T3 || ১লা বৈশাখ || বিশেষ সংখ্যায় প্রদীপ গুপ্ত

বনলতার এদিন সেদিন

সেই ভোর বয়সে প্রেম কাকে বলে সেটা তুমি, আমি কেউই জানতাম না ঠিক। জানতাম না মানে সেটা জানার বয়েসও ছিলোনা। আমার একটা ইলাস্টিক দেওয়া কালো রঙা হাফপ্যান্ট, কালিকাটারা থেকে মা গিয়ে কিনে আনতেন আর গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। প্যান্টের দুপকেট ভরা নানা রঙা কাচের মারবেল। আর তোমার গায়ে একটা একছাটের ছিট কাপড়ের ফ্রক।
তোমার মা দীপু মাসিমা আমায় রোজ বিকেলবেলা একটা পেতলের ফুলকাটা বাটিতে করে তেল পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মেখে দিয়ে গালটা টিপে দিয়ে বলতেন — আমার লক্ষ্মী গোপালঠাকুর।
গোপালঠাকুর আবার লক্ষ্মী হয় কি করে সেটা ভেবে দুজনে মিলে খুব একচোট হাসতাম, মনে আছে?
তোমাদের বাড়ির পেছনেই ছিলো মালির বাগান। সে বাগানে অন্য সবার প্রবেশ নিষেধ থাকলেও আমাদের প্রবেশে কোন বাধানিষেধ ছিলো না। মুড়ি খাওয়া হয়ে গেলেই আমরা সেই বাগানে ঢুকে যেতাম এক ছুটে।
বাগানময় প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াতো। নানা রঙের প্রজাপতি। যত ফুল ফুটতো তার চাইতে অনেক বেশী প্রজাপতি উড়ে বেড়াতো সে বাগানে। আর সে প্রজাপতির পেছনে ছুটে সেগুলোকে ধরে আমি তোমায় দিতাম আর তুমি খিলখিল করে হেসে সেগুলোকে ফের উড়িয়ে দিতে আকাশে। কি অদ্ভুত খেলাই না খেলতাম আমরা তাই না!
শুধু খেলা শেষের শেষ প্রজাপতিটা আমি তোমার গালের ওপর বসিয়ে দিতাম। তোমার বন্ধ দুচোখের পাতা তিরতির করে কাঁপছে, তোমার নাক থেকে একটা গরম নিশ্বাস আমার গালের ওপর এসে আছড়ে পড়তো। হয়তো শুধু ওই নিশ্বাসটুকু। হ্যা বিশ্বাস করো শুধুমাত্র ওই নিশ্বাসটুকু পাওয়ার লোভেই —
কি বলে এটাকে! নিশ্চয়ই প্রেম বলে না। বলো!
আমিই তো বুঝিনা ছাই।
তখন শরৎকালের ভোর। বোধহয় সেদিন মহালয়া ছিলো। শিশিরে মাখামাখি করে সবুজ ঘাসগুলো শুয়ে আছে মাটির বুকে। ঘাসের বুকে পায়ের ছোপ ফেলে দুজনে মিলে শিউলিতলায় গেছি শিউলি কুড়োতে। বাগানের সেদিকটায় শুধু শিউলি আর সাদা কাঞ্চনফুলের গাছ। শিউলিফুলে ছেয়ে আছে মাটি। সাদা আর হলুদের ছোপে যেন আল্পনা একে রেখেছেন বনদেবী। আমাদের হাতের সাজি ভরে উঠেছে ফুলে। তোমার তখন কাঞ্চনের দিকে নজর পড়লো। কাঞ্চন ফোটার কাল তখন শেষ। গাছগুলোর মগডালে ফুটে রয়েছে দুটো একটা করে ফুল। আমায় ডাল ধরে নোয়াতে বললে তুমি। আমার মাথায় কি খেয়াল এলো আমি তুলে ধরলাম তোমাকে। তোমার কোমর, তলপেট আমার দুহাতের বাঁধনে বাঁধা। নরম ফুলের মতো শরীর আমার শরীরে লেপ্টে আছে। আমার দুহাতে থরথর কাঁপন। আমার থুঁতনি, মুখে ঘষে যাচ্ছে তোমার পিঠ।
কি জানি কি হয়ে গেলো। চোখমুখ লাল হয়ে গেছে দুজনারই। নামিয়ে দেওয়া মাত্রই তুমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালে না। দৌড় লাগালে বাড়ির দিকে। তোমার সাজিভরা শিউলি ফুল, ছড়িয়ে গেলো ভোরের শিশিরে মাখামাখি করে ঘাসের ওপর। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম স্থাণুবৎ।
আচ্ছা, সেটাই কি প্রেম ছিলো! কি জানি! হয়তো বা ছিলো। হয়তো বা এমনিভাবেই শরীরের ছোঁয়া লেগে জন্ম নেয় প্রেম। আচ্ছা, মনের সাথে শরীরের কি আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?
তাহলে — সেই সেদিনের তুমি আর আজকের তুমির ভেতর কোন মিল নেই কেন?
কতদিন পর আজ তোমায় দেখলাম বনলতা! তোমার দুচোখে ভারি লেন্সের চশমায় তোমায় খুব ভারিক্কি লাগছিলো জানো!
তবে যাই বলোনা কেন আজকের দেখা তোমাকের চাইতে সে ভোরের বয়সের তোমাকে কিন্তু অনেক ভালো ছিলো দেখতে।
সেই দুপাশে বেনী দুলিয়ে, জংলি ছাপা ফ্রক পড়ে তোমার সে চকাস চকাস করে আচার খাওয়ার ছবি আমি তোমাকে কিছুতেই ফিরিয়ে দেবোনা বনলতা। সে কি আর ইচ্ছে হলেও ফিরিয়ে দেওয়া যায়! বলো? তোমার এ ভারি লেন্সের আড়ালে সে ছবি কোথায় হারিয়ে গেছে — কোথায় —

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।