T3 || ভ্যালেন্টাইনস ডে ও সরস্বতী পুজো || স্পেশাল এ প্রদীপ গুপ্ত

ধারণা
এই বসন্তের সময়টা এলেই ওর কিরকম যেন একটা অসম্ভব খিদে পায়। আমের বোউলের গন্ধে, কাঁঠালের কুঁড়ির গন্ধে, বাতাবী ফুলের গন্ধে, আরও সব কি কি সবের গন্ধে ওর অভুক্ত পেটের শুকিয়ে যাওয়া নাড়িতে মোচড় লাগে। রাস্তার পাশে যাত্রী প্রতীক্ষালয়ের শান বাঁধানো মেঝেতে শুয়ে ও গোঙাতে থাকে। কে যে বদমাইশি করে শহরের এই উপান্তে, ওর শোবার চাতালের একশো হাত দূরের রেলওয়ে লেবেলক্রশিং এর পাশে একটা মহুয়ার চারা এনে লাগিয়েছিল, আর ওই যে কেন সেই চারাটার চারদিকে বেড়া দিয়ে, জল দিয়ে, গোবর পচা দিয়ে গাছটাকে বড় করে তুলেছিলো সেটাই বা কে বলতে পারে!
বছর দুয়েক হ’ল মহুয়া গাছটায় ফুল ফুটছে। ফুল ফোটাচ্ছে না তো যেন শত্রুতা করছে ওর সাথে। খিদের জ্বালা ভুলতে ওই গাছের ফলগুলোকে ও বেশ করে চিবিয়ে ওর পেটে চালান করেছিলো, ব্যাস সে আরেক কান্ড। খিদেটা পেট থেকে এসে হাজির হয়ে গেছিলো ওর শরীরে। কতদিন বাদে যে ওর শরীরে খিদে এসেছিলো সেটা ওরই মনে নেই, সেই থেকে ভুল করেও আর কোনোদিন ওই টোপা কুলের মতো ফলগুলোর ধার মাড়ায় নি। একটা ভয় এসে ওকে দূর দূর করে খেদিয়ে দেয়। পেটের খিদে যেমন তেমন হোক সহ্য করা যায় কিন্তু শরীরের খিদে অসহ্য। কিচ্ছুটি করার থাকে না। পুকুরে নাইতে নামলে আরও বেড়ে যায়।
এ সমস্ত কিছুই অবশ্য ওর ধারণা। এই খিদেগুলোর সাথে ফুলের গন্ধের আদৌ কিছু সম্পর্ক আছে কিনা সেটা ওর কাছে পরিষ্কার না। যেমন পরিষ্কার না মহুয়ার ফলের সাথে শরীরের খিদের সম্পর্ক। এরকম অনেক ধারণাই ওর মনের ভেতর খেলা করে।
যেমন ওর ধারণায় শীতকাল সবাইকে সুন্দর দেখানোর কাল। সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পড়ে, মুখে ক্রিম মেখে যখন সবাই ওর চাতালে এসে বাস ধরবে বলে দাঁড়ায়, তখন ওর ভীষণ ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু নিজের খড়ি ওঠা শরীরে পেঁচিয়ে রাখা পাটের বস্তার বাইরে ও কিছুতেই ওর হাত দুটোকে বের করে আনতে পারে না। ইচ্ছেটা ওর মনেই রয়ে যায়।
ওর ধারণা, গ্রীষ্ম কালের পর যখন তেড়েফুঁড়ে বর্ষা নামে তখন আকাশ থেকে হাজার হাজার ঝাড়ুদার মাটিতে নেমে আসে। ওদের দিয়ে ও ওর চাতালটাও ধুইয়ে নেয়। তখন ও যেন রীতিমতো একজন জমিদার। সমানে অর্ডার করতে থাকে ঝাড়ুদারদের।
–” এই এদিকটা, এদিকটা। এদিকটাতেতো সব নোংরাই রয়ে গেলো, চোখে কি ন্যাবা হয়েছে নাকি? দেখতে পারো না? ”
আর ঝাড়ুদারেরাও ওর অর্ডার মাফিক গোটা চাতালটাই পরিষ্কার করে ধুইয়ে দেয়। চাতাল ধোয়া হয়ে গেলে ও রাজার মতো রাস্তায় আসন পেতে বসে। আর ঝাড়ুদারেরা ওর শরীরকেও ধুইয়ে পরিষ্কার করে দেয়। গা মোছাতে এলে ও তীব্রভাবে চিৎকার করে ওঠে। সে কি! মুছিয়ে দেবে কেন? ওকি প্রতিবন্ধী নাকি? আগে চাতাল মুছে তারপর ও ওর শরীরটাকে মোছে। ওর ধারণা শরীর মোছানোর মালিক বাতাসের এর ফলে খুব রাগ হয়। বাতাস রাগের চোটে ঝড় হয়ে যায়। আর ওকে সমানে শাসাতে থাকে।
আরেকটা ধারণা ওর আছে, সে ধারণাটাকে বিশ্বাস করতে ওর খুব ইচ্ছে করে। সেটা একটা স্বপ্নের মতো। প্রথম যেদিন মেয়েটা, ( মেয়েটা না বলে মহিলাটা বলাই হয়তো ঠিক হবে,) ওর কাছে এসে একটা দু’টাকার নোট বাড়িয়ে ধরেছিলো, সেদিনই কেমন যেন মহিলাকে দেখে ওর কেন যে ধারণা হয়েছিলো, ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে উঁকি মারা একটা অস্পষ্ট ছবির মতো মেয়েটি হয়তো…
