গল্পেরা জোনাকি তে প্রদীপ গুপ্ত

জয়েন্ট একাউন্ট
প্রমিতা গিয়ে শোয়ারঘরে খিল তুলে দিয়েছে।
সুমাভর আজ অফিস নেই। নেই বলাটা ঠিক হবে না, আজ ও অফিস ছুটি নিয়েছিল। ওর মনে একান্ত বাসনা ছিল, আজ যে করেই হোক ওর আর প্রমিতার ভেতরে ভুল বোঝাবুঝিটাকে ও আজ শেষ করবেই। ফালতু একটা বিষয়। ব্যাংকের জয়েন্ট একাউন্ট নিয়ে ব্যাপারটা যে এতদূর অবদি গড়াবে সেটা সুমাভ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
আজ বারো বছর হয়ে গেল ওদের বিয়ে হয়েছে। অনেকেই উপদেশ দিয়েছেন -” এবারে যাই হোক একটা ছেলে বা মেয়েকে এডপ্ট করে নে। বাড়িতে একটা বাচ্চাকাচ্চা না থাকলে “-
সুমাভ কেয়ার করেনি। ধুস যত সব ফালতু কথা, এত সুন্দর আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক জনের সংসারে হয় শুনি। অনেকে উপদেশ দিয়েছেন –” আরে গাড়ল বৌটাকে একটা কাজকম্মের ব্যবস্থা করে দে। তুই তো মস্তিতে অফিস বেড়িয়ে যাস কিন্তু বেচারা প্রমিতার দিকটা দেখ, একটা বাচ্চাও ঘরে নেই, সারাটা দিন কিভাবে কাটে বল দেখি মেয়েটার? ”
সুমাভ দুএকবার প্রমিতাকে প্রকারান্তরে কথাটা বলেওছিল। প্রমিতা ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মাথা রেখে গেয়ে উঠেছিল -“আমার সারা দিন, কিভাবে কেটে যায়, শুধু তুমি – তুমি – তুমি তুমি করে —” দুজনেই হো হো করে হেসে উঠেছিল।
” তা তুমি গানটাতো শিখতে পার প্রমি! ”
গাঢ় গলায় বলেছিলো সুমাভ।
–” তা শিখতেই পারি, কিন্তু সে বেচারা গানের মাষ্টার যদি আমার মন কেড়ে নেয়? ”
— “তাহলে না হয় মাষ্টারনি রেখে দেখি ”
–” ওরে বাবা তা হলে তো আর রক্ষে নেই। গান শেখাবার তালে সে এসে না জানি আমার ঘরেরই দখল নিয়ে ফেলে, আমি জীবিত থাকতে এ বাড়িতে কোন মাষ্টারনির প্রবেশ নিষেধ। ”
স্বাভাবিক ভাবেই এর পর আর কথা চলে না। দু একবার সুমাভ ঠারেঠোরে দত্তক নেওয়ার কথাও তুলেছিল কিন্তু তাতেও বাদ সেধেছে প্রমিতা –
–” দেখ আমি পরিষ্কার বলে দিচ্ছি তোমাকে, আমাদের দুজনের কারো মনে ভাগ বসাতে পারে এমন কেউ যেন এবাড়িতে পা না রাখতে পারে। আচ্ছা সবার জীবনই কি একই খাতে বইবে? আমরা কি একটু ব্যতিক্রমী হতে পারি না? ”
সেই সংসারে যে সামান্য একটা জয়েন্ট একাউন্টের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে —
———–********————*********————-
আজ সকাল থেকেই ওদের সংসারে একটা প্রচন্ড ঝড় বয়ে গেছে। দুজনেই আজ কেউ কারুকে এতটুকু রেয়াত করে নি। সারাটা ফ্লাট জুড়ে ঝড়ের পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকনো পাতা, ভাঙা ডাল পালা একাকার হয়ে আছে। কেউ কারোও গায়ে হাত তোলেনি ঠিকই কিন্তু ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে ড্রেসিংটেবিলের ভাঙা আয়নার টুকরো, বালিশের তুলো, জামাকাপড়, ছেঁড়াখোঁড়া খবরের কাগজ, আর ওদের দুজনের প্রিয় এলবামের ছবি।
যে ছবিগুলোকে সামনে মেলে ধরে বিছানার ওপর দুজনে কত খুনসুটিই না করেছে এতকাল।
সকালের চায়ের পর থেকে আর কোন রান্নাবান্নাও হয় নি আজ। রান্নার মাসিকে কি আজ ইচ্ছে করেই আসতে বারণ করে দিয়েছিল প্রমিতা? কি জানি? সুমাভ আজ কি করতে যে ছুটি নিল! একদম ফালতু হয়ে গেল আজকের দিনটা, একদম বেকার।
————–***********————-*********——–
সুমাভ অনেকক্ষণ ধরে লিখল চিঠিটা। হ্যা অনেক ভেবেচিন্তেই। না না এভাবে চলতে পারেনা। এরপর আর দুজনের একসাথে থাকা চলে না। সমস্ত ভালোলাগা গুলো আজ শেষ হয়ে গেলো। হ্যা, ও অনেক ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ। এই মুহূর্তে প্রমিতার ওপরে আর এতটুকু ভালোবাসাও অবশিষ্ট নেই সুমাভর। চিঠিটা লিখে ও উঠে দাঁড়ালো। বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।ওর চোয়াল কঠিন। হাতের মুঠো শক্ত। ও দরজার কড়াটাকে নির্দয়ের মতো খটখট করলো। শেষে মোবাইলটা থেকে প্রমিতার নাম্বারে বার কয়েক ফোন করলো সুমাভ। রিং বেজে গেল। কোন উত্তর নেই। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা ঠেকছে। হঠাৎ একটা খারাপ চিন্তা ওকে পেয়ে বসলো। তাহলে কি —
সুমাভ ওর সর্বশক্তি দিয়ে দরজাটাতে ধাক্কা দিল। হুড়মুড় করে খুলে গেল পাল্লাটা। ওর হাতে তখনো ধরা রয়েছে ওর লেখা চিঠিটা।
একটা পাথরের মূর্তির মতো বিছানায় বসে রয়েছে প্রমিতা। দুচোখের কোলে শুকিয়ে থাকা জলের দাগ। সুমাভ ওর দিকে চিঠিধরা হাতটা এগিয়ে দিলো।
হঠাৎ প্রমিতা ঝাঁপিয়ে পড়লো সুমাভর ওপর। ওর কলার ধরে বুকে কাঁধে এলোপাথাড়ি কিল চড় ঘুষি চালাতে লাগলো প্রমিতা।
–” কিসের চিঠি, আমাকে ছেড়ে যাবার? তুমি একাই ছেড়ে যেতে পারো — আমি পারিনা? তাহলে প্রথম যে দিন চিঠি দিয়েছিলে — তোমাকে ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না প্রমিতা – সে কথাগুলো মিথ্যে ছিলো? বলো — বলো — বলো —
ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। ওরা কাঁদুক। আসুন আমরা বরং —-