আমি চুপ করে শুনছিলাম এনাদের কথা। যত সহজে উপনিষদের তত্ত্বের সন্ধান এঁরা পেয়েছেন, সে পৌঁছোনোর বৃত্তান্ত আমি অবাক হয়ে শুনে যাচ্ছিলাম। রবিঠাকুরের গানের সাম্রাজ্যে যেভাবে এনারা অবলীলায় সাঁতার কাটছিলেন, আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম সে ভাবের কথা। ছান্দোগ্য উপনিষদের ব্যখ্যা এর আগে আমি প্রচুর শুনেছি। কিন্তু সত্যি বলতে কি, সেসব গূঢ় কথা এতোটুকুও আমার মর্মে গিয়ে আলো জ্বালতে পারেনি। ” আত্মাও এক আর অখণ্ড, ব্রহ্মও তাই। একক আত্মা একক ব্রহ্মের রূপকে উপলব্ধি করার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন। ” এতো জলের মতো সহজভাবে বুঝিয়ে বলার মধ্যে যে পান্ডিত্য আছে, সে পান্ডিত্য আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মুখে শুনতে পাই নি কেন?
কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে এসে রবীন্দ্রনাথ ও উপনিষদ বিষয়ে পড়াতেন কান্তিবাবু। কান্তিবাবুকে আমি বেশ বুঝতাম। একদিন ক্লাসে তিনি তৈত্তিরীয় উপনিষদ বোঝাতে গিয়ে দুটো পাখির কথা বলেছিলেন। যে পাখিদুটো আমাদের বোধের ঘরেই বাস করে। একটি পাখি অত্যন্ত চঞ্চল। কখনোই দুটো ডানাকে স্থির হতে দেয় না, মনবৃক্ষের এডালে ওডালে নাচানাচি করতে থাকে। আর অন্য পাখিটি স্থির, অচঞ্চল। চুপ করে বসে থাকে আর অন্য পাখিটিকে লক্ষ্য করে চলে। অচঞ্চল পাখিটি হলো পরমাত্মা, আর চঞ্চল পাখিটি হলো জীবাত্মা। জীবাত্মা এডাল সেডালে শুধু পরমাত্মাকে খুঁজে ফেরেন। আর পরমাত্মা স্থির হয়ে জীবাত্মাকে আত্মার বাঁধনে বাঁধার অপেক্ষায় থাকেন।
এখানেও আজ যে আলোচনা শুনছি, সেখানেও সেই আত্মা আর পরমব্রহ্মর কথা।
—” খাঁচার ভেতর অচীন পাখি
কেমনে আসে যায়—
তারে ধরতে পেলে মনোবেড়ি
দিতাম পাখির পায়…
কেমনে আসে যায়, খাঁচার ভেতর অচীন পাখি কেমনে আসে যায়,
আট কুঠুরি নয় দরজা আটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার ওপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়
কেমনে আসে যায়
কপালের ফের নইলে কি আর
পাখি রে তোর এমন ব্যাভার
খাঁচা ভেঙে পাখি আমার
কোনখানে পালায়
কেমনে আসে যায়
খাঁচার ভেতর অচীন পাখি কেমনে আসে যায়…
কানাইদার মুখ তার আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করা ছাতিম পাতা চুঁইয়ে আসা চাঁদের আলোয় আলোময় হয়ে গেছে। সমস্ত উপনিষদের মূল ধরে টান দিয়েছেন আজ কানাই বাউল লালনের কথায় আশ্রয় করে। ছাতিমের মাতাল করা গন্ধে মেতে রয়েছে বিশ্বচরাচর। এসময় ছাতিম পূর্ণ যুবতী। তার বক্ষঃ নিসৃত সুধা অকৃপণ ভাবে ঢেলে দিয়েছে তার আশ্রয়দাতা পালকপুরুষের আখড়ায়। মনে হচ্ছে সেও তার ভান্ডারের সমস্ত সঞ্চয় নিয়ে যোগ দিতে চাইছে আজকের আসরে।
দাওয়ার কুলুঙ্গিতে রাখা লম্ফের শিখার ছায়ায় যেন কোনো ছায়ামূর্তি নড়ে উঠলো। আমার ডানদিকে কানাইদা, বাঁদিকে ধ্রুবদা, মুখোমুখি সেই ভস্মাচ্ছাদিত গুহাবাসী সাধু, পেছনে ছুটকি বসে আছে, ধ্রুবদা আর সাধুবাবার মাঝখানে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে…
এ কী! এখানেই তো বাউলনি… ! বড় একটা পিলসুজের ওপরে একটা মাটির প্রদীপ জ্বলছে। কিন্তু স্থির। শিখায় কোনোরকম চঞ্চলতা নেই, অচঞ্চল। আমি বেশ বুঝতে পারছি কানাইদা, সাধুবাবা দু’জনেই অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও আমাকেই লক্ষ্য করে যাচ্ছেন, আমি দু’চোখ বন্ধ করে মনকে কেন্দ্রীভূত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। সেই অচঞ্চল শিখাটা একটা পাখির রূপ ধরে আমার মনের দাঁড়ে এসে বসলো। সুগন্ধি চন্দন, আর সদ্য বৃন্তচ্যুত কাঁচা আমের বোঁটা নিঃসৃত আঠালো গন্ধে মিশে গেছে চেতনার অন্দরমহল। অপার্থিব আলোয় ভেসে যাচ্ছি আমি, বহু বর্ণ আলোকতরঙ্গের দোলায় দুলতে দুলতে একটা চরায় এসে যেন আটকে গেলাম, সেখানে রাজেন্দ্রাণীর বেশে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে কৃষ্ণভামা। কী অপরূপ রূপে ভরে আছে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, অথচ সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা। আর তার নাভিকমলে, স্তনে, নিতম্বে, যোনীতে ফুটে আছে স্বর্ণকমল। সেই বিবসনা নারী তার ডানহাতটা এগিয়ে ধরলেন আমার দিকে।