরেড বলেছিলেন, যদি কিছু নিতে হয় তাহলে চুপ করে শুনবে। কথা বলবে না।
–” তোমার চোখদুটো পলাশলোচন। এ চোখ যাদের থাকে, তারা ঈশ্বরাভিমুখী হন। তারা ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কোনো কিছুর প্রতিদান চান না। ”
–” আচ্ছা বাবা, স্থুল প্রেম আর সুক্ষ্ম প্রেম মানে কী ? ”
ভদ্রলোক আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ওঁর সে ভীষণ দৃষ্টির যে কি ভীষণ শক্তি, সে আমি বুঝিয়ে বলতে পারবো না। মনে হচ্ছিলো যেন আমার পায়ুদেশ থেকে নাসারন্ধ্রে মরুভূমির মতো শুকনো বায়ু ছোটাছুটি করছে।
–” যব কোই প্রেমী উনকো পেয়ারকো, পেয়ার সে বুক কা দুধ পিলাতে হ্যায়, উসমে যো পেয়ার হ্যায় উও উতনাসা গেহেরি নেহি যো, মা যখন তার কোলে শুইয়ে তার সন্তানকে আদর করে বক্ষসুধা পান করান সে প্রেম হচ্ছে পৃথিবীর বুকে সবচাইতে গভীর প্রেম, সবসে গেহেরি, সবচাইতে সুক্ষ্ম প্রেম। “

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।