সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২)

পদাতিক
— আসুন, আসুন, বসুন আপনারা .. ”
সাদা পাজামা আর একটা হাফ হাতা পাঞ্জাবী গায়ে একজন সাধারণ মানুষ, গালে অযত্নবর্ধিত খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সাথে দুজন কিশোরকে নিয়ে ছটা চেয়ার পেতে আমাদের বসতে বলছেন।
সদ্য যুবক একটা বেদী বাঁধানো আমগাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্মিতহাস্য স্বামী বিবেকানন্দ। বাঁপাশে বাঁধানো সিঁড়ি নেমে গেছে একটা পুষ্করিণীর জলে। আমগাছের ডালপালা তখন পাখপাখালির সান্ধ্য কূজনে মুখরিত। আমাদের পেছনদিকে কিছু কাঠগোলাপ, জামরুল আর পেয়ারা গাছের ফাঁকে গোধুলির রাঙ্গা আলো।
–” আমরা বলরামবাবুর সাথে দেখা করতে চাই।”
— ” বলুন, আমিই বলরাম করণ। আপনারা মন্দারমণি থেকে আসছেন তো? মানে আরকি –”
আমরা সবাই এ ওর দিকে তাকাচ্ছি। কী বলছেন ভদ্রলোক! মন্দারমণিতে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে এলাম, এখানে এসেও যার আভাস পাচ্ছি তিনি এরকম সাধারণ একজন মানুষ? এটা হতে পারে না। এটা নিশ্চয়ই আমাদের বোকা বানানোর একটা ছল।
–” আমরা মানে, আমরা এই –”
–” আপনারা বসুন। আমি মন্দারমণিতে আপনাদের ত্রাণশিবিরে উপস্থিত থাকতে পারিনি বলে লজ্জিত। আসলে কলকাতা থেকে কিছু মানুষ হঠাৎ করে এসে পড়েছিলেন।
সঞ্জীব — বাবা এনাদের জন্য একটু জলখাবারের ব্যবস্থা করতে বলো তো তাড়াতাড়ি –”
আমাদের মুখে কথা সরছে না। গল্পে অনেককিছু পড়েছি। কিন্তু চোখের সামনে যদি একজন গল্পের চরিত্র উঠে আসে তখন বুঝি কিছুতেই ঘোর কাটতে চায় না।
চেয়ারগুলো বেদীবাঁধানো গাছটার সামনে অর্ধচন্দ্রাকারে পাতা রয়েছে। আমরা একে একে সেই চেয়ারে এসে বসলাম। তিনি বাঁধানো বেদীতে গিয়ে নিজের আসন গ্রহন করলেন।
— ” আমরা কলকাতায় একটা লিটিল ম্যাগ করি। ” আমি আড়ষ্টতা কাটানোর চেষ্টা করলাম।
–” হ্যাঁ, জানি। পালবাবু আমায় বলেছেন সে কথা। নামটা বোধকরি যুব সাগ্নিক, তাই না? ”
সাথী ভাষ্কর বলে উঠলেন — ওটা যুব না স্যার যুগ হবে। যুগ সাগ্নিক। ”
ভাষ্করের মুখে স্যার শব্দটা কেমন যেন বেমানান লাগলো। অথচ এ বিষয়ে ওর এতোটুকুও দোষ দেখতে পেলাম না। আমিও এতক্ষণ ধরে ঠিক এ কথাটাই ভাবছিলাম যে মানুষটাকে কি বলে সম্বোধিত করবো।
— ” হ্যাঁ, আমারই একটু ভুল… ”
আমি কাঁধের ঝোলা থেকে একটা পত্রিকা বের করে ওর দিকে এগিয়ে ধরলাম। তিনি দুহাত পেতে গ্রহন করলেন।
–” আপনারা এসেছেন আমাদের এই ভালোবাসার আশ্রমে আমরা ধন্য হলাম। ”
বলেন কি মানুষটা! ইনি ধন্য হলেন মানে? বিনয়েরও তো একটা সীমা থাকতে হয়। ইনি কি আমাদের উপহাস করছেন? মনে মনে কুঁকড়ে গেলাম খানিকটা।আমি কি ছাই বুঝেছি যে আরও অনেক বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষায় আছে? তিনি পত্রিকার পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখছেন। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা থেকে আশ্রমের রাস্তার চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ধানিজমি, পুষ্করিণী আর আদিগন্ত খোলা আকাশ। দু একটা এম্বুলেন্স আর প্রাইভেট কারকেও দেখলাম মনে হচ্ছে। এসবকিছু যার উদ্যোগে প্রাণ পেয়েছে সেই তিনি কিনা!
–” শুনলাম আপনারা কাকদ্বীপেও গেছিলেন। সেখানেও –”
— “,হ্যাঁ স্যার, আমরা এছাড়াও…” ভাষ্কর কোভিড, লকডাউন, আম্ফান, যশ, এসবে আমাদের করা সেবাকর্মের ফিরিস্তির ঝোলা খুলে বসলেন।
— ” কাকু — চা, জলখাবার তৈরী হয়েছে। ওগুলো কি ডাইনিং এ দেবো না কি অফিস ঘরে? ”
সঞ্জীব নামের সেই তরুণ ছেলেটি এসে দাঁড়ালো।
কাকু, কী অনায়াস উচ্চারণ! এতক্ষণ ধরে খুঁজে ফেরা প্রশ্নটার উত্তর পেয়ে গেলাম। এনার জন্য নিশ্চয়ই স্যার সম্বোধনটা ঠিক হবে না। কাকু, জেঠু, দাদা এসবই এনার জন্য —
–” না না, ডাইনিং কেন? এনারা কারা জানো ? সবাই সাহিত্যিক। কলকাতা থেকে এতোটা পথ এসেছেন যশ ঝড়ে মন্দারমণির ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সেবা করার টানে। অফিসঘরে দিতে বলো -”
এ কোথায় এলাম আমরা? চারদিকের দেওয়ালজোড়া আলমারি ভরে আছে শুধুমাত্র স্মারক আর প্রশস্তিপত্রে। একটা ঢাউসমার্কা সেক্রেটারিয়েট টেবিলের চারপাশ জুড়ে পেতে রাখা চেয়ার। কোনো চেয়ারই কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য নির্দিষ্ট করা নেই।
— ” তবে কলকাতা থেকে গাছ বয়ে আনাটা আমার সবচাইতে ভালো লেগেছে। অনেকেই গাড়ি ভর্তি ত্রাণ নিয়ে আসছেন। কিন্তু যেটা এখন সবচাইতে বেশী প্রয়োজন, সেই গাছকে সাথে করে নিয়ে এসে তাদের বপন করে যাওয়া… এটা সত্যিই অচিন্তনীয়। আপনাদের এই প্রয়াসকে আমি মনে রাখবো।”
ক্রমশ