ওর কেমন যেন মনে হয় , মানে আর কি বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, মানে ধারণা করতে, সে জীবনটা বুঝি অন্যরকম ছিলো। একেবারেই অন্যরকম। তখন শীতে ওর গায়ে এসব চটের বস্তা জড়ানো থাকতো না, ফুরফুরে হাওয়ার মতো জামা কাপড়ে ঢাকা থাকতো ওর শরীর, একটা পুকুরকে ঘিরে অনেক গাছপালায় ঢাকা একটা টিনের চালাওয়ালা বাড়ির ভিতের চারদিক জুড়ে ফুটে থাকতো নানা রঙের সন্ধ্যামালতি আর দোপাটির ফুল। সে বাড়ির পেছনের দিকে ছিলো সুপুরি গাছের সারি। পুকুরের চারপাশে গাছপালার ভীড়ে গ্রীষ্ম এসে লজ্জায় হারিয়ে যেতো। শীত এসে কুয়াশার মায়ায় জড়িয়ে রাখতো সব গাছপালাদের। বর্ষা এসে যে কী সুন্দর নাচ জুড়তো সে বাড়ির দাওয়ায়, আর সেই নাচের সাথে সাথে বৃষ্টির ফোঁটারা বৃক্ষলতার পাতায় পাতায় ঘুঙুরের বোল ধরতো। আর — ওর কেমন যেন অস্পষ্ট মনে হয়, না কি ধারণা হয়, সেটা ও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, ওরই মতো কে একজন জানি পুকুরের বুকভরা মাছেদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাঁতার কেটে ভরা পুকুরের জলে ঢেউ তুলে এপারওপার, এপারওপার, এপারওপার —
সেই সময়, ও ভীষণভাবে মনে করতে চেষ্টা করে ছবিটা। ওর ধারণা হয় ঠিক সেই সময়েই একটা মেয়ে, নানা রঙে ছাপা একটা ফ্রক পড়ে, হ্যাঁ, ছবিটা কখনও কখনও ধরা দিতে গিয়েও কোথায় যেন হারিয়ে যায়, ও ঠিক পরিষ্কার করে মনে করতে পারে না, ও হাতড়ে বেড়ায়, ওর চারপাশ জুড়ে হাতড়ে বেড়ায়, মাথার জট পাকানো চুলগুলোকে দুহাত দিয়ে খিঁমচে ধরে, জামার ওপরে জামা, তার ওপরে জামা, তার ওপরে জামাগুলোকে টেনে টেনে ছিঁড়তে থাকে, একটা অসহায় গোঙানির শব্দ, ওর মুখের লালার সাথে বেরিয়ে আসতে থাকে, আর সেই সময় গোঁ গোঁ করে শব্দ করে পশ্চিম আকাশ থেকে একটা তীব্র ঝড় এসে যেন ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চায় ওর চাতালের ওপরকার এসবেস্টসের চালাটাকে।
ঠিক সেই সময় সেই মেয়েটা ফের ফিরে আসে। ওর ধারণা হয় যে, নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে সেই মেয়েটা, নানা রঙের ছাপা একটা ফ্রক পড়া, দু কাঁধ ছাড়িয়ে যাওয়া চুল রঙিন রিবন দিয়ে বাঁধা, ফ্রকের নীচে যেন আটকে আছে দুটো লজ্জালাল শালুক ফুলের কুঁড়ি, পাকা তেলাকুঁচ ফলের মতো লাল দুটো ঠোঁটের ফাঁকে শিউলি ফুলের রাশি, নীল আকাশের বুকে যেন সন্ধ্যাতারা এসে বাসা বেঁধে আছে দুই চোখে — হাততালি দিতে দিতে দিতে — ও সেই জলের ভেতর থেকেই, সাঁতার কাটতে কাটতে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই মেয়েটির দিকে — আর মেয়েটি —
ফের স্বপ্নটা হারিয়ে যায়, গুলিয়ে যায় ধারণাটা, একজন মহিলা এসে দুটাকার একটা নোট বাড়িয়ে ধরে ওর দিকে, ওর হাত বেরোতে চায় না। ও তখন যেন ছালবাকল ছেঁড়া একটা অর্জুন গাছ। দুটো হাত যেন দুদিকে উঠে যাওয়া দুটো ডালের মতো অনড়। ও শুধু তাকিয়ে থাকে, তাকিয়েই থাকে, আর ধারণা করতে চেষ্টা করে সেই শালুকফুলের কুঁড়ি দুটোকে, তেলাকুঁচ ফলের মতো পুরুষ্টু ঠোঁটের ফাঁকে শিউলি ফুলের হাসিকে, সেই আকাশ নীল —
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ বুঝি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। হয়তো ধারণা করতে চেষ্টা করেন পাগলটা তার দিকে এমনভাবে —