সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১৯)

স্ট্যাটাস হইতে সাবধান
— সে তুমি বুঝবে না গো ডাক্তার। সবসময়েই যে কারো মারা যেতেই হবে, মানে আর কি ইয়ে মানে কেউ মারা গেলেই যে কেবল, ধুত্তুরি মানে আরকি – মারা তো যেতেই হবে তা সে শারীরিক মরণ হোক চাই কি মানসিক মানে ভালোবাসাও তো মনেই ঘর বাঁধে কিনা?
— আরে কথাগুলো এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে দিয়ে বললে যে সেই গোল থেকে তালটাকে আর কিছুতেই বের করা যাচ্ছে না।
— আরে ডাক্তার বিষয়টাই যে তালগোল পাকানো। মানে কারো স্বামী যদি…
— কী? এ্যাঁ? বলি স্বামীর হয়েছে টা কি শুনি? দেহ রেখেছে? বলি তাহলে আমার সম্মুখে এই যে তুমি উদ্ধব দাঁড়িয়ে আছো — ও আচ্ছা, তোমায় অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখে এই কান্নাকাটি! তুমি তো কপাল করে এসেছো হে তলাপাত্র, সামান্য একটু ব্লাক আউট হয়েছো দেখেই এতো কান্নাকাটি, যদি সত্যিই পটল তুলতে তাহলে না জানি কী কান্ডটাই না হতো হে। আমার স্ত্রী! এই যে মুখ থেকে কোনো বায়না টুপ করে ঝরে পড়া মাত্রই আমি সাপ্লাই করি, তা সে তো দুবেলা আমায় যমের ঘরে না পাঠিয়ে মুখে ভাতের গরস তোলে না হে।
— শোনো ডাক্তার, এও বিলকুল সেরকমটাই, কী হয়েছে, কেন হয়েছে? কখন হয়েছে? কীভাবে হয়েছে সেসব খুঁটিনাটি তোমায় বলাও যাবেনা, আর বললেও তুমি বুঝবে না। তার চাইতে বরং এক কাজ করো, তোমার প্রেশার মাপার যন্ত্রটা বের করে আমার প্রেশারটা চট করে মেপে নাও দেখি। ঘরের কেচ্ছা কেলেঙ্কারি ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই থাক, সে গোবর ঘেঁটে আর দুর্গন্ধ ছড়ানোর দরকার নেই।
এ কথা শোনামাত্র ফুলটুসি ফের মেঝেতে দুপা ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো —
— ও মা গো, আমার মামনি গো, শোন, শুনে যাও ওই গোমুখ্যুটা কী বলচে গো, আমি নাকি কেচ্ছা করেছি গো, কেলেঙ্কারি করেছি গো — আমি এই বাড়িতে আর এক মুহূত্তের জন্যও থাকবো না, আমাকে এই মৃত্যুপুরী থেকে, রাবনের লঙ্কা থেকে, সুগ্রীবের কিষ্কিন্ধ্যা থেকে, রামের…
হ্যাঁ, রামের বনবাসের থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও গো…
ডাক্তার দ্রুতপায়ে বেসিন থেকে একমগ জল এনে ফুলটুসির ঘাড়ে গলায় মুখে পরম মমতায় জল মাখাতে ব্যস্ত হলে, ফুলটুসির কান্নাটা খানিক কমলো।
—- ডাক্তারবাবু…
— বলো বৌদিমণি…
— আপনি কি জানেন যে আমি একজন কবি? নন্দন চত্বরে আমি প্রায় দিনই কবিতাপাঠে আমন্ত্রিত থাকি?
— তাই? আরে এ তো খুব ভালো কথা, ভীষণ ভালো কথা, অপূর্ব খবর।
— আমার একটা স্ট্যাটাস আছে তো না কি বলেন দেখি?
— সে তো বটেই, সে তো অবশ্যই। স্ট্যাটাস বলে স্ট্যাটাস? রীতিমতো স্ট্যাটাস।
— সেসব কী আর এইসব গোবরমুন্ডু, গামবাট, বুদ্ধু, মুর্খ, অশিক্ষিত মানুষেরা বুঝবে বলুন?
— না, না, আমার স্ত্রীও না, আমারও যে একটা স্ট্যাটাস আছে, আমি যে একজন মান্যগণ্য ডাক্তার, সেসব কথা বুঝতেই পারে না। বৌদিমণি…
বলেই ডাক্তারবাবু ফের জলের মগটা থেকে হাতের তালুতে জল নিয়ে ফুলটুসির গলার দিকে হাত বাড়িয়েছেন, সেই মুহূর্তে যেন ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হলো। যেন একসাথে দশটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার গর্জন করে উঠলো —
— ডাক্তার — শয়তান —
ক্রমশ