সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩২)

বাউল রাজা
তৃতীয় খণ্ড

— এই একটা শব্দ জাত বুজেচো পদীপদাদা । এরকম একটা সুন্দর শব্দরে যে টেইনে হিঁচরে নীচে নামাতে নামাতে কোতায় এনে দাঁড় কইরেচে সে স্বয়ং শয়তানও জানেন না। আচ্চা কও দেকি জাত কতাটার আসল মানেটা কি? জা ত মানে জিনি জম্মগ্যহণ করেচেন। অমুক বংশজাত, গভভজাত, কুলজাত এসব কতায় যে জাতককে বোজানো হয়েচে সেটাই না? একেনে জাতের আবার উদয় হলো কোত্তেকে কও দেকি?
— আমার কি মনে হয় জানো বাউলদাদা, এই জাত শব্দটা মানব সভ্যতার কুফল। মানুষ যবে থেকে সভ্য হওয়া শুরু করলো, যখন সে পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালতে শিখলো, পাথরের টুকরোর সাথে কাঠের হাতল লাগিয়ে অস্ত্র তৈরী করতে শিখলো, তখন থেকেই মানুষ একা না থেকে গোষ্ঠী বানাতে শিখলো, গোষ্ঠী বানিয়ে সে যে শুধু বন্যপশুদের শিকার করতে শুরু করলো সেটাই না, তারা সেসব অস্ত্রকে আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার করা শুরু করলো। এসময়েই মানুষ গোষ্ঠীপতি নির্বাচন করা শিখলো, নেতা তৈরী হলো। একগোষ্ঠী অন্যগোষ্ঠীকে আক্রমণ করে তাদের পরাস্ত করে নিজেদের গোষ্ঠীকে বাড়াতে শুরু করলেন। ধীরেধীরে তৈরী হলো সমাজ। সমাজকে শাষণে রাখতে তৈরী হলো নিয়মকানুন, চাপানো হলো বিধিনিষেধ, সমাজকে পরিচালনা করার জন্য তৈরী করা হলো বিভিন্ন শ্রেণীর। এই শ্রেণীরই হাত ধরে এলো জাত। যে জাতকে তৈরী করা হলো সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, জাতের জাঁতাকলে পড়ে সেই জাতের সাথে জাতেরই শুরু হলো বিবাদ। উঁচু নীচুর বিসম্বাদ। যেটার কুফল আজ মানুষের তৈরী সমাজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে ফের ভাঙতে শুরু করেছে সেই জাতেরই হাত ধরে।

বলা শেষ করতে দেখি তিনজন মানুষ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
— আপনাকে আমি চিনি না, আপনার পরিচয় জানি না, আপনি কে, কোথা থেকে আসছেন, এই কানাই ক্ষ্যাপার সাথে আপনার আলাপ কতদিনের সেসবের আমি কিছুই জানি না, কিন্তু আমি যে আলোর সন্ধান পেলাম, সে আলো আমায় আপনার সম্পর্কে আমায় অনেক কিছু বলে দিলো। আপনার আলোয় আপনি আলোকিত। কী অপূর্ব সুন্দরভাবে, সহজ সরল করে জাতকে বোঝালেন এ শিক্ষা অন্তরে নিলাম গো গোঁসাই।
আমরা ফের হাঁটা শুরু করেছি। হঠাৎ করে কৃষ্ণভামা এসে আমার ডানহাতের বাহু জড়িয়ে ধরলো।
— আসলে মানুষ কতাটার মদ্দেই তো একটা জাত লুইকে আচে, তাই না গো ঠাকুর? কে যেন বলেচিলেন না, আমরা একটাই জাতি সে জাতি মানুষ জাতি। আর তোমার ওই ক্ষ্যাপা কবি, কী যেন নামটা গো — হ্যাঁ নজরুল, তার সেই কবিতাটা — জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া —

আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। এ আমি কাদের কাছে জ্ঞান বিলোতে চেয়েছিলাম! এ যে আমার থেকে কোনো অংশে কম নয়।

— আজকে আমার পরাণের খিচুড়ি কোন জাতে আটকাপে দেকপো। দাও হে দোকানি, আধাসের চাল আর সব ডাল মিশিয়ে আধাকিলো। এক পোয়া সর্ষের তেল আর চার আনার নুন দাও দেকি!

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